
আজিজুল ইসলাম, যশোরঃ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পাইকারি আমের মোকাম যশোরের বেলতলা আম বাজার। চলতি মৌসুমে এখানে আমের দামে চরম ধস নেমেছে। মৌসুমের শুরুতেই বাজারে বিভিন্ন জাতের আমের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও নেই কাঙ্ক্ষিত পাইকার। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার দাম অনেক কম পাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় আমবাগান মালিক ও চাষিরা।
কৃষকদের দাবি, ফলন ভালো হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম বাজার অব্যবস্থাপনার কারণেই আজ এই সংকট তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে বেলতলা আম বাজারসহ শার্শা উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ভোর থেকেই চাষিরা গোবিন্দভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া ও আম্রপালি জাতের আম নিয়ে বাজারে আসছেন। তবে বাজারে ক্রেতা ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য। ৪৪ থেকে ৪৫ কেজিতে মণ হিসাব করে বর্তমানে বাজারে গোবিন্দভোগ ১৪০০ থেকে ১৯০০ টাকা, হিমসাগর ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা, ল্যাংড়া ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা ও আম্রপালি ১৩ ০০ থেকে ১৫ ০০ টাকা বিক্রী হচ্ছে। ”এই দামে আম বিক্রি হতে থাকলে লাভ তো দূরের কথা, বাগান পরিচর্যা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ যে উৎপাদন খরচ হয়েছে, সেটাই উঠবে না।” — জামাল সরদার, স্থানীয় আম চাষি।
শার্শার কায়বা ইউনিয়নের আম চাষি রাজ্জাক ও আহমেদ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এ বছর সার, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি কয়েক গুণ বেড়েছে। ফলে আমের উৎপাদন খরচ অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। অথচ বাজারে আমের কদর নেই। প্রতি বছর মৌসুমের শুরুতে যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত পাইকার আসতেন, এবার সেখানে হাতেগোনা কয়েকজন পাইকার দেখা যাচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা হুশিয়ারি দিয়ে বলছেন, আমের বাজারে এই মন্দাভাব চলতে থাকলে এ অঞ্চলের চাষিরা আম চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন এবং একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে আমগাছ কেটে অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকবেন।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে আম একটি বড় ভূমিকা পালন করে।মোট আম চাষের জমি: ১,০৬০ হেক্টর, মোট আম চাষি: ৪,৬৬৮ জন, প্রধান জাতসমূহ: হিমসাগর (৩৩৭ হেক্টর), আম্রপালি (২১৫ হেক্টর), ল্যাংড়া (১৫৫ হেক্টর), গোপালভোগ (১৫৫ হেক্টর) এবং গোবিন্দভোগ (৬০ হেক্টর)।
উল্লেখ্য, যশোর জেলার শার্শা, ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার আমও এই বেলতলা বাজারে কেনাবেচা হয়।
শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার শাহা দাবি করেন, ঈদের আগে তিনি যখন বাজার পরিদর্শন করেছিলেন, তখন প্রতি মণ আম ১৬০০ থেকে ৩৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে বাজারে সর্বোচ্চ দর ১৮০০ টাকার ওপরে উঠছে না। কৃষি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, মৌসুমের শুরুতেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অপরিপক্ক আম বাজারজাত করায় ভোক্তাদের মধ্যে আম কেনার আগ্রহ কমে গেছে। তবে জ্যৈষ্ঠ মাস পুরোদমে শুরু হলে এবং ঈদ-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চাহিদা বাড়লে বাজার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী ও কৃষকরা।ভোক্তা ও চাষিদের দাবি: বেলতলা আমের মোকামে পাইকারদের আসার পরিবেশ সুগম করা, বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং সরকারিভাবে বাজার মনিটরিং জোরদার না করলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই সম্ভাবনাময় কৃষি খাত চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।