
রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলী: তিন মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চন্দলাই গ্রামের বাসিন্দা ষষ্টি চন্দ্র বর্মন (৬৫)। পরিবার যখন প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিল, তখন দেশের আলোচিত এক সীমান্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে মিলেছে তার সন্ধান। জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কথিত পুশ-ইনের শিকার হিসেবে উদ্ধার হওয়া সেই বৃদ্ধই যে গোদাগাড়ীর নিখোঁজ ষষ্টি চন্দ্র বর্মন, তা নিশ্চিত করেছে পরিবার ও স্থানীয়রা।
প্রায় ২৪ ঘণ্টা নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানের পর তাকে উদ্ধার করে বকশীগঞ্জ থানা হেফাজতে নেয় বিজিবি। পরে বিজিবি নিশ্চিত করে, ষষ্টি চন্দ্র বর্মন একজন বাংলাদেশি নাগরিক।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোদাগাড়ী উপজেলার চন্দলাই (ললিতনগর) গ্রামের হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা ষষ্টি চন্দ্র বর্মন পেশায় মৎস্যজীবী ও কৃষক ছিলেন। এক ছেলে ও তিন মেয়ের জনক তিনি। সন্তানদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। মাছ ধরা আর কৃষিকাজ করেই চলছিল তার জীবন।
তবে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। পরিবারের সদস্যরা তাকে সবসময় নজরদারিতে রাখার চেষ্টা করলেও প্রায় তিন মাস আগে তিনি বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। এরপর আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে তার খোঁজ চালানো হয়। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান মেলেনি।
পরিবারের ধারণা, মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তিনি কোনোভাবে ট্রেনে চড়ে নিজ এলাকা ছেড়ে দূরে চলে গিয়েছিলেন। এরপর কীভাবে তিনি সীমান্ত এলাকায় পৌঁছেছেন, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ষষ্টি চন্দ্র বর্মনের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে স্থানীয় ব্যবসায়ী বাসার আলী বলেন, “পরিবারটি অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছিল। সবাই মিলে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবশেষে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর দেখে পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত হন, সীমান্তে উদ্ধার হওয়া ওই বৃদ্ধই ষষ্টি চন্দ্র বর্মন।” একই মন্তব্য শিক্ষক আব্দুল লতিফ।
সন্ধান পাওয়ার পর তাকে ফিরিয়ে আনতে ছোট ভাই ভবানী চন্দ্র বর্মন বকশীগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আশায় এখন প্রহর গুনছে পরিবার।
এ ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও পারিবারিক সুরক্ষার বিষয়টি। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, “ওকে ফিরে পেলেই আমাদের সবচেয়ে বড় স্বস্তি হবে।”
গোপাল বর্মণ বলেন, সর্বশেষ প্রায় দুই মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে কুড়িগ্রামে তার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। এমনকি পরিবারের সদস্যরাও তার তেমন খোঁজখবর রাখতেন না। কীভাবে তিনি জামালপুর সীমান্তে পৌঁছালেন, সে বিষয়ে পরিবার কিছু জানে না। তবে গোপাল বর্মণের দাবি, ষষ্ঠী বর্মণ ভারতে যাননি।
বিএসএফ তাকে কীভাবে পেয়েছে, সেটিও পরিবারের জানা নেই। মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় ষষ্ঠী বর্মণের কথাবার্তা এলোমেলো। তবে তার সন্ধান মেলার পর পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ফিরিয়ে আনতে ছোট ভাই ভবানী চন্দ্র বর্মণ জামালপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
এ বিষয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান বলেন, ‘আমি কিছুক্ষণ আগে বিষয়টি শুনেছি। বিস্তারিত জানা নেই। আমরা খোঁজ নিচ্ছি।’
রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) নাঈমুল হাছান বলেন, ‘ষষ্ঠী বর্মণের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়েছে। তারা জামালপুরে পৌঁছালে তাকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
এর আগে বুধবার সকালে জামালপুর জেলার কামালপুর সীমান্তের ১০৮২ নম্বর পিলার এলাকা দিয়ে ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মণকে বাংলাদেশে পাঠানোর (পুশইন) চেষ্টা করেন বিএসএফ সদস্যরা। বিষয়টি টের পেয়ে বিজিবি সদস্যরাও সেখানে অবস্থান নেন। এ সময় বিএসএফ ও বিজিবি সদস্যদের মধ্যে ততর্কবিতর্ক হয়। পরে স্থানীয় বাসিন্দারাও বিজিবির সঙ্গে যোগ দেন।
একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা ওই বৃদ্ধকে সীমান্তের শূন্যরেখায় রেখে চলে যান। বিএসএফ ও বিজিবি সদস্যদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে পরিচয় যাচাই-বাছাই করে তাকে সীমান্ত এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। শূন্যরেখা থেকে উদ্ধার করে তাকে থানা হেফাজতে পাঠানো হয়।
তিন মাসের অনিশ্চয়তা, সীমান্তের শূন্যরেখায় কাটানো দীর্ঘ সময় আর পরিবারের অশ্রুসিক্ত অপেক্ষা-সবকিছুর শেষে ষষ্টি চন্দ্র বর্মনের ফিরে আসার এই গল্প এখন গোদাগাড়ীসহ সারা দেশের মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তিনি এলাকায় আসলে বয়বে আনন্দের বন্যা।
মোঃ হায়দার আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহী।