রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :-
ভাঙ্গুড়ায় বিধবার মৃ-ত্যুর ঘটনায় অ-পপ্রচারের প্রতিবাদ ও রহস্য উদঘাটনের দাবিতে মান-ববন্ধন সুজানগরে সংযোগ সড়ক ছাড়াই ২৫ বছর ধরে দঁাড়িয়ে আছে সেতু তারাগঞ্জে ছাত্রাবাস থেকে যুবদলের সহযোগীতায় : হে-রোইনসহ ১ মা-দক ব্যবসায়ী আ-টক আশুলিয়ায় কোটি টাকা চাঁ-দা দাবী-ফ্যাক্টরী ও জমি দ-খল-সন্ত্রাসী হাম-লায় সাংবাদিকসহ আহ-ত-২ উজিরপুরে যুবদল নেতাকে কু-পিয়ে হ-ত্যা, পালানোর সময় ৯ জন গ্রেপ্তার গোপালগঞ্জে “জয়বাংলা” স্লোগান দিয়ে পুলিশের ওপর হা-মলা: গাড়ি ভাঙচুর, দুই পুলিশ আহ-ত রায়গঞ্জে বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের আলোচনা সভা ও সুধী সমাবেশ জয়পুরহাটে গ্রামবাংলার হারানো ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছেন লাঠিয়ালরা শাজাহানপুরে সাজাপুর সমাজ কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত অ-বৈধভাবে বালু উত্তোলন, ময়মনসিংহ সদরে ২১ড্রেজার মেশিন ধ্বং-স।।

একই উঠানে বেড়ে ওঠা ৬টি জীবন, সময়ের স্রোতে ৬টি আলাদা ঠিকানা

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২২৬ Time View

ওরা ৬জন। তিন ভাই, তিন বোন। একসময় একই বাড়ির উঠানে তাদের শৈশব কেটেছে, একই আকাশের নিচে বেড়ে উঠেছে তাদের স্বপ্ন। হয়তো এক থালায় খাবার ভাগ করে খেয়েছে, তুচ্ছ কারণে ঝগড়া করেছে, আবার কিছুক্ষণ পরই অভিমান ভুলে একে অপরের হাত ধরেছে। সেই দিনগুলোতে আলাদা হয়ে যাওয়ার কোনো গল্প ছিল না। ছিল শুধু একসঙ্গে থাকার অভ্যাস, রক্তের টান আর নিখাদ ভালোবাসা।

সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে শৈশব পেরিয়ে কৈশোর, কৈশোর পেরিয়ে যৌবন, আর যৌবনের হাত ধরে জীবনের এক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ফেলেছে তারা। একসময় যে চুলে ছিল ঘন কালো আভা, সেখানে আজ রুপালি রঙের ছোঁয়া। মুখের ত্বকে পড়েছে বয়সের ভাঁজ, চোখের কোণে জমেছে অভিজ্ঞতার ছাপ। কাঁধে চেপেছে সংসারের দায়িত্ব, জীবনের হিসাব-নিকাশ আর হাজারো না-বলা গল্প। প্রত্যেকের ঘর হয়েছে, সংসার হয়েছে। তাদের সন্তানরা বড় হয়েছে, কারও ঘরে এসেছে নাতি-নাতনির কোলাহল।

জীবন তাদের অনেক কিছু দিয়েছে, আবার নিঃশব্দে কেড়েও নিয়েছে অনেক কিছু।

একসময় যে বাড়িতে ৬ ভাই-বোনের হাসি, কান্না আর খুনসুটিতে দিন কেটে যেত, আজ সেই বাড়ির মানুষগুলোই যেন ৬টি আলাদা জীবনের বাসিন্দা। প্রত্যেকের সংসার আলাদা, ব্যস্ততা আলাদা, অভিমানও আলাদা। বোনেরা যে বাড়িতে একসময় নিজেদের অধিকার নিয়ে ঘুরে বেড়াত, আজ সেখানে আসে মেহমান হয়ে। যে উঠান ছিল তাদের শৈশবের রাজ্য, সেখানে ফিরে এলেও হয়তো আগের মতো নির্ভার হওয়া যায় না।

কী অদ্ভুত সময়!

যে মানুষগুলোর সঙ্গে একসময় প্রতিদিন দেখা হতো, যাদের সঙ্গে ছোট্ট একটি বিষয় নিয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যেত, আজ তাদের সঙ্গে দেখা করার জন্যও সময় বের করতে হয়। যে ভাইবোনদের মধ্যে একসময় সামান্য খাবার ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও ভালোবাসা ছিল, আজ কখনো কখনো তাদের মধ্যে কথা বলার দূরত্ব তৈরি হয়। কোথাও জমে থাকে অভিমান, কোথাও মনোমালিন্য, কোথাও দীর্ঘদিনের নীরবতা। এমনও হয়, এক ভাইয়ের সঙ্গে আরেক ভাইয়ের কথা হয় না দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, কখনো বা বছরের পর বছর।

অথচ তারা তো একসময় একই বাড়ির সন্তান ছিল। একই বাবা-মায়ের আদর, শাসন আর আশ্রয়ে বেড়ে উঠেছিল।

তাদের বাবা, মরহুম মফিজউদ্দিন, আর মা, মরহুমা জোনাকি, অনেক আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আখানগর গ্রামের সেই বাড়িতে আজও হয়তো তাদের স্মৃতিরা নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায়। যে মা-বাবা ছয়টি সন্তানকে একই ছাদের নিচে বড় করেছিলেন, তাঁরা কি কখনো ভেবেছিলেন—একদিন তাঁদের সন্তানদের জীবন এমন ছয়টি আলাদা পথে ছড়িয়ে পড়বে? যে ঘরে একসময় ছয় ভাইবোনের কণ্ঠে বাড়ি মুখর থাকত, সেই ঘরেই একদিন সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া এত কঠিন হয়ে উঠবে?

হয়তো মা-বাবার স্মৃতিই আজও তাদের অদৃশ্য এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। সুতোটি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ছিঁড়েও যায়নি।

এই ৬ জনের বড় ভাই রহমান, মেজো ভাই সুলতান এবং ছোট ভাই হাকিম। তাঁদের বড় বোন মোমেদা, মেজো বোন শরিফা এবং ছোট বোন ও রিন। নামগুলো আলাদা, জীবনগুলোও আলাদা। কিন্তু তাদের সবার শেকড় একই মাটিতে, একই পরিবারের গভীরে প্রোথিত।

এই গল্পের কথক হিসেবে আমারও একটি ছোট্ট ইচ্ছা ছিল—জীবনের এত পরিবর্তনের পরও একদিন তাঁদের ৬ জনকে একই ফ্রেমে দেখব। শুধু একটি ছবি তোলার জন্য নয়; বরং সময়ের কাছে হারিয়ে যেতে বসা একটি সম্পর্কের মুহূর্তকে ধরে রাখার জন্য। এমন একটি মুহূর্ত, যা ভবিষ্যতে তাঁদের সন্তানরা দেখবে, নাতি-নাতনিরা দেখবে, আর বুঝতে পারবে—তাদের পরিবারের শিকড় কতটা গভীরে বিস্তৃত।

সেই ইচ্ছা থেকেই চেষ্টা করেছি। আমার বড় চাচার কনিষ্ঠ পুত্র সোহেল ভাইয়ের বিয়েতে (১১-১০-২০২৬) অবশেষে তাঁদের ৬ জনকে একই ফ্রেমে আনার সুযোগ হয়েছিল।

সে ফ্রেমে তাদেরকে ক্যামেরা বন্দি করেছিল: আল-মনসুর

কিন্তু বাস্তবতা সব সময় পরিকল্পনা মেনে চলে না। মেজো ফুপ্পি একটু দেরিতে পৌঁছেছিলেন। তাই অন্যদের মতো তাঁরও পোশাক পরিবর্তন করে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ হয়নি। এদিকে অনুষ্ঠানের সময়ও অনেকটা পেরিয়ে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে খুব বেশি আয়োজন করে, নিখুঁত প্রস্তুতিতে ছবিটি তোলা সম্ভব হয়নি। মুহূর্তটিকে ধরে রাখার তাগিদেই সেভাবেই ছবিটি তোলা হয়েছিল।

ছবিটি হয়তো নিখুঁত নয়। কারও পোশাকের সঙ্গে কারও পোশাকের মিল নেই, হয়তো সবার প্রস্তুতিও একরকম ছিল না। কিন্তু ছবিটির মূল্য কি কেবল সাজসজ্জা আর নিখুঁত ফ্রেমে?

এই ছবিতে আছে ৬টি শৈশবের স্মৃতি, ছয়টি জীবনের দীর্ঘ পথচলা, অসংখ্য সুখ-দুঃখের ইতিহাস। আছে এমন কিছু সম্পর্ক, যাদের মধ্যে সময় দূরত্ব তৈরি করেছে, কিন্তু রক্তের বন্ধন আজও একই আছে। এই ছবিতে হয়তো এমন কিছু না-বলা কথাও আছে, যা তাঁরা একে অপরকে কখনো বলতে পারেননি।

সবচেয়ে বড় কথা, এই ছবিতে তাঁরা ৬ জন একসঙ্গে আছেন।

হয়তো অনেক দিন পর কেউ ছবিটি হাতে নিয়ে তাকিয়ে থাকবে। হয়তো তখন তাঁদের কেউ আর এই পৃথিবীতে থাকবেন না। হয়তো ছবির মানুষগুলোর মুখ আরও পুরোনো অ্যালবামের পাতায় স্মৃতি হয়ে থাকবে। তখন এই ছবিটি শুধু একটি ছবি থাকবে না; হয়ে উঠবে একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি প্রজন্মের শিকড়, আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের কাছে রেখে যাওয়া এক টুকরো ভালোবাসা।

জীবন আসলে এমনই। ছোটবেলায় আমরা ভাবি, যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়, তারা সব সময় আমাদের পাশে থাকবে। বড় হতে হতে বুঝি, সময় মানুষকে আলাদা করে, দায়িত্ব মানুষকে ব্যস্ত করে, অভিমান মানুষকে নীরব করে দেয়। কিন্তু দিন শেষে কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলোর শুরু হয় জন্মেরও আগে—একই মায়ের গর্ভে, একই বাবার পরিচয়ে, একই পরিবারের ভালোবাসায়।

তাই হয়তো এখনো দেরি হয়ে যায়নি। হয়তো একদিন আবার তাঁরা ৬ জন একসঙ্গে বসবেন, পুরোনো দিনের গল্প করবেন, শৈশবের কোনো ঘটনা মনে করে হেসে উঠবেন। হয়তো কেউ একজন বলবেন, ‘মনে আছে, আমরা ছোটবেলায় এমন করতাম?’ আর সেই একটি প্রশ্নেই ফিরে আসবে বহু বছর আগের হারিয়ে যাওয়া উঠান, মায়ের ডাক, বাবার শাসন, ভাইবোনের খুনসুটি আর একসঙ্গে কাটানো দিনগুলো।

ঠাকুরগাঁও সদর রুহিয়া উপজেলা ২নং আখানগর গ্রামের মরহুম মফিজউদ্দিন ও মরহুমা জোনাকির ৬ সন্তান—রহমান,সুলতান, হাকিম, মোমেদা, শরিফা ও ওরিন-একই ফ্রেমে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের পেছনে ফেলে আসা একটি শৈশব, পাশে বর্তমানের ব্যস্ত জীবন, আর সামনে সময়ের অনিশ্চিত পথচলা।

ওরা ৬জন। একসময় একই বাড়ির ছয়টি হাসি ছিল, আজ ৬টি আলাদা সংসারের ৬টি গল্প।

তবু সব দূরত্বের ওপারে, সব অভিমানের নিচে, সব পরিবর্তনের পরেও তাঁরা একে অপরের ভাইবোন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved.©natunbazar24.com
Developed by: A TO Z IT HOST
Tuhin