
রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলী : রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর কাশফুল ফোঁটেছে, গ্রামবাংলায় বিশ্বাস করা হয়, কাঁশফুল মনের কালিমা দূর করে। তাই শুভ কাজে কাশফুলের পাতা বা ফুল ব্যবহার করা হয়।
এ ছাড়া কাঁশ দিয়ে গ্রামের বধূরা ঝাঁটা, ডালি, মাদুর তৈরি করে থাকে। ঘরের চাল, পানের বরজ, বাড়ির সীমানার বেড়া ও কৃষকের মাথাল তৈরিতেও কাশগাছ ব্যবহার করা হয় প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বাংলাদেশ ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কাশফুল ছিল। কাঁশফুলের অন্য একটি প্রজাতির নাম কুশ। কাশফুলের ইংরেজি নাম Kans Grass ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক বৈজ্ঞানিক নাম Saccharum Sportaneum। কাশ ছন গোত্রীয় এক ধরনের ঘাস। এ উদ্ভিদটি সাধারণত ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছটির চিরল পাতার দুই পাশ বেশ ধারালো।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘পুরাণ’-এ কুশের স্থান খুব উঁচুতে।
সাহিত্যে কাঁশফুলের কথা এসেছে নানাভাবে। রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন গ্রন্থ ‘কুশজাতক’ কাহিনি অবলম্বন করে ‘শাপমোচন’ নৃত্যনাট্য রচনা করেছেন।
কাশফুলের বেশ কিছু ঔষধি গুণ রয়েছে। যেমন—পিত্তথলিতে পাথর হলে নিয়মিত গাছের মূলসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে ওষুধ তৈরি করে পান করলে পিত্তথলির পাথর দূর হয়। কাশমূল বেটে চন্দনের মতো নিয়মিত গায়ে মাখলে গায়ের দুর্গন্ধ দূর হয়। এ ছাড়া শরীরে ব্যথানাশক ফোঁড়ার চিকিৎসায় কাশের মূল ব্যবহৃত হয়।
প্রকৃতিতে যখন শরৎকাল আসে তখন কাশফুলই জানিয়ে দেয় এর আগমনী বার্তা। এই ঋতুতে পালকের মতো নরম ও ধবধবে সাদা সঙের কাশফুল ফোঁটে কাশফুলের অপরুপ সৌন্দর্য পুলকিত করে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না।
ঝকঝকে নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘের ভেলা প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে টানছে। কাশফুলের ছোঁয়া পেতে দর্শনার্থীরাও ছুটে আসছেন। অনেকে অনুভূতিগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে ভোলেন না। এমন মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সবার মন ছুঁয়ে যায়। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে ঐসব স্থানে প্রকৃতি প্রেমীদের দেখা যায়। কেউ কেউ ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন। বিভিন্ন এলাকায় মানুষ পরিবারসহ ঘুরতে এসেছেন কাঁশফুল দেখতে ও ছবি তুলতে।
গৃহিণী জোহরুন নেসা জানান, শরতের কাশফুল আমার শৈশবের স্মৃতিগুলোকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। এই অপরূপ সৌন্দর্যের কাছে কিছুক্ষণ থাকতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। নীল আকাশে চলছে সাদা-কালো মেঘের লুকোচুরি। ধরণীর বুকে কাশফুল দিচ্ছে উঁকি ঝুকি। কাশফুলের শুভ্রতায় আকাশের সাদা ঘন মেঘ যেন পেঁজা তুলোর মতো নেমে আসে ধরণীতে, কাশফুল হয়ে!
শিশিরভেজা শিউলি, বাতাসে মৃদু দোল খাওয়া কাশবনের মঞ্জরি, পদ্ম-শাপলা-শালুকে আচ্ছন্ন জলাভূমি শরতের চিরকালীন রূপ। কাশবনে দল বেঁধে আসে চড়ুই পাখিরা। এমনি দৃশ্য দেখা যায় গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মা ও মহানন্দ নদীর ওপারে চর আষাদিয়াদহ ইউনিয়ন।
রাজশাহীর মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মালা রানী দাস বলেন, পদ্মানদীর ধারে কাশফুল খুবই সুন্দর লাগে, লোকজন ভীড় করে। সাদা সবুজের পাশ দিয়ে চলার অনুভূতি অন্যরকম। অনেকেই ছেলেসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে এখানে। অনেকের কাশফুলের অপরূপ সৌন্দর্য্য দেখে মনটা ভরে গেছে।
একাধিক দর্শনার্থী বলেন, শরৎ আসে সৌন্দর্য নিয়ে আর সেই সৌন্দর্য কাশফুল ছাড়া পূর্ণতা পায় না। এখানকার কাশবনের এই পরিবেশ যে কারো মনকে উদ্বেলিত করে। শেষ বিকেলের আলো আর মৃদু হাওয়ায় দোল খায় সাদা কাশফুল। আর এই দুয়ের মিলবন্ধনে গোধূলির লাল সূর্য যখন অস্তচলে তখন প্রকৃতি হয়ে ওঠে আরো মায়াবী। প্রিয় ঋতু হলেও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের দিক থেকে শরৎ অনন্য। যখন শিশিরের শব্দের মতো টুপটাপ শিউলি ঝরে, তখন অনুভবে শরৎ আসে। বর্ষার বৃষ্টিমুখর অনুজ্জ্বল দিনের পর শরতের মেঘের মতো আমাদের মনও যেন হালকা হয়ে যায়। শরতের আকাশ, নদী, ফুল—সবই শান্ত, মায়াময়। ভাদ্র-আশ্বিনের এই শুভ্র রূপ পবিত্রতার প্রতীক। বিলের শাপলা, নদীতীরের কাশ ফুল, আঙিনার শিউলি সবই কোমল, পবিত্র।
শিশিরভেজা শিউলি, বাতাসে মৃদু দোল খাওয়া কাশবনের মঞ্জরি, পদ্ম-শাপলা-শালুকে আচ্ছন্ন জলাভূমি শরতের চিরকালীন রূপ। কাশবনে দল বেঁধে আসে চড়ুই পাখিরা। এমনি দৃশ্য দেখা যায় গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মা ও মহানন্দ নদীর ওপারে চর আষাদিয়াদহ ইউনিয়নে।
শরতে মাঠে মাঠে এখন নতুন ধানের সমারোহ। কৃষকের মনে নবীন আশা, সাজ সাজ রব। দোয়েল-কোয়েলের কুজনে মুখরিত পল্লী গ্রাম-মাঠ-ঘাট, জনপদ। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে প্রহর গোনা শুরু হলো এই শরতে, কৈলাশ ছেড়ে দুর্গতিনাশিনী দুর্গা আসবেন তাদের গৃহে। নদীর পাড়ে কাশফুলের জেগে ওঠার আভাস দেখেই বাতাসে রটে গেছে শরৎ এসেছে।
মোঃ হায়দার আলী
রাজশাহী।