
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একমাত্র চিকিৎসা কেন্দ্র গোদাগাড়ী ৩১ শষ্যা বিশিষ্ঠ হাসপাতালটি জরাজীর্ণ অবস্থা। সেবা নিতে আসা রোগিদের ভোগান্তির শেষ নেই। সব ঔষুধ কিনতে হয় বাইর থেকে। পরীক্ষা – নিরীক্ষার জন্য যেতে হয় প্রাইভেট ক্লিনিকে।
ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের খুশি করতে ডাক্তারগণ হাসপাতালের সরবরাহকৃত তালিকার ওষুধ না লিখে গ্রুপ পরিবর্তন করে ভিজিট করা নিন্মমানের কম্পানীদের ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখছেন বলে ব্যাপক অভিযোগ করেছেন রোগির আত্নীয় স্বজন।
চিকিৎসক, সুইপার, কর্মচারী অ্যামবুলেন্স, ড্রাইভার নেই হাসপাতালটিতে।অব্যবস্থাপনা, নানা প্রকার সমস্যায় জর্জিত হয়ে হাসপাতালটি যেন নিজই যেন অসুস্থ্য। আউটডোরে প্রতিদিন ৫ শতাধিক রোগি দেখতে, ব্যবস্থাপত্র করতে হিমসিম খাচ্ছে কর্মরত ডাক্তার, সেবিকাগন।
রোগির চাপে বরাদ্দকৃত ঔষধ বছরের প্রথম দিকে শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ। ফলে প্রয়োজনীয় ঔষুধপত্র, স্লাইনসহ সব উপকরণ ফার্মেসী থেকে কিনতে হচ্ছে।
জনগণের সুচিকিৎসার জন্য ১৯৯৪ সালে উপজেলা সদরে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৯৯ ইং সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি শুরু থেকেই চলে আছে অবহেলা ও অবস্থাপনায়। ফলে গোদাগাড়ী উপজেলার সাড়ে ৩ লাখ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার আলাতুলি, ক্লাবঘাট, জালিয়াপাড়া এলাকার হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে একরকম বঞ্চিত হয়ে আসছে।
বিকল অ্যাম্বুলেন্স, দ্বিগুণ ভাড়ার ভোগান্তি
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে আগত গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থানান্তরের একমাত্র মাধ্যম ছিল সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি। তবে বিগত ৩ মার্চ, ২০২৫ তারিখে একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্স চালক নিহত হন এবং গাড়িটি সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে (স্ক্র্যাপ) যায়। দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত হাসপাতালে নতুন কোনো অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
ফলে জরুরি মুহূর্তে রোগীদের রাজশাহী নিতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আগে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকায় খুব কম খরচে জরুরি রোগী নিয়ে রাজশাহী যাওয়া যেত। এখন বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে গিয়ে দ্বিগুণ টাকা গুণতে হচ্ছে। অনেক সময় সময়মতো গাড়িও পাওয়া যায় না।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে তীব্র সংকট হাসপাতালটিতে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের সিংহভাগ পদ শূন্য থাকায় হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ৫টি পদের সবকটিই বর্তমানে শূন্য। পূর্বে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত ৫ জন কর্মীর চুক্তির মেয়াদ গত ১ জুন শেষ হওয়ার পর থেকে নতুন কোনো কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড ও চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় হাসপাতাল চত্বর ময়লার স্তূপে পরিণত হয়ে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীই নয়, মালী ও রাঁধুনির (কুক/মশালচী) পদের সবগুলোই বছরের পর বছর শূন্য। এছাড়া নিরাপত্তা প্রহরীর ২টি পদের মধ্যে ১টি, আয়ার ৩টি পদের মধ্যে ২টি এবং ওয়ার্ড বয়ের ২টি পদের মধ্যে ১টি শূন্য রয়েছে। সব মিলিয়ে ১৫টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩ জন কর্মচারী; বাকি ১২টি পদই সম্পূর্ণ খালি। এ হাসপাতাল টি বড় অবাক করা কান্ড হচ্ছে পদ না থাকলেও ২৫ জন সিনিয়র ষ্টাফ নার্স কর্মরত রয়েছে। এ যেন বাঁশের চেয়ে কমচি বড়, শার্টের চেয়ে গেঞ্জি বড় হবার মত অবস্থা।
জনবলের এ তীব্র সংকট সমাধানের লক্ষ্যে গত ১৪ জুন হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সৈয়দ মোঃ সুমন রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ও সিভিল সার্জন বরাবর জরুরি ভিত্তিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী সরবরাহের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে একটি অফিসিয়াল চিঠি পাঠিয়েছেন।
সীমাবদ্ধতার মাঝেও চলছে ওপিডি ও জরুরি সেবা এত শত সমস্যার মাঝেও হাসপাতালটিতে প্রতিদিন সকাল ৮:০০টা থেকে দুপুর ২:৩০টা পর্যন্ত সরকারি টিকিটের বিনিময়ে বহির্বিভাগে (OPD) কয়েকশত রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জরুরি বিভাগ দুর্ঘটনাজনিত বা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে।
একটি সূত্র জানা, উপজেলার মোট আয়তন = ৪৭৫.২৬ বর্গ কিলোমিটার ইউনিয়নের সংখ্যা = ০৯ (নয়) টি পৌরসভার সংখ্যা = ০২ (দুই) টি
মৌজার সংখ্যা = ৩৯২ টি, গ্রামের সংখ্যা = ৪১৫ টি, উপজেলার মোট জনসংখ্যা = ৩,৩০,৯২৪ জন, খানা/পরিবারের সংখ্যা = ৭২,২৮০ টি,
৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল = ০১ টি, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র (FWC) = ০৩ টি
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র (RD) =০৮ টি, কমিউনিটি ক্লিনিক = ৩৪ টি
ইনডোর সেবা ৩১টি শয্যায় হাসপাতালের গুরুতর রোগীদের ভর্তি রেখে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খাবার ও বিনামূল্যে ওষুধ (মজুদ সাপেক্ষে) দেওয়া হচ্ছে। মাতৃস্বাস্থ্য গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত চেকআপ এবং স্বাভাবিক প্রসবের (Normal Delivery) ব্যবস্থা রয়েছে। ল্যাব সুবিধা এক্স-রে এবং সাধারণ কিছু ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও জটিল পরীক্ষার সুবিধা এখানে নেই।
উল্লেখ্য, হাসপাতালটি উপজেলার মূল চিকিৎসাকেন্দ্র গোদাগাড়ী (প্রেমতলী) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করে থাকে।
আধুনিকায়নের দাবি স্থানীয়দের
রাজশাহী-নবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশে সুবিধাজনক স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এই হাসপাতালটি গোদাগাড়ী পৌর এলাকাসহ উপজেলার ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার পদ্মা নদীর ওপারের আলতুলি, ঝালিয়াপাড়াসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তির মূল আশ্রয়স্থল। তবে প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পারছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
গোদাগাড়ী মেডিকেল এলাকার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম জানান, শ্বাস কষ্ট, জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। ঔষিধ পত্র কিনতে হচ্ছে, ভিতরের পরিবেশ খুব নোংরা, টিকে থাকা কষ্টকর। একই মন্তব্য করেন চিকিৎসা নিতে আসা সহরবানু ও রোকিয়া।
গোদাগাড়ী থেকে জেলা শহরের দূরত্ব বেশি হওয়ায় যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীদের রামেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল। এই পরিস্থিতি উত্তরণে স্থানীয় বাসিন্দারা কর্তৃপক্ষের কাছে। এ হাসপাতালের সমস্যার সমাধানে জরুরী ভিক্তিতে শূন্য পদগুলি পূরণ করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রী ও প্রধান মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে কামনা করেছেন সচেতন মহল।
মোঃ হায়দার আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক,
রাজশাহী।।