
তরিকুল ইসলাম তরুন, কুমিল্লা থেকে:
বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও গ্রামীণ সমাজ উন্নয়নের ইতিহাসে কিছু মানুষ রয়েছেন, যারা নিরবে-নিভৃতে মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তাঁরা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত গড়ে তুলেছেন। তেমনই একজন পরিবেশবিদ, কৃষি সংগঠক ও সমাজ উন্নয়নকর্মী মতিন সৈকত এআইপি।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার আদমপুর গ্রামের কৃতি সন্তান মতিন সৈকত দীর্ঘ চার দশক ধরে বিষমুক্ত কৃষি, নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাল-নদী পুনঃখনন, সমাজভিত্তিক মৎস্য চাষ এবং জনসম্পৃক্ত সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা সাহিত্যে বিএ (অনার্স) ও এমএ সম্পন্ন করে স্থানীয় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা সাহিত্যের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি পরিবেশ বিষয়ক রিসোর্স পারসন হিসেবেও পরিচিত।
কৃষি ও পরিবেশে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি মহামান্য রাষ্ট্রপতির অভিনন্দনপত্র এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি অভিনন্দন লাভ করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে চারবার জাতীয় পদকে ভূষিত হন তিনি। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবন, ব্যবহার ও সম্প্রসারণের জন্য অর্জন করেন দুইবার জাতীয় কৃষি পদক। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অবদানের জন্য জাতীয় পরিবেশ পদক লাভ করেন। বাংলাদেশের কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি “এগ্রিকালচারাল ইম্পর্ট্যান্ট পারসন (এআইপি)” খেতাব অর্জন করেন। কৃষি ও পরিবেশ উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে “ইন্টারন্যাশনাল ক্রিয়েটিভ আর্টস অ্যাওয়ার্ড অ্যান্ড ফেলোশিপ” প্রদান করে।
বিষমুক্ত কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন
বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় মতিন সৈকত অনেক আগে থেকেই বিষমুক্ত কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।
তিনি কৃষকদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করেন যে কৃষি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিভিন্ন এলাকায় সভা, প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের আলোচনা আয়োজনের মাধ্যমে তিনি জৈব সার ব্যবহার, দেশীয় বীজ সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার প্রতি কৃষকদের উৎসাহিত করেন।
তাঁর প্রচেষ্টায় বহু কৃষক বিষমুক্ত শাকসবজি, ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে।
কৃষকের পাশে ব্যতিক্রমী সেচসেবা উদ্যোগ
বাংলাদেশের কৃষকদের অন্যতম বড় সমস্যা সেচ ব্যয়। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে অধিকাংশ কৃষক সেচ খরচ বহন করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন। এই বাস্তবতায় মতিন সৈকত প্রায় ৩০ বছর ধরে মাত্র ২০০ টাকা বিঘাপ্রতি সেচসেবা প্রদান করে বিরল মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
যেখানে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি কৃষিকে ক্রমেই ব্যয়বহুল করে তুলছে, সেখানে তাঁর এই উদ্যোগ কৃষকের স্বার্থরক্ষায় এক সাহসী ও জনবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর ফলে বহু ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক কৃষিকাজে টিকে থাকার সুযোগ পেয়েছেন।
খাল-নদী ও জলাধার রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন
দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের বহু খাল-নদী ও জলাধার আজ সংকটের মুখে। পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মতিন সৈকত দীর্ঘদিন ধরে খাল-নদী ও প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছেন।
স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে তিনি খাল পুনঃখনন, জলাধার সংরক্ষণ, পানিদূষণ প্রতিরোধ এবং জলজ পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন। তাঁর উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় পানি সংরক্ষণ ও জলপ্রবাহ সচল রাখার বিষয়ে জনমত গড়ে ওঠে।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা
দেশীয় মাছ, পাখি, গাছপালা এবং জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষায় মতিন সৈকত দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বারবার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—জীববৈচিত্র্য ধ্বংস মানে প্রকৃতির ভারসাম্য ধ্বংস।
জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের নির্বিচার ধ্বংসের বিরুদ্ধে তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি পরিচালনা করেছেন। বৃক্ষরোপণ, জলাভূমি রক্ষা এবং দেশীয় প্রজাতি সংরক্ষণে তাঁর কার্যক্রম স্থানীয় জনগণের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
প্লাবনভূমিতে সমাজভিত্তিক মৎস্য চাষ
বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমি একসময় প্রাকৃতিক মাছের গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। কিন্তু নানা কারণে এসব জলাভূমির উৎপাদনশীলতা কমে যায়। এই অবস্থায় মতিন সৈকত সমাজভিত্তিক মৎস্য চাষের ধারণাকে জনপ্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
স্থানীয় জনগণকে একত্রিত করে তিনি প্লাবনভূমিতে সমন্বিতভাবে মাছ চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং জলজ সম্পদ সংরক্ষণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশও সৃষ্টি হয়।
জনসম্পৃক্ত উন্নয়ন ও সামাজিক আন্দোলন
মতিন সৈকতের কর্মকাণ্ডের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জনগণকে সম্পৃক্ত করে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।
কৃষি, পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্য, পানি ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সচেতনতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তিনি জনমুখী আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তরুণ সমাজকে পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি
দীর্ঘ চার দশকের নিরলস অবদানের জন্য মতিন সৈকত বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে সম্মানিত হয়েছেন। তিনি পরিবেশ বিষয়ক উন্মুক্ত পাঠশালা “বাংলাদেশ পরিবেশ স্কুল”-এর প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর জাতীয় পরিষদের সদস্য ও লাইফ মেম্বার এবং বাপা কুমিল্লা আঞ্চলিক শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নাগরিক