
লেখকঃ মোঃ হায়দার আলীঃ মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধ ও যুবসমাজকে রক্ষায় বর্তমান সরকার শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাদককে দেশের জন্য একটি বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে, তা নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।
অপর দিকে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন, গত ২০ বছরে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুধু মাদক ব্যবসা করেই ১ হাজার ব্যক্তি কোটিপতি বনে গেছেন। অবিলম্বে এসব মাদক কারবারিদের ধরে আইনের আওতায় আনতে পুলিশকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ১৩ জুন শনিবার দুপুরে নানকিং দরবার হলে রাজশাহীতে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন সুরক্ষা: চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকার’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
ভূমিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, “উন্নয়ন ও অর্জনে রাজশাহী সব সময়ই এগিয়ে ছিল। কিন্তু বিগত ২০ বছরে সবকিছু নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।” এ সময় তিনি অতীত ভুলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুনরুদ্যমে কাজ করার আহ্বান জানান।
মাদকের কারণে যুব সমাজ আজ ধ্বংসের পথে, এদের বাঁচাতে না পারলে সমাজ দেশের ব্যপক ক্ষতি হবে। আগামীতে দেশের উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, নির্বাচনকে সামনে রেখে এক সময় লুকিয়ে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার তালিকাভুক্ত মাদ্রক মাদক ব্যবসায়ী ও সম্রাটরেরা এলাকায় ফিরে এসে, অসৎ কিছু পুলিশ, ডিবিপুলিশ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা, পাতিনেতা, জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ সহযৌগিতায় বীর দাফটে তাদের অবৈধ মাদক কারবার শুরু করেছেন। কেউ কেউ জামায়াত, বিএনপির বিভিন্ন দলীয় অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে অবস্থান করছেন। কেউ মোটা অঙ্কের ডোনেশন, ইয়ানত, চাঁন্দ দিয়ে নিজেকে বিএনপি ও জামায়তের নেতা পরিচয় দেয়া শুরু করেছেন। এসব মাদক ব্যবসায়ীগন বাঁচার তাগিদে আওয়ামীলীগের এমপি, মন্ত্রী, নেতাদের একই ভাবে মোটা অংকের মাসোহারা দয়ে, গাড়ী, বাড়ী লিখে দিয়ে মুজিব কোর্ট পড়ে হয়েছিলেন আওয়ামীলীগের নেতা, চেয়ারম্যান, মেম্বার, কাউন্সিলর, মেয়র, এমপি। মাদক ব্যবসায়ীদের কোন দল নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সে দলকে মোটা অঙ্কের চান্দা, ডোনেশন, ইয়ানত দিয়ে ওই দলের আস্থাভাজন হয়ে যান।
গত ৯ মার্চ রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মাটকাটা আদর্শ ডিগ্রি কলেজে জামায়াতের ইফতার মাহফিলে কুখ্যাত মাদককারবারি সেতাবুর রহমান বাবুর উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছিল। এ ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সিনিয়র নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।
মঞ্চে ঠিক তার পেছনের সারিতেই আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বসে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত এ অঞ্চলের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বাবু। জামায়াতের এ আয়োজনে বাবুর উপস্থিতির ভিডিও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছিল।
রাজশাহী-১ আসনের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ফারুক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী যুবলীগ নেতা বাবুর উপস্থিতিতে জামায়াতের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, সেতাবুর রহমান বাবুর বাড়ি মাটিকাটা ইউনিয়নের (ইউপি) রেলগেট এলাকায়। ওই ইউপির সদস্য ছিলেন বাবু। হেরোইনসহ গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকায় তিনি বরখাস্ত হয়েছেন। বাবু বর্তমানেও যুবলীগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে তার নামে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
রাজশাহী জেলা যুবদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম অরণ্য কুসুম বলেন, আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের দুঃশাসনের সময় এই এলাকার তৎকালীন এমপি ফারুক চৌধুরীর ডান হাত বাবু এলাকায় অনেক অত্যাচার করেছেন। ইসলামের কথা বলে জামায়াত মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। আমরা শুনছি যে জামায়াতের এই ইফতার মাহফিল আয়োজনের পুরো টাকাটাই দিয়েছে মাদককারবারি বাবু। আওয়ামী লীগের এই সন্ত্রাসী ভোট কেন্দ্র দখলে নিতে আমার বাবাকে হত্যা করেছে। তাকেই এখন দেখা যাচ্ছে জামায়াতের মঞ্চে, একেবারে এমপির পাশে। এটা খুব দুঃখজনক। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ঢাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন। আর এলাকায় এসে আওয়ামী লীগ ও মাদককারবারিদের পুনর্বাসন করছেন। এলাকার মানুষ হিসেবে আমাদের এর চেয়ে কষ্টের আর কিছু হতে পারে না। জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. কামরুজ্জামানকে ইফতার মঞ্চে বাবুর উপস্থিতির বলেন, বাবু কিভাবে মঞ্চে এলেন- সেটি বলতে পারব না। এ ব্যাপারে দলের দায়িত্বশীলরাও বলতে পারছেন না। আমরা এ ধরনের লোককে প্রশ্রয় দেয় না। তিনি বাঁচার জন্য হয়ত এখানে এসেছেন। আর বাবুর ইফতার মাহফিলের টাকা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না বলে মন্তব্য করেছেন এ নেতা।
মাদক ব্যবসায়ীরা সমাজ, জাতি, দেশের জন্য সুখকর হতে পারে না।
বিগত দিনে প্রধানমন্ত্রী, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষনা করলেও মাদক কারবার বন্ধ হচ্ছে না। বরং বেড়েই চলেছে মাদক কারবার। মাদক ব্যবসায়ীরা লক্ষ লক্ষ টাকা উৎকোচের বিনিময়ে বিএনপি ও আওয়ামীলীগের পদ পদবী বাগিয়ে নিয়েছেন, বিভিন্ন সংস্থার তালিকাভুক্ত মাদক সম্রাট, মাদক ব্যবসায়ীরা। এক এক জনের বিরুদ্ধে ৩/৪ টি বেশী মাদকের মামলা চলমান রয়েছে অথচ ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা উৎকোচ দিয়ে হয়েছেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের ওয়ার্ড, ইউনিয়ন থেকে পৌরসভার, উপজেলা পর্যায়ে সভাপতি, সাধারন সম্পাদক, সাংগাঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদ পেয়েছেন। ওই সব হাইব্রিড, পরগাছা, অনুপ্রবেশকারী নেতারা পদ পেয়ে গঠনতন্ত্র বিরোধী কর্মকাণ্ডে ছড়িয়ে পড়ছেন, মাদক, টেন্ডারবাজি, পশুহাটে, বালুঘাটে, খাসপুকুর, খাসজমি, চাঁদাবাজি, জমি দখল, খাসপুকুর দখল, সরকারি খাদ্যগুদামে রাতারাতি গম, ধান, চাল অবৈধভাবে প্রবেশ করিয়ে অঙ্গুল ফুলে কলাগাছ, তার পরে বটবৃক্ষ হয়েছেন। কেউ এখন দল থেকে বহিস্কার হচ্ছেন। পদ হারিয়েও যেন তারা কোটিপতি, ফুলে ফেঁপে উঠেছে। শুধু কি তাই নির্বাচনে কালো টাকার প্রভাব খাটিয়ে হয়েছেন মেম্বার, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান, মেয়র। তারা নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে মাদক ব্যবসাকে আরও উৎসাহিত করছেন। কিছু অসৎ পুলিশ, ডিবি পুলিশ সদস্য, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকতা, মাদকব্যবসায়ীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার অভিযোগ অনলাইন, স্থানীয়, জাতীয় পত্রিকা, টিভি সংবাদে উঠে এসেছে, মূলত এদের কারনে প্রধানমন্ত্রীর নিদেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না ।
১০/১৫ বছর আগে যারা যারা কামলা, লেবার, সাইকেল মেকার, কুলি, মুদিখানার দোকানে তেল মাপতো, রাজমিস্ত্রি, যোগালি, রিকসা চালক, বয়েল ডিম বিক্রেতা, ঢাকা গাড়ীর হেলপার, নৌকার মাঝিগিরি করতো তারা মাদক ব্যবসা, হন্ডি ব্যবসা করে শূন্য থেকে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন, কিছু ব্যাংক কর্মকতা হন্ডি, মাদক ব্যবসায়ীদের সহযৌগিতা করছেন, আশ্রয় প্রশয় দিচ্ছেন নিরপেক্ষ তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহনসহ সকল অবৈধ সম্পদ সরকারী কোষাগারে জমা করার ব্যবস্থা গ্রহনের ব্যবস্থা করলে মাদক বন্ধ হতো বলে জন্য সচেতন মহল মনে করেন।
২৩ এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিঃ সকাল ১০ টার সময় রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সাড়ে ৬ কেজি হেরোইন ও নগদ ১৩ লক্ষ টাকাসহ আন্তজাতিক মাদক চোরাকারবারীর গডফাদার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী তারেককে গ্রেপ্তার করা হয়। উপজেলার তিরিন্দা ভাজানপুর এলাকা থেকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর রাজশাহী বিভাগীয় গোয়েন্দা অফিস অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেফতার করে।
গ্রেপ্তার আসামির নাম তারেক হোসেন (৩৬)। তিনি জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার মাদারপুর এলাকার রফিকুল ইসলাম রাজমিস্ত্রির ছেলে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার কাছে সাদা প্লাস্টিকের বস্তার ভেতরে বাদামী বর্ণের ৮টি পলি প্যাকেটে ৫০০ গ্রাম করে ৪ কেজি এবং এককই বস্তায় ২৫ প্যাকেটে ১০০ গ্রাম করে আরও আড়াই কেজি হেরোইন পাওয়া গেছে। এছাড়া তার কাছে মাদক বিক্রির ১৩ লক্ষ টাকা, একটি মোবাইল ও ইলেকট্রিক সীল মেশিন জব্দ করা হয়েছে। গম ও ভুট্টার বস্তার আড়ালে এগুলো লুকানো ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক গোলাম আজম বলেন, বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে আসামি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের টিম তাকে আটক করে। পরে সে মাদকের কথা স্বীকার করে। তার নিজস্ব খামার ও মার্কেট, শত শত বিঘা জমি রয়েছে। সেখানে তাকে নিয়ে গিয়ে সাড়ে ৬ কেজি হেরোইন ও ১৩ লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হয়। অধিদফতরের ইতিহাসে এযাবতকালের সর্ববৃহৎ হেরোইন চালান এটি। আটক আসামি হেরোইন চোরাচালানের গডফাদার। মহিশালবাড়ী বাজারের সেকু ও মনিরুলের মুদির দোকানে কামলা দিয়ে কর্মজীবণ শুরুকরা তারেক কি আলাউদ্দিনের চেরাক হতে পেয়েছিল। একমাত্র যাদুর কাঠি মাদকই তাকে শূন্য থেকে শত শত কোটি টাকার মালিক করে দিয়েছে। তার টাকা ও উপডোকনের হার মেনেছে আইনশৃঙ্খলা বাহনীর অনেক সদস্য। ওই মাদক মামলায় তিনি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের মেডিকেলে রয়েছে জামাই আদরে। কারাগারে থাকলেও তার মাদকব্যবসা থেমে নেই। শাড়ী কাপড়ের দোকান ও গরুর খামারের আড়ালে তার আত্নীয়স্বজন অবৈধ কারবার চালিয়ে যাচ্ছে বলে ব্যপক অভিযোগ রয়েছে।
ওই সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মাসুদ হোসেন বলেন, আফগানিস্তানে আফিম নিষিদ্ধ হয়েছে। সেটা পুরোপুরি মিয়ানমারে শিফট হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের বর্ডার আছে। তাই দেশে মাদক ঢুকা সহজ হয়েছে। সেক্ষেত্রে এখানে ঢুকছে। তবে ডিএনসি বসে নেই। ধরা পড়ছে বেশি, আইনের আওতায় আসছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর রাজশাহী বিভাগীয় গোয়েন্দা অফিসের উপপরিচালক জিললুর রহমান বলেন, আটক তারেক আমাদের নজরদারিতে ছিল।
২০২৫ খ্রিঃ রবিবার (২৩ নভেম্বর) রাতে গোদাগাড়ী উপজেলার মাদারপুর ডিমভাঙ্গা এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করে
র্যাব-৫ এর অভিযানে ১ কেজি হেরোইনসহ চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী মো. সিয়াম (১৯) কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। র্যাব জানায়, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অপরাধ দমন এবং মাদক নির্মূলে র্যাব নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এরই অংশ হিসেবে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সিপিএসসি, র্যাব-৫ এর একটি দল রবিবার রাতে মাদকবিরোধী এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে ১ কেজি হেরোইন, একটি মোবাইল ফোন ও একটি সিম কার্ড জব্দ করা হয়। এ সময় মাদক ব্যবসায়ী মাদারপুর গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে মো. সিয়ামকে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাব জানায়, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সংঘবদ্ধ একটি মাদক চক্র দীর্ঘদিন ধরে হেরোইন দেশে পাচার করছে। চক্রটি বিভিন্ন পেশার ছদ্মবেশে অত্যন্ত সুকৌশলে মাদক পরিবহন ও সরবরাহ করে থাকে। গোয়েন্দা নজরদারির অংশ হিসেবে র্যাব-৫ দীর্ঘদিন ধরে চক্রটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। গ্রেপ্তার সিয়াম প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানান, সে দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত চর এলাকা থেকে হেরোইনের চালান সংগ্রহ করে নিজ বাড়িতে মজুদ রাখত এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে তা সরবরাহ করত। সে পদ্মার চর থেকে মাদক সংগ্রহ করে বাড়ির চালের ভেতরে লুকিয়ে রাখে। পরে র্যাব সদস্যরা উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় এক কেজি হেরোইন উদ্ধার করে। র্যাব জানায়, সিয়াম বহুদিন ধরে মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িত এবং পূর্বেও তাকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করা হলেও সে বিভিন্ন সময়ে আত্মগোপনে চলে যেত। তার বিরুদ্ধে গোদাগাড়ী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছে।
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে র্যাব-৫ এর অভিযানে ৩১৫ গ্রাম হেরোইনসহ মো. আদিল ইসলাম (৪০) নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২৫ খ্রিঃ ১৯ জুন রাত ২টায় গোদাগাড়ী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের লালবাগ গ্রামে তার নিজ বাড়ি থেকে তাকে আটক করে র্যাব-৫, সিপিসি-১, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্যাম্পের একটি আভিযানিক দল।
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃত আদিল ইসলাম গোদাগাড়ী থানার লালবাগ গ্রামের মো. সইবুর রহমানের ছেলে। তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দিয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
গত ১৬ জুন দুপুরে কক্সবাজারের টেকনাফে কোস্ট গার্ডের অভিযানে ১ লাখ ৩০ হাজার পিস ইয়াবাসহ এক মাদক কারবারিকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা ইয়াবার আনুমানিক মূল্য ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড। মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে টেকনাফ কোস্ট গার্ড স্টেশনের একটি দল উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের আলিখালী সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানের সময় সন্দেহজনক একটি বসতঘরে তল্লাশি চালিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় একজন মাদক কারবারিকে আটক করা হয়। মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান কোস্ট গার্ডের এই কর্মকর্তা।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় মাদক দ্রব্যের উপস্থিতি সুপ্রাচীনকাল থেকেই। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়া, এসিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে আফিমের নেনাক প্রমাণাদি পাওয়া যায়
বাংলার প্রাচীনতম কাব্য চর্চা পদেও তার যথেষ্ট প্রমান রয়েছে। সবচেয়ে প্রাচীন মাদকটির নাম হচ্ছে আফিম গাঁজা, ফেনসিডিল, নতুন সংযোজন হয় ইয়াবা। এ ছাড়া গাঁজা, আফিম, চরশ, বাংলা মদ, গুল, মরফিন, কোকেন, বিয়ার, ওয়াইন, হেরোইন, প্যাথেলিন, মারিজুয়ানা, ডেক্রপরটেন, প্যাথেডিন কোকেন চোলাইমদসহ বর্তমানে মাদক, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীর তালিকা দিনে দীর্ঘ হচ্ছে। কোন ভাবে থামানো যাচ্ছেনা এ অবৈধ মাদক কারবার। ফলে সব চেয়ে ক্ষতি গ্রস্থ হচ্ছে যুব সমাজ। দেশে মাদকের বিস্তৃতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তরুণ ও যুবসমাজ ব্যাপক হারে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে।
মাদককে আক্রান্ত তরুণ ও যুবসমাজ ধ্বংসের পথে। বর্তমান সমাজে মাদক জন্ম দিচ্ছে একের পর এক অপরাধ। শুধু মাদকের কারনে ছেলের হাতে বাবা মা ভাই, স্ত্রী হাতে স্বামী, স্বামীর হাতে স্ত্রী, প্রেমিকের হাতে প্রেমিকা, প্রেমিকার হাতে প্রেমিক খুন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুনাক্ষনির ঘটনা ঘটছে। পত্রিকায় পত্র পত্রিকায় খবর বের হয়েছে।
মাদকের ছোঁয়ায় সম্ভাবনাময় তারুণরা অধঃপতনের চরম শিখরে উপনীত হচ্ছে। মাদক এখন সহজলভ্য। রাজধানী শহর-নগর, গ্রামসহ মফস্বল এলাকায়ও হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় মাদক। আশির দশকের শেষ দিকে হেরোইন ফেনসিডিলের আবির্ভাব হয়। পর্যায়ক্রমে এটার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। নব্বইয়ের দশকে মাদকের জগতে সংযোজন হয় ইয়াবা। এ ছাড়া গাঁজা, আফিম, চরশ, বাংলা মদ, গুল, মরফিন, কোকেন, বিয়ার, ওয়াইন, হেরোইন, ইয়াবা, প্যাথেলিন, মারিজুয়ানা, ডেক্রপরটেন, প্যাথেডিন কোকেন চোলাইমদসহ রকমারি মাদকের প্রতি তরুণদের আসক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২৭ জানুয়ারি ২০২৪ খ্রিঃ গোদাগাড়ী মডেল থানার ওসি আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে রাত ১১টা থেকে রাত তিনটা পর্যন্ত গোদাগাড়ী পৌর এলাকার রেলওয়ে বাজার এলাকায় গরুর খামার বাড়িতে অভিযান চালানোর সময় বাড়ির মালিক ফরিদুল ও কেয়ারটেকার সোহেল রানা কৌশলে দেওয়াল টপকিয়ে পালিয়ে যান। অভিযানে ৮ কেজি ৪০০ গ্রাম উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত হেরোইন গুলোর আনুমানিক মূল্য ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আসামী গ্রেফতার করতে না পারলেও এ ঘটনায় পলাতক আসামী করে ওই গ্রামের আজিজুল হক বানুর ছেলে ফরিদুল ইসলাম ও বাড়ীর কেয়ারটেকার মহিশালবাড়ী গ্রামের আতাউর রহমানের ছেলে সোহেল রানার নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ সুপার মোঃ সাইফুর রহমান (পিপিএম) বলেন, ফরিদুল ও সোহেল চিহ্নিত মাদক কারবারি। তাদের বিরুদ্ধে এর আগেও মাদকের মামলা হয়েছে। জামিনে বের হয়ে আবারও মাদক কারবারে জড়িয়ে যাচ্ছে। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক সরবরাহ করতো। সবচেয়ে নিরাপদ এলাকা হচ্ছে উত্তরবঙ্গের গোদাগাড়ী পৌরসভা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা কেন না।
এ রুটে ৬ দিনে ২২ কেজি ১৪০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করেছে আইন প্রয়োগকারি সংস্থার সদস্যগন। বাংলাদেশ দেশ ও ভারতের মাদক চোরাকারবারীরা একজোট হয়ে বিজিবি, বিএসএফ এর চোখ ফাঁকি দিয়ে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী পথগুলি দিয়ে বিষবাষ্পের মত পাচার করছে বড় বড় হেরোইনের চালান।
এসব মাদক ব্যবসায়ীদের পদ্মা নদীর ওপারে মানিক চক, কোদলকাটি, আষাড়িয়াদহ, আলাতুলি, চর অনুপনগর, বগচর, চাটাইডিগি, ক্লাবঘাট, জালিয়াপাড়া এবং নদীর এপারে মাদারপুর, ডাঙ্গাপাড়া, পুরাতন মহিউদ্দীন কলেজ, শিবসাগর, সিএন্ডবি, গড়ের মাঠ, আদর্শপাড়া, হেলিপেড, হাটপাড়া, সুলতানগজ্ঞ, সারাংপুর প্রেমতুলী, বিদিরপুর, পিরিজপুর, বসন্তপুর প্রভূতি এলাকায়।
শুধু কি তাই রাজশাহী, ঢাকা, পাবনা, বগুড়া, চিটাগাং প্রভূতি এলাকায় রয়েছে বিলাসবহুল, রাজকীয় বাড়ী, মার্কেট। এদের নামে বেনামে সম্পদের পাহাড় দেখে মনে হয় রুপকথার গল্পকেও হারমানায়। বিজিবি, পুলিশ, ডিবিপুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যগণ যখন পদ্মানদীর ওপারে অভিযান পরিচালনা করে তখন তারা এপারে রাজকীয় বাড়ী আশ্রয় গ্রহন করেন এবং পারে অভিযান শুরু করলে, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা পাবনা বগুড়ায় পালিয়ে যায়।
গত বছর ৩০ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৩ ঘটিকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানাধীন চর দেবীনগর নামক এলাকায় অপারেশন পরিচালনা করে ২ কেজি উদ্ধারসহ মাদক সম্রাট মোর্তজা আলীকে গ্রেফতার করেন। গ্রেফতারকৃত মোঃ মোর্তজা আলী (২৮) এর পিতার নাম মৃত সাইদুর রহমান, বাড়ী চাঁপাইনবাবগঞ্জ’ জেলার সদর উপজেলার
চর দেবীনগর (ইব্রাহিম মন্ডলের টোল), গ্রামে। র্যাব-৫ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব-৫, রাজশাহীর সিপিএসসি, মোল্লাপাড়া ক্যাম্পের একটি অপারেশন দল জানান,
আটককৃত মোর্তজা আলীকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, সে একজন পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী। সে দীর্ঘদিন যাবত অজ্ঞাত স্থান থেকে মাদকদ্রব্য হেরোইন সংগ্রহ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীদের নিকট সরবরাহ করে। ইতিপূর্বে মাদকের আরো কয়েকটি চালান পাচার করেছিল বলে স্বীকার করে।
৮ /৯ কেজি হেরোইন উদ্ধার করা হলো কিন্তু বড় চালান ১০কেজি/২০ কেজি/৩০কেজি পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশের বিভন্ন স্থানে পাচার করা হয়েছে, আর এগুলি সেবন করে হাজার হাজার অকালে পুঙ্গত্ববরণ করছেন। লাখ পরিবারের মাঝে অশান্তি বিরাজ করছে মাদক ব্যবসায়ীরা, অসৎ পুলিশ সদস্যগণ কখনও চিন্তা করেন? শুধু মাত্র গোদাগাড়ী পৌরসভায় কয়েক শত লোক মাদকব্যবসা করে শূন্য থেকে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, বিভিন্ন মার্কেটে দোকান, রাজকীয় বাড়ী, প্লট, জমি, ব্যাংক ব্যালেন্সসহ সম্পদের পাহাড় গড়েতুলছেন রহস্যজনক কারণে প্রশাসন দেখে না দেখার ভান করছেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বিধ্বংসকারী মাদকের বিস্তার সমাজে যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে সচেতন অভিভাবক মহল, প্রশাসনও উদ্বিগ্ন। মাদক ব্যবসায়ীগণ ভারত থেকে কোটি কোটি টাকার হেরোইন দেশে নিয়ে আসে আর বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কিছু অসৎ ব্যাংক কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ পরোক্ষ সহযোগিতায় হন্ডির মাধ্যমে পাচার করার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এদের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে দেশের ব্যাপকক্ষতি হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের ওপরে শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ মানুষ মাদকাসক্ত। মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। না বুঝেই অনেক তরুণ এ পথে পা দিয়ে বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, মাদক সেবনের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ৮০ লাখ মানুষ এবং বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ লাখ ২৬ হাজার মানুষ মারা যায়। বাস্তবে এই সংখ্যা আরো বেশি।
মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে এক একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মাদকাসক্ত সন্তানকে নিয়ে পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে পড়ছে। পথশিশুরাও আজ ভয়াবহ নেশায় আসক্ত হচ্ছে। মাদকের নেশা কেবল আত্মঘাতী নয়, সমাজ, দেশ, মনুষ্যত্ব সর্বোপরি বিশ্বব্যাপী ডেকে আনছে বিপর্যয়। ব্যক্তিজীবনে যেমন মাদক স্বাস্থ্য, সম্পদ, মানসম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি নষ্ট করে ব্যক্তিকে করে তোলে সমাজের ঘৃণা ও নিন্দার একশেষ, তেমনি সমাজজীবনেও আনে অস্বাস্থ্য, অলসতা, অকর্মণ্যতা এবং সামাজিক অপরাধের সীমাহীন নিষ্ঠুরতা। ধ্বংস হয়ে যায় মাদকসেবীর রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, চাকরি, সামাজিক মূল্যবোধের মতো অমূল্য গুণগুলো। আজকের পৃথিবীতে এই ব্যাধি পরিব্যাপ্ত দেশ থেকে দেশান্তরে। নেশার উপর ভর করে একদল নেশার ব্যবসায়ী আজ মানুষ কর্তৃক মানুষ মারার নেশায় বুঁদ হয়ে ধ্বংস করতে যাচ্ছে বিশ্বের সর্বজনীন মূল্যবোধ, প্রেম-প্রীতি, স্নেহ-ভক্তি রসধারাকে সীমাহীন আত্মঘাতী নিষ্ঠুরতায়।
সমাজসেবা অধিদফতরের এক গবেষণায় দেখা যায়, শহর, গ্রাম থেকে নিয়ে স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মাদকাসক্ত হচ্ছে। দেশের ভিতরে যত্রতত্র চলছে মাদকের রমরমা বাণিজ্য। প্রতিনিয়িত বসছে নেশার আড্ডা। অনেকে নেশার টাকা জোগাড় করতে নেমে পড়ছে অপরাধ জগতে। মাদকের চাহিদা মেটাতে তরুণ-তরুণীরা ক্রমেই অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। অনেক শিক্ষার্থী নেশার মোহে পড়ে সম্ভাবনাময় জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে একজন মানুষ যখন অপরাধজগতে পা বাড়াচ্ছে।
পারিবারিক বিপর্যয়গুলো বিশেষজ্ঞদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। এই সর্বনাশ মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্রকে মোটেও বিচলিত করে না। তারা কেবলই বোঝে ব্যবসা। তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছে মরণনেশার উপকরণ মাদক। তরতাজা তরুণদের মেধা, বিবেক, লেখাপড়া, মনুষ্যত্ব সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে ইয়াবার ভয়াবহ নেশা। বিনষ্ট করে দিচ্ছে স্নেহ, মায়া, ভালোবাসা, পারিবারিক সুবন্ধন। মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে অহরহ বাবা-মা, ঘনিষ্ঠ স্বজন নির্মম হত্যার শিকার হচ্ছে। নেশাখোর বাবা মাদক সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে কান্ডজ্ঞান হারিয়ে প্রিয় সন্তানকে খুনও করছে অবলীলায়। নেশার টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, মাকে জবাই করা, আদরের সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটছে।
প্রতিবছর দেশে ঘটা করে ২৬ জুন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। ওই দিবসের মাদকব্যবসায়ীদের উপস্থিত লক্ষ্য করা যায়। এ যেন সরিষায় ভুতের মত অবস্থা।
নেশা মানুষের স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত করে তোলে। মাত্রাতিরিক্ত মাদক সেবন রোগীর মানসিক অবসাদ ঘটায় এবং হেপাটাইটিস বি ও সি, এইচআইভি-এইডস ও যক্ষ্মার মতো ভয়ানক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দেয়। এই নেশাবিরোধী অভিযান, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন কর্মসূচিতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সুতরাং ঘন ঘন রোগে আক্রান্ত হওয়া কিংবা মারা যাওয়া উভয় ক্ষেত্রেই দেশের প্রচুর অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়। এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, নেশাবিরোধী অভিযান সরকারি অর্থের সুরক্ষা করতে পারে।
নেশাগ্রস্ত লোক যে শুধু নিজের ক্ষতি করে এমন নয়, পারিপার্শ্বিক মানুষের নিরাপত্তাও সঙ্কটাপূর্ণ করে তোলে। নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালালে পথ দুর্ঘটনায় চালকের যেমন ক্ষতি হয় পথযাত্রীদের সমান খেসারত দিতে হয়। গবেষণায় জানা গেছে, ভাং খেয়ে গাড়ি চালালে দুর্ঘটনার আশঙ্কা ৯.৫ গুণ এবং কোকেন ও ব্যাঞ্জোডায়াজিপাইনের ক্ষেত্রে ২ থেকে ১০ গুণ বৃদ্ধি পায়। এম্ফিটামিন ড্রাগে এই আশঙ্কা ৫ থেকে ৩০ গুণ এবং মদের সঙ্গে অন্য ড্রাগ মিশিয়ে খেলে ২০ থেকে ২০০ গুণ বৃদ্ধি পায়।
বিশ্বের প্রায় সবক’টি মহাদেশেই অবৈধ মাদক উৎপাদিত হয় কিংবা ব্যবহৃত হয়, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশও এই বিষয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশে আফিম ও ভাং এর প্রচলন সুপ্রাচীন। বিগত তিন দশকে হেরোইন, এম্ফিটামিন, কোকেন এবং নানা ভেষজ ওষুধ রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে প্রবেশ করেছে, যা অবৈধ মাদকের ভয়াবহতাকে আরও উসকে দিয়েছে। এক সময় গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গাল অর্থাৎ মায়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড কিংবা গোল্ডেন ক্রিসেন্ট অর্থাৎ আফগানিস্তান, ইরান ও পাকিস্তান থেকে অবৈধ ড্রাগ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে শুধু পাচার হতো। কিন্তু আজ এই চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইয়াবা নামক নেশা দ্রব্য আজ সমাজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে সৃষ্ট করছে নানা বিপর্যয়।
২৬ জুন, ২০২৫ একটি প্রথম শ্রেণীর জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে, জানা গেছে, দেশে এখন মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ লাখ। মাদকাসক্তদের বেশির ভাগ পুরুষ। নারী ও শিশুদের মধ্যেও মাদকাসক্তি রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক সমীক্ষায় মাদকাসক্ত জনসংখ্যার এই প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ ধরনের সমীক্ষা এই প্রথম করেছে ডিএনসি। এর আগে ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট একটি সমীক্ষা করেছিল, সেখানে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল ৩৬ লাখ।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক একটি জাতীয় দৈনিকে সাক্ষাকারে বলেন, মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা যদি ৮৩ লাখে পৌঁছে যায়, তবে সেটি দেশের মাদক পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি নির্দেশ করে। এটা প্রমাণ করে, দেশে মাদক একেবারেই নিয়ন্ত্রণে নেই। তিনি মনে করেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৬১ লাখ গাঁজায় (প্রায় ৫২ শতাংশ), ২৩ লাখ ইয়াবায় (প্রায় ২০ শতাংশ) ও ২০ লাখ ২৪ হাজার মদ্যপানে (১৭ শতাংশ) আসক্ত। ৩ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ফেনসিডিল ও সমজাতীয় মাদকে এবং ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ হেরোইনে আসক্ত।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, যে পথে দেশের ইয়াবার চালান ঢুকছে, সেই একই পথে ঢুকছে আইস। জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে নৌপথে নাফ নদী পেরিয়ে ৯০ শতাংশ আইস দেশে আসছে। অধিকাংশ বড় চালানই ধরা পড়েছে গত দেড় বছরে। আশির দশকের শুরুতে দেশে মাদক বলতে মূলত ছিল ফেনসিডিল। ভারত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা দিয়ে এ মাদক দেশে ঢুকত। তবে গত এক দশকে পরিস্থিতি পালটে যায়। ফেনসিডিলের পরিবর্তে দেশে ইয়াবার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। এখন আসছে আইস। সুতরাং, চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে দেশে মাদকের, বিশেষত নতুন নতুন মাদকের সরবরাহ বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অপ্রচলিত বিভিন্ন ধরনের মাদকও ধরা পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফেনইথাইলামিন, এলএসডি, ডায়মিথাইলট্রিপ্টামাইন বা ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, খাত (ইথিওপিয়ার উঁচু ভূমিতে জন্মানো এক ধরনের উদ্ভিদের পাতা), কুশ (মারিজুয়ানা প্রজাতির গাছ), এক্সট্যাসি, হেম্প, ফেন্টানিল, মলি ও এডারল। বিদেশে এসব মাদক প্রচলিত হলেও বাংলাদেশে অপ্রচলিত। তবে নতুন এসব মাদকের প্রভাব ইয়াবার চেয়েও বেশি। গত তিন বছরে এসব মাদক বিভিন্ন দেশ থেকে নানাভাবে এ দেশে এসেছে। কোনো চালান এসেছে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে, কোনোটি বিদেশ থেকে উড়োজাহাজে কোনো যাত্রী নিয়ে এসেছেন। আবার কোনো কোনো মাদক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়েছে।
সম্প্রতি মাদক সম্পর্কিত আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মাদক ব্যবসার কারণে দেশে বছরে পাচার হয় প্রায় ৫ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড তাদের ওয়েবসাইটে অবৈধ অর্থপ্রবাহ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। পাচার করা টাকার হিসাব অনুমানভিত্তিক হিসাবে তুলে ধরেছে সংস্থাটি। এতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯টি দেশের মাদকসংশ্লিষ্ট অবৈধ অর্থপ্রবাহের হিসাব তুলে ধরা হয়। তথ্য বিবরণীতে আরও বলা হয়েছে, মাদকসংশ্লিষ্ট অর্থ পাচারের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। আর এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে। অবৈধ অর্থপ্রবাহ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে আঙ্কটাড বলেছে, মাদক ব্যবসার কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর পাচার হয় ৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা।
মাদকদ্রব্য অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন ও শাস্তির বিধান : হেরোইন, ফেনসিডিল, আফিম, মরফিন, নেশার ইনজেকশন, গাঁজা, ভাং, মদ, তাড়ি, ঘুমের ওষুধ ইত্যাদির উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বহন-পরিবহণ, ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিষিদ্ধ ও মারাত্মক অপরাধ। এসব অপরাধ দ্রুত বিচার আদালতে বিচার্য এবং এক্ষেত্রে সাধারণত জামিন দেওয়া হয় না। মাদক অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড।
মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও মাদকাসক্তি দেশের উন্নয়নে অন্যতম বাধা বলে মনে করছেন অনেকেই। তাই এ বাধা দূর করতে মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। সেই সঙ্গে মাদকসহ গ্রেফতারকৃতরা এবং মাদক ব্যবসায়ীরা যাতে জামিনে ছাড়া না পায়, সেজন্য নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। মাদকাসক্ত ও তার পরিবারের প্রতি বাড়াতে হবে সহযোগিতার হাত, তবেই বাস্তবায়ন হবে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি। কারণ, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। মাদক-ব্যবসায়ী ও মাদক চোরাচালানকারীরা দেশ ও জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু। এদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধে সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। মাদকাসক্ত অভ্যাস নির্মূলের জন্য যুব সমাজের একটি সিদ্ধান্ত যথেষ্ট। যুব সমাজের একটি দৃপ্ত শপথই পারে তাদের মাদকের অন্ধকার থেকে ফেরাতে। মাদকাসক্ত হয়ে পৃথিবীতে কেউ কিছুই করতে পারেনি নিজেকে ধ্বংস ছাড়া। তাই আসুন মাদক মুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন শুরু করি। মাদকমুক্ত সমাজই হোক তারণ্যের অহঙ্কার
মো. হায়দার আলী।।