
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাংবাদিকতা ও রাজনীতি—উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য দুটি ক্ষেত্র। রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা দেয়, আর সাংবাদিকতা রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর জনগণের পক্ষে নজরদারির ভূমিকা পালন করে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এই দুই ক্ষেত্রের কার্যকারিতা যত বেশি সুদৃঢ় হবে, গণতন্ত্রও তত বেশি শক্তিশালী হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন ব্যক্তি কি একই সঙ্গে সাংবাদিকতা ও সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন? নাকি পেশাগত নৈতিকতার স্বার্থে এ দুই পরিচয়ের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা থাকা প্রয়োজন?
সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হচ্ছে নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি, দল বা মতাদর্শের পক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং তথ্য, সত্য এবং বাস্তবতাকে জনগণের সামনে তুলে ধরা। অন্যদিকে রাজনীতি পরিচালিত হয় নির্দিষ্ট আদর্শ, কর্মসূচি ও রাজনৈতিক লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে। ফলে সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা এবং নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার মধ্যে একটি স্বাভাবিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
প্রকৃতপক্ষে একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতে পারে। তিনি একজন নাগরিক হিসেবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভোটাধিকার ভোগ করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত মতাদর্শ এবং সক্রিয় দলীয় দায়িত্ব এক বিষয় নয়। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন রাজনৈতিক পরিচয় সাংবাদিক পরিচয়কে প্রভাবিত করতে শুরু করে অথবা সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ তৈরি হয়।
গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনআস্থা। সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না; দীর্ঘ সময়ের পেশাদারিত্ব, সততা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে তা অর্জিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ সেই আস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এমনকি কোনো সাংবাদিক বাস্তবে নিরপেক্ষ থাকলেও যদি তার সক্রিয় রাজনৈতিক পরিচয় থাকে, তবে তার সংবাদ পরিবেশন নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। গণমাধ্যমের জন্য এটি একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকতার পেশাগত নীতিমালায় স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বহু প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম তাদের কর্মীদের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বা দলীয় পদ গ্রহণের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে থাকে। কারণ সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের মর্যাদা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সময় সাংবাদিকতা, সামাজিক নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা একই পরিসরে অবস্থান করে। এতে ব্যক্তি পর্যায়ে যেমন বিতর্ক সৃষ্টি হয়, তেমনি সাংবাদিকতা পেশার সামগ্রিক ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষার প্রশ্নে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কোনো সাংবাদিক যদি দৃশ্যমানভাবে কোনো রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নানামুখী চাপ, হয়রানি কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন। এতে ব্যক্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ।
এ বাস্তবতায় সাংবাদিকতা ও সক্রিয় রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে একটি সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান প্রয়োজন। কেউ যদি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে চান, তবে সাংবাদিকতা থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়া অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ পথ হতে পারে। আবার যারা সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত থাকবেন, তাদের জন্য দলীয় পদ-পদবি ও সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে দূরে থাকা পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে এ বিষয়ে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের। এসব প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক বিভাজনের ক্ষেত্র নয়, বরং পেশাগত উৎকর্ষ, নৈতিকতা ও সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
সাংবাদিকতা ও রাজনীতি—উভয়ই গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয়। তবে একটির শক্তি নিরপেক্ষতায়, অন্যটির শক্তি অবস্থানে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জনআস্থা এবং পেশাগত মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে সাংবাদিকতা ও সক্রিয় রাজনীতির মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি।
কারণ একজন সাংবাদিকের প্রকৃত শক্তি কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়; তার শক্তি সত্যের প্রতি অঙ্গীকারে, পেশাগত সততায় এবং জনগণের বিশ্বাসে।
মোঃ শহিদুল ইসলাম
সাংবাদিক ও কলাম লেখক।।