
কুমিল্লা থেকে তরিকুল ইসলাম তরুন:
কুমিল্লা শহরে “হাছান ভাই” কিংবা “CD Path হাসপাতালের হাছান ভাই” নামটি শুধু একটি পরিচয় নয়—এটি মানবতা, ভালোবাসা ও নিঃস্বার্থ সেবার এক উজ্জ্বল প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির একনিষ্ঠ সমর্থক ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে পরিচিত মোঃ হাসান ব্যক্তিজীবনে যেমন ছিলেন সংগ্রামী, তেমনি সমাজসেবায় ছিলেন অনন্য।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময় থেকে কুমিল্লার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন তিনি। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক দুইবারের ভিপি শাহ আলমের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নিজের জন্য কখনো কিছু দাবি করেননি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অবদানের কোনো সনদও গ্রহণ করেননি।
জীবনের কঠিন বাস্তবতায় আর্থিক সংকট নেমে এলেও তিনি কখনো হার মানেননি। কুমিল্লা নগরীর উত্তর গাংচরে বসবাসরত মোঃ হাসানকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেন কুমিল্লার বিশিষ্ট চিকিৎসক, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও মানবতার ফেরিওয়ালা, সাবেক বিএমএ সহ-সভাপতি ডাঃ রেজাউল আলম হেলাল। তার প্রতিষ্ঠিত যৌথ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সিডি প্যাথ হাসপাতালে চাকরির মাধ্যমে শুরু হয় হাসানের নতুন পথচলা।
দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে সিডি হাসপাতালে কর্মরত থেকে তিনি শুধু দায়িত্ব পালনই করেননি, মানবিকতা আর আন্তরিকতা দিয়ে জয় করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও অসংখ্য মানুষের হৃদয়। নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করেছেন। বড় ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ব্যবসায়, মেয়েকে বিএসসি নার্সিংয়ে পড়িয়েছেন এবং ছোট ছেলেকে কুমিল্লার আওয়ার লেডি অব ফাতিমা, জিলা স্কুল ও ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশোনা করিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন লন্ডনে।
খেলাধুলার প্রতিও ছিল তার গভীর ভালোবাসা। পাড়ার তরুণদের মাঠমুখী রাখতে প্রতিবছর আয়োজন করতেন বিভিন্ন টুর্নামেন্ট। ৯০-এর দশকে টেনিস ক্রিকেটে “লিভারপুল ক্লাব” নিয়ে যারা মাঠ মাতিয়েছেন, তাদের কাছে হাছান ভাই ছিলেন এক অভিভাবকের নাম। ক্রিকেটার ফখরুল আলম উল্লাস, লেলিন, বগলু, বাবু, টিপুসহ অনেকেই আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন তার অবদান।
ক্লাবের জন্য বল, ব্যাট, টুর্নামেন্ট ফি কিংবা খেলোয়াড়দের খাবারের প্রয়োজন হলে কাউকে কিছু বলতে হতো না—হাছান ভাই নিজ উদ্যোগেই সব ব্যবস্থা করতেন। নিজের সামর্থ্যের হিসাব না করে তিনি শুধু চাইতেন এলাকার ছেলেরা মাঠে থাকুক, ভালো থাকুক।
খেলা চলাকালে যত ব্যস্ততাই থাকুক না কেন, মাঠে উপস্থিত থাকতেন তিনি। দল জিতলে তার আনন্দ দেখে মনে হতো যেন নিজের সন্তানের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত একজন পিতা।
শুধু খেলাধুলাই নয়, মানবিক কাজেও ছিলেন অসাধারণ। হাসপাতালে পরিচিত কোনো রোগী গেলে ডাক্তার দেখানো, ওষুধের ব্যবস্থা, বিল কমিয়ে দেওয়া, এমনকি নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে সাহায্য করা ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। অনেক অসহায় মানুষকে নীরবে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাইয়ে দিয়েছেন তিনি। বাসায় ফেরার ভাড়াও অনেক সময় নিজেই দিয়ে দিতেন।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—তিনি এসব করেছেন নিঃস্বার্থভাবে। কখনো প্রতিদান বা প্রচারের আশায় নয়, শুধুমাত্র মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকেই।
স্থানীয়রা বলেন, আজকাল অর্থবিত্তশালী মানুষ অনেক দেখা যায়, কিন্তু “মনের দিক থেকে ধনী” মানুষ খুব কম। হাছান ভাই সেই বিরল মানুষদের একজন, যার হৃদয়ে রয়েছে সীমাহীন মায়া, আন্তরিকতা ও মানবতা।
আজও কুমিল্লা শহরের কোথাও দেখা হলে তিনি সাবেক খেলোয়াড়দের বুকে টেনে নিয়ে হাসিমুখে বলেন, “এইটা আমার টিমের প্লেয়ার…”—এই একটি বাক্যের মাঝেই লুকিয়ে থাকে তার গভীর ভালোবাসা ও আত্মিক সম্পর্ক।
স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীরা জানান, তারা বহুবার ভেবেছেন হাছান ভাইকে সংবর্ধনা দেওয়ার কথা। কারণ, এমন মানুষকে সম্মান জানানো মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়—মানবতা, খেলাধুলা ও সামাজিক মূল্যবোধকেই সম্মান জানানো।
তাদের বিশ্বাস, সমাজে যদি হাছান ভাইদের মতো মানুষ আরও বাড়ে, তাহলে যুব সমাজ আবার মাঠে ফিরবে, ফিরে আসবে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সম্প্রীতি।
সবশেষে এলাকাবাসীর একটাই প্রার্থনা—আল্লাহ যেন হাছান ভাইকে সুস্থ ও ভালো রাখেন। কারণ, এমন মানুষদের জন্যই পৃথিবীটা এখনো এত সুন্দর মনে হয়।