
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বিশেষ প্রতিনিধি:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন উপকূলে নিষিদ্ধ নেটজাল দিয়ে অবাধে চলছে গলদা ও বাগদা চিংড়ির রেণু (পোনা) আহরণ। পরিবেশবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মাত্র চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রায় ২০০টিরও বেশি অন্যান্য মাছ ও জলজ প্রাণীর পোনা ধ্বংস করা হয়। ফলে একদিকে যেমন কমে যাচ্ছে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ, অন্যদিকে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে নদী ও বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এবং বনসংলগ্ন নদ-নদীতে সব ধরনের মাছ ও চিংড়ির রেণু আহরণ আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিন শত শত নৌকা নিয়ে অসাধু চক্র বাগেরহাটের মোংলার পশুর নদী, শ্যালা নদীসহ বনসংলগ্ন বিভিন্ন জলপথে নিষিদ্ধ নেটজাল ব্যবহার করে রেণু সংগ্রহ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলেরা জাল টেনে আনার পর গলদা ও বাগদা চিংড়ির রেণু আলাদা করে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু জালে আটকে পড়া অসংখ্য দেশীয় মাছের পোনা, কাঁকড়া, চিংড়ির অন্যান্য প্রজাতি এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণীর লার্ভা ফেলে দেওয়া হয় অথবা সেখানেই মারা যায়। ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জলজ প্রাণীর প্রাকৃতিক প্রজনন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে দীর্ঘদিন ধরে রেণু আহরণ চলতে থাকলে সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। এর প্রভাব পড়বে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামগ্রিক পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর আহ্বায়ক শেখ নুর আলম বলেন, “বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও প্রশাসনের নাকের ডগায় শত শত নৌকায় নিষিদ্ধ নেটজাল ফেলে চিংড়ির পোনা আহরণ করা হচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী মুনাফার আশায় এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। একটি চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রায় ২০০টি অন্য জাতের মাছের পোনা ধ্বংস করা হয়। এতে শুধু মৎস্যসম্পদই নয়, আমাদের জীববৈচিত্র্যও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশে মাছের উৎপাদন ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অবিলম্বে এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এর চরম মূল্য দিতে হবে।”
অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, অবৈধ রেণু আহরণ বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মোংলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন জানান, “মোংলার পশুর নদী, শ্যালা নদীর রামপাল অংশ থেকে হারবাড়িয়া পর্যন্ত নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী আমাদের সহযোগিতা করছে। পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করতেও বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।”
বাগেরহাট কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের অপারেশন কর্মকর্তা মো. তারেক আহমেদ বলেন, “পশুর চ্যানেলসহ সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় সব ধরনের রেণু আহরণ নিষিদ্ধ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান চললেও অবৈধ রেণু ব্যবসার মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। ফলে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিনই চলছে রেণু সংগ্রহ ও বাণিজ্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোংলার সুন্দরতলা, বিউটি মার্কেট এবং চিলা বাজার এলাকায় প্রতিদিন অবৈধভাবে সংগৃহীত বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু কেনাবেচা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার রেণু পোনার লেনদেন হয়ে থাকে। এই বিশাল অর্থনৈতিক চক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে একাধিক অসাধু ব্যবসায়ী, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশ ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই বনাঞ্চল ও নদ-নদীর প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ রক্ষায় অবৈধ রেণু আহরণ বন্ধে আরও কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। অন্যথায় বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জলজ সম্পদ একসময় অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।