শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :-
মা-দক ও স-ন্ত্রাস মুক্ত জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়ন গড়াই হবে আমার মূল লক্ষ্য গোদাগাড়ীতে তুরীধামে নরোত্তম দাসের তিরোভাব মহোৎসব শুরু হয়েছে- সাধু-সন্ন্যাসীদের উপচেপড়া ভীড় নড়াইলে পুলিশের অভিযানে ইজিবাইক চো-রচক্রের সক্রিয় তিন সদস্য গ্রে-প্তার এমপি কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলনের হাত ধরে বাংলাবাজারকে মডেল ইউনিয়ন গড়তে চান আব্দুল আজিজ গোদাগাড়ীতে পদ্মায় অ-স্তিত্ব সংকটে ইলিশ বাঘাইড় ফলি পাঙ্গাস রিঠা ঝাঁকে ঝাঁকে ধ-রা পড়ছে সাংবদিকতা এক সময়ে ছিল সত্য প্রকাশের সাহসী মাধ্যম এখন নেতার ব্যক্তিগত মুখপাত্র ঘাগড়া ইউনিয়নের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে চেয়ারম্যান হতে চান মামুন মন্ডল বরিশালে জাহাজের ধা-ক্কায় পাঁচটি স্পিডবোড ডুবি *জাহাজের তলা ফেঁটে ভিজে গেছে গম বরিশালের বাবুগঞ্জে এবার নারী ভু-য়া চিকিৎসকের সন্ধান, দেড় লাখ টাকা জ-রিমানা ময়মনসিংহ সদরে জেলা প্রশাসক বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত

গোদাগাড়ীতে পদ্মায় অ-স্তিত্ব সংকটে ইলিশ বাঘাইড় ফলি পাঙ্গাস রিঠা ঝাঁকে ঝাঁকে ধ-রা পড়ছে

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৮ Time View

রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলীঃ বর্তমানে নদীর বেহালদশা। পদ্মা নদীসহ শ শ নদী মরে যাচ্ছে, অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে । দেশে জলবায়ুর প্রতিকূল প্রভাব পড়ছে, তার সাথে ফারাক্কার প্রভাব তো আছে। কথায় বলা হয় মাছে ভাতে বাঙ্গালী। আগে নদী, খাল, বিল, ডোবায় যেখানে পানি থাকতো সেখানেই পাওয়া যেত দেশী মাছ। মরণ বাঁধ, ফারাক্কার প্রভাব, চাষযোগ্য জমিতে অপরিকল্পিত রাসায়নিক সার, কীটনাশক, প্রয়োগ, গ্যাস ট্যাবলেট মাছ ধরার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে অনেক দেশী প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। বর্ষাকালে ওই সব জমি, পুকুর ডোবার পানি নদীতে মিশে যাওয়ার অনেক মাছ মারা যায়।
গোদাগাড়ীতে পদ্মায় অর্ধশতক আগে ঝাঁকে ঝাঁকে মিলত ইলিশ। স্বাদে ও ঘ্রাণে এ ইলিশ ছিল অতুলনীয়। আকারে মাঝারি ও বড় ইলিশ ছিল সহজলভ্য। কিন্তু বিধিনিষেধ পার করে ইলিশ ধরা শুরু হয়েছে তবে জেলেরা হতাশ। তেমন কোন ইলিশ পাচ্ছেন না, তাদের অভিযোগ ভারতীয় জেলেরা বাংলদেশে প্রবেশ করে ইলিশ ধরে নিয়ে গেছে। তবে মহানন্দান ও পদ্মা নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে বাঘাইড়, পাঙ্গাস, রুই, বোয়াল, বাঁশপাতা, চিথল, বাঁচা, আঁইড়, খেড়া, কাতল রিটা, ফলিসহ নানা প্রজাতির ছোট বড় নদীর মাছ। সরেজমিনে শুক্রবার সকাল ৭ টার সময় উপজেলার রেলওয়ে বাজার, মৎস্য আড়ৎ ও নদীর পাশে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে বাঘাইড় পাঙ্গাস, রুই কাতল, রেখে দিয়েছে জেলেরা। পরে সেই মাছগুলো আড়তের মালিকরা পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন

দাম কম হওয়ায় দূরদূরান্ত হতে অনেক ক্রেতা ও পাঙ্গাস মাছ ক্রয় করতে আসছে একেকটা পাঙ্গাস মাছের ওজন ১০-২০ কেজি এবং বাঘাইড় মাছ ৫ কেজি হতে ৪০ কেজি। দেখা গেছে প্রতি কেজি পাঙ্গাসের মূল্য পরে প্রায় ৬৫০-১২শ ৫০ টাকা, বাঘাইড় প্রতিকেজি ৬শ থেকে ১১শ ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

শুক্রবার গোদাগাড়ীর সামনে পদ্মানদীতে ৪০ কেজি ওজনের বাঘাইড় মাছ ধরা পড়েছে জেলে ইসারুলেন জালে বিক্রির জন্য আড়তে নিয়ে এসেছেন। ১২শ ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। দাম পেয়েছে ৫০ হাজার টাকা।

মাছ আড়ৎদার নূরজামিল জানান, কিছু দিন থেকে পদ্মায় পানি কমে যাওয়ায় ইলিশের দেখা না গেলেও জেলেদের জালে ধরা পড়ছে বড় বড় বাঘাইড়, পাঙ্গাস, রিঠা, বুয়াল, ফলি, আইড়, জেলেরা মাছের দামও বেশী পাওয়া যাচ্ছে।
সাংবাদিক মোঃ আব্দুল বাতেন, নদীর ছোট মাছ কেনার জন্য এসেছিলেন আড়তে কিন্তু দেরীতে আসায় সব মাছ বিক্রি হয়ে যাওয়ায় কিনতে পারেন নি। তবে ৪০ কেজি বাঘাইড় মাছের সাথে ছবি তুলদে ভুল করেন নি। তিনি জানান, আরও কিছুদিন বড় বড় বাঘইড়, পাঙ্গাস বুয়ালসহ নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যাবে। জাটকা নিধনে, মা ইলিশ মারা থেকে জেলের বিরত থাকতে, অভিযান পরিচালন করতে এবং সচেতন করতে পারলেই ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ইনশাল্লাহ।

গতবছর গোদাগাড়ীতে পদ্মায় ধরা পড়েছিল ৭১ কেজি ওজনের বিশাল আকৃতির বাঘাইড় মাছ। গোদাগাড়ীর হরিশংকরপুর ঘাটে জেলে হবি, দুরুল, মান্নান ও খোশ মোহাম্মদ এর জালে ধরা পড়েছিল বিশালাকৃতির এই বাঘাইড় মাছটি । এটি এলাকায় গত কয়েক বছরে এটি সর্বোচ্চ ওজনের কোনো মাছ। ৭১ কেজি ওজনের মাছটি ৯৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রয় করা হয়। মাছটি বিক্রি করেছিল জেলেরা পায়েছিল ৬৮ হাজার ৮৭০ টাকা।

সাধারণ মানুষ সহজেই অত্যন্ত এ সব সুস্বাদু এ মাছটির স্বাদ নিতে পারতেন। গবেষকরা বলছেন, পদ্মায় পানি কমে যাওয়ায় এখন ইলিশ সেভাবে নিচু এলাকা থেকে উজানে আসে না। বিশেষত নদীতে পানির গভীরতা কমে যাওয়া, বাঁধ দেওয়া এবং ফিল্টারেশন বেশি হওয়ার (ড্রেজিংয়ের কারণে পানিতে বালুর পরিমাণ বেড়ে পানি ঘোলা হয়ে যাওয়া) কারণে ইলিশ আসা কমে গেছে। পানির গভীরতা ২০ থেকে ২৫ ফুট না হলে মাছ আসতে চায় না। রাজশাহীর বিশিষ্ট নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ইলিশ দ্রুত বেগে ছোটে এবং উজানের দিকে যেতে পছন্দ করে। চলাচল করে ঝাঁকে ঝাঁকে। পাকিস্তান আমলেও বঙ্গোপসাগর থেকে উজানে রাজশাহী হয়ে ভারতের ভাগলপুর পর্যন্ত যেত ইলিশ এবং ডিম ছাড়ত। ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর রাজশাহীতে ইলিশ কমতে থাকে। তিনি বলেন, বাঁধের কারণে পদ্মায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় স্রোতও কমে গেছে। ফলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ অতিক্রম করে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ আসা বন্ধ হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ১৯৭৪-৭৫ সাল পর্যন্ত রাজশাহীতে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া যেত। তবে আশির দশক থেকেই পদ্মায় কমতে থাকে ইলিশের পরিমাণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা নদীর চেহারা পালটাতে শুরু করে ১৯৭৫ সালের পর। ওই বছর পদ্মার ১৮ কিলোমিটার উজানে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে ভারত। এ বাঁধ দিয়েই ভাগীরথী ও হুগলি নদীতে পানি প্রত্যাহার শুরু করে প্রতিবেশী দেশ ভারত এর প্রভাবে পানি কমতে শুরু করে পদ্মায়।

গবেষকরা জানান, ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পদ্মায় প্রতি সেকেন্ডে পানি প্রবাহিত হতো ৯ হাজার ৩২ ঘনমিটার। বাঁধ চালুর পর থেকে অর্থাৎ ১৯৭৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রবাহ নেমেছে ৫ হাজার ১৪৬ ঘনমিটারে।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী বিভাগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫০৭ টন, ২০১৯-২০-এ ৭৩৫ টন, ২০২০-২১-এ ৭৪১ টন, ২০২১-২২-এ ৫৮১ টন, ২০২২-২৩-এ ৬০০ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৯২ টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশ আহরণের পরিমাণ আরও কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে মৎস্য অধিদপ্তর রাজশাহী জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার গোদাগাড়ী,পবা, চারঘাট, বাঘা এলাকার পদ্মা নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে চারঘাটে পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি। চলতি বছর এখনো ইলিশের মৌসুম শুরু হয়নি। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে চারঘাটে ৩ হাজার ২০০ কেজি ইলিশ ধরা পড়েছে; আগস্টে ২ হাজার ৮৩০ কেজি ও জুলাইয়ে ধরা পড়েছে ১ হাজার ৪৪৬ কেজি ইলিশ। তবে বেশিরভাগ ইলিশই আকারে ছোট। পাঁচ থেকে ছয়টি মিলে এক কেজি হয়।

সূত্র আরও জানায়, রাজশাহী জেলায় গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে চারটি উপজেলায় ৫.৩৭ টন ইলিশ ধরা পড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৮.৫৫ টন ইলিশ ধরা পড়লেও পরের বছর থেকে ইলিশ আহরণ কমতে শুরু করে। মাত্র ৮ বছরের ব্যবধানে রাজশাহীতে ইলিশের আহরণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ইলিশ এমন একটি মাছ, যেটি সমুদ্র এবং নদী উভয় জায়গায় বিচরণ করে। ইলিশের যৌবনপ্রাপ্তির জন্য সমুদ্রে বসবাস করতে হয়। আর ডিম ছাড়ার জন্য মাছটি নদীতে আসে। কারণ ইলিশ সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে ডিম দিতে পারে না। ডিম দিলেও নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য স্বাদু পানি প্রয়োজন। স্বাদু পানিতে ডিম দিলে তা নষ্ট হয় না। এছাড়া যত বেশি উজানে যাবে তত বেশি ডিম থেকে ইলিশ পাওয়ার হারও বাড়বে।

অপরদিকে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পদ্মা নদীর আয়তন অর্ধেক কমেছে। এতে পানির গভীরতার পাশাপাশি কমেছে প্রবাহ। ফলে আবাসস্থল হারিয়ে এখন বিলুপ্তির আশঙ্কায় বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছ। রয়েছে খাদ্য সংকটও।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে চারঘাটের সারদা পর্যন্ত পদ্মার ৭০ কিলোমিটার অংশ নিয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। ওই এলাকার নয়টি পয়েন্টে মৎস্য প্রজাতির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পদ্মা পাড়ের ২৭টি জেলেপল্লি থেকে নেওয়া হয় তথ্য। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে পদ্মার বর্তমান চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করেছেন গবেষক দলের সদস্যরা।

গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের জেলে হবি, দুরুল বলেন,, বাপ-দাদার সময় থেকে এ পেশায় জড়িয়ে থাকলেও এখন আর পোষাচ্ছে না বলে জানান তিনি। বলেন, শৈশব থেকেই পদ্মায় মাছ শিকার করছি। আগে যেখানে কয়েক মন মাছ পেতাম, এখন তা কেজিতে নেমে এসেছে। ফলে সংসার চালাতে পারছি না। হয়তো অচিরেই এ পেশা ছেড়ে ভিন্ন কোনো কাজ করতে হবে। ইতোমধ্যেই অনেকেই মাছ শিকার ছেড়ে কৃষিশ্রমিক হিসাবে কাজ করছেন।

মৎস্য অধিদপ্তর রাজশাহী জেলার তথ্যমতে, পদ্মা নদী থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশীয় মাছ আহরণ হয়েছে ১ হাজার ৮৫০ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২ হাজার ৪০ টন, ২০২১-২২-এ হয়েছিল ২ হাজার ১৫২ টন, ২০২০-২১-এ ২ হাজার ২২১ টন এবং ২০১৯-২০-এ আহরণ হয়েছিল ২ হাজার ২৮৩ টন। প্রতিবছরই মাছ আহরণের পরিমাণ কমছে। গত ৫ বছরে মাছ আহরণ কমেছে ৪৩৩ টন।

মোঃ হায়দার আলী
রাজশাহী।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved.©natunbazar24.com
Developed by: A TO Z IT HOST
Tuhin