
রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলীঃ
পদ্মা নদীতে জেলের জালে ধরা পরছে ঝাঁকে ঝাঁকে বড়, বড়, বাঘাইড়, পাঙ্গাস, রুই, বোয়াল, কাতল মাছ। বিগত বছরের তুলনায় এই বছর নদীতে এ সময় অনেক বেশি ধরা পড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে গোদাগাড়ী উপজেলার রেলওয়ে বাজার ঘাটের উপর জেলেরা বেলে, পাবদা, খরি, পিয়লি, বাঁশপাতা, চিংড়ী, ভোলা মহালা, বড়, বড়, চিতল আঁড়, বাঘাইড়, পাঙ্গাস, রুই, বোয়াল, কাতলসহ নানা প্রজাতির নদীর মাছ বিক্রি হচ্ছে। নদীধার ও মৎস্য আড়ৎগুলিতে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে বাঘাইড় পাঙ্গাস, রুই কাতল, চিতল রেখে দিয়েছে জেলেরা। পরে সেই মাছগুলো আড়তের মালিকরা পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন। এছাড়াও দাম কম হওয়ায় দূরদূরান্ত হতে অনেক ক্রেতাও বাঘাইড়, চিতল, পাঙ্গাস মাছ ক্রয় করছেন। একেকটা পাঙ্গাস মাছের ওজন ১০-১৮ কেজি এবং বাঘাইড় মাছ ৫ কেজি হতে ২৫ কেজি। দেখা গেছে প্রতি কেজি পাঙ্গাসের মূল্য পরে প্রায় ৬৫০-১২শ টাকা, বাঘাইড় প্রতিকেজি ৬শ থেকে ৯৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
গত ২ বছর গোদাগাড়ীতে পদ্মায় ধরা পড়েছিল ৭১ কেজি ওজনের বিশাল আকৃতির বাঘাইড় মাছ। গোদাগাড়ীর হরিশংকরপুর ঘাটে জেলে হবি, দুরুল, মান্নান ও খোশ মোহাম্মদ এর জালে ধরা পড়েছিল বিশালাকৃতির এই বাঘাইড় মাছটি । এটি এলাকায় গত কয়েক বছরে এটি সর্বোচ্চ ওজনের মাছ। ৭১ কেজি ওজনের মাছটি ৯৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রয় করা হয়। মাছটি বিক্রি করেছিল জেলেরা পেয়েছিলেন ৬৮ হাজার ৮৭০ টাকা। মাছটি ধরতে পেলে জেলেরা দারুন খুশি হয়েছিল। এবারও ধরা বড় বড় মাছ ধরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রেলওয়ে বাজার মৎস্য আড়তে মাছ বিক্রি করতে আসা জেলে কামাল হোসেন জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার এসময়ে নদীতে বেশি বেশি বাঘাইড়, পাঙ্গাস, রুই, কাতল, পিয়লী, চিতল, বাচা, মাছ ধরা পড়ছে। প্রত্যেক দিন সবাই মাছ পাচ্ছে, দামও ভাল পাওয়া যাচ্ছে।
এছাড়া রেলওয়ে বাজার মৎস্য আড়তদারদের সাথে এ বিষয়ে কথা হলে তারা জানান, জাটকা ইলিশের মতো যদি সরকার পাঙ্গাসের বাচ্চা বিক্রি বন্ধ করে তাবে ভবিষ্যতে আরো অনেক পাঙ্গাসের দেখা মিলবে।
এ প্রসঙ্গে গোদাগাড়ী সিনিয়র উপজেলা সাবেক মৎস্য কর্মকর্তা বরুন কুমার মন্ডল জানান, গোদাগাড়ীর রেলবাজার হতে সুতানগঞ্জ পর্যন্ত মাটিতে কাঙ্গর জাতীয় খাবারের প্রাচুর্যতা থাকাই এসব মাঝের দেখা মিলছে এবং এসব অঞ্চলকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে মনে করছে। এগুলি সংরক্ষণ করা হলে, মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। রেলবাজার মাছের আড়ৎ গুলিতে চলছে জমজমাটভাবে মাছের ব্যবসা। কাঁক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে এ আড়ৎ গুলি।
পুরানো দিনের সেই এক সময়ের চিরচেনা পদ্মায় যখন জেলেরা মাছ ধরে আনন্দ করত আর সুখে রুজি রোজগার করত এখন সেই অবস্থা বিরাজ করছে গোদাগাড়ী উপজেলার জেলে সম্প্রদায়ের মাঝে।
সারারাত জেগে মাছ ধরে খুব সকাল সকালে আড়তে আসছে বড় বড় পাঙ্গাস, চিংড়ি, বোয়াল, চিতল ও বাঘাইর মাছ বিক্রয় করতে। আবার দুপুরের পর হতে রাত পর্যন্ত মাছ ধরে নিয়ে এসে গোদাগাড়ীর রেলওয়ে বাজার আড়ৎ গুলিতে বিক্রি করছে জেলেরা। আর রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া, পাবনা, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা হতে আগত পাইকারী ক্রেতারাও ছুটে আসছে বড় বড় পাঙ্গাস আর বাঘাইর মাছ ক্রয় করতে। খুব সকাল ও সন্ধ্যা বেলা গোদাগাড়ী সদরের রেলবাজারের আড়ৎ গুলোতে ঘুরলে এমনই চিত্র চোখে পড়বে সবার। আবার কেউ কেউ পূর্বে হতে বড় মাছের অর্ডার পৌছে যাচ্ছে বাড়ীতে বাড়ীতে । উত্তরা ব্যাংক মহিশালবাড়ী শাখার ম্যানেজার বসকে খুশি রাখতে গত রাতে আনসার সোহেল রানাকে দিয়ে একঝুড়ি পদ্মার মাছ পাঠিয়েছেন। শুধু ম্যানেজার নয় বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাগণ উদ্ধোর্তন কর্মকর্তাদের খুশি করতে পদ্মার লোভনীয়, সুস্বাদু মাছ একমাত্র ভরসা। আবার কেউ উপহার হিসেবে এ মাছ ক্রয় করে পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফেসবুকে মাছের ছবি পোষ্ট দেখে অনেকে এখানে মাছ ক্রয় করতে আসছেন।
গোদাগাড়ীর রেলবাজরের আড়ৎদার জাহাঙ্গীর জানান সর্বনিন্ম ৫ কেজি ওজন হতে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৫ কেজি পর্যন্ত ওজনের বাঘাইড় ও ২০ কেজি ওজনের পাঙ্গাস মাছ ধরা পড়ছে জেলেদের জালে। এছাড়াও বড় বড়, বোয়াল, রুই, কাতল মাছ ধরা পড়ছে। ২২ কেজি ওজনের কাতল মাছ ১২২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গত ২ হতে ৩ বছর হতে এই মৌসুমে পদ্মায় হঠাৎ পাঙ্গাস ও বাঘাইর মাছের আবির্ভাবে পদ্মা পাড়ের বাসিন্দাদের মাঝেও চোখে মুখে আনন্দ দেখা দিয়েছে। তারা বলছে অনেক দিন পর অন্তত বড় বড় মাছ আমরা দেখতে ও কিনে খেতে পাচ্ছি। মাছ ব্যবসায়ী দয়াল বলেন, এমন বড় বড় মাছে ক্রয় করে রাজশাহী, বগুড়াসহ অন্য বাজারে নিয়ে বিক্রি করে ভালই হচ্ছে।
এই বছর পদ্মা নদীতে বড় বড় বাঘাইর ও পাঙ্গাস মাছের আবির্ভাব হওয়ার কারন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলেরা বলেন, পদ্মানদীতে এই সময় বেশী পানি থাকে। পানির গভীরতার জন্য এসব মাছ এই অঞ্চলে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে এসেছে তাই এসব মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে পাওয়া যাচ্ছে। সারারাত দিন কর্ডের ফাঁস জাল দিয়ে এসব মাছে পাওয়া যাচ্ছে বলে জেলেরা জানান। তারা আরও বলেন, প্রচুর পরিমানে বাঘাইর ও পাঙ্গাস ধরা পড়ায় মাছ বিক্রি করে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে।
রেল বাজারের মাছের আড়তে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মাছ ক্রয় করতে আসা মাছ ব্যবসায়ী নূর সুলতান বলেন, এখানে মাছের দাম বেশী। তবে মাছ সাইজ ভাল।
বষস্ক আড়ৎদার আনারুল বিশ্বাস জানান, প্রতিবছর অক্টোবর যে, ২২ দিন মা ইলিশ সংরক্ষন অভিযান পরিচালনা করা হয় তারই ফলশ্রুতিতে পাঙ্গাস, বাঘাইড়, রুই, কাতল, পাবতা, বাসপাতা, চিতল,বাচাসহ অন্যান্য মাছের অধিক্য বেড়ে যায়। এ বছরও গোদাগাড়ীর পদ্মা নদীতে বাঘাইড়,পাঙ্গাসসহ অন্যান্য মাছ বেশী পাওয়া যাচ্ছে।
মোঃ হায়দার আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক,
রাজশাহী।