
কুমিল্লা দঃ প্রতিনিধি তরিকুল ইসলাম তরুন,
পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে আবারও ব্যস্ত সময় পার করছেন কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পীরা। মাটির কেটলি, সানকি, ছোট-বড় হাঁড়ি, দইয়ের বাটি, ফুলদানি, পুতুল, শোপিস, পাখি-পশুর নকশা—সব মিলিয়ে এখন যেন কুমারপাড়াজুড়ে উৎসবের আমেজ। বছরের অনেকটা সময় মন্দায় কাটলেও বৈশাখ ঘিরে নতুন করে চাকা ঘুরতে শুরু করেছে এই প্রাচীন শিল্পের।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার উত্তর বিজয়পুর, দক্ষিণ বিজয়পুর, ভেলেরীপাড়া, গাংচর, বারোপাড়া, দুর্গাপুর ও নোয়াপাড়া,মুরাদনগরের কামাল্লা, আন্দিকুট,রামচন্দ্রপুর, বিপাড়ার সাইট সালা এলাকার কুমার সম্প্রদায়ের মানুষ এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ চাকায় বসে তৈরি করছেন কেটলি ও হাঁড়ি-পাতিল, আবার কেউ রঙ-তুলি দিয়ে দিচ্ছেন শেষ নান্দনিক ছোঁয়া।
শুধু ব্যবহারিক পণ্যই নয়, বৈশাখী সাজে ঘর সাজাতে এখন মাটির তৈরি শোপিস, ফুলদানি, পুতুল,পেঁচা, মাছ, ঘোড়া, হাতি-হরিণ, মাটির ব্যাংক, প্রদীপ ও নানা অলংকার সামগ্রীরও ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। শহর-গ্রামের মেলা, হাটবাজার ও দোকানপাটে এসব পণ্যের কদর বাড়ায় কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে কারিগর পরিবারগুলোতে।
স্থানীয় মৃৎশিল্পী সুমন চন্দ্র পাল বলেন,
“পহেলা বৈশাখ আমাদের জন্য শুধু উৎসব নয়, এটি আয়ের বড় একটি সময়। বছরের অন্য সময় বিক্রি কম থাকলেও বৈশাখ এলেই কাজের চাপ বেড়ে যায়। এবারও কেটলি, সানকি, দইয়ের বাটি আর শোপিসের অর্ডার ভালো।”
আরেক কারিগর জানান,
“আগে মাটির জিনিসের ব্যবহার ছিল ঘরে ঘরে। এখন প্লাস্টিক ও স্টিলের ভিড়ে সেই জায়গা কমেছে। তবু উৎসব এলেই মানুষ আবার মাটির ঐতিহ্যের দিকে ফিরে তাকায়—এটাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।”
তবে আশার এই সময়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সংকট। মাটির তৈরি পণ্য পোড়াতে চুল্লিতে গ্যাসের প্রয়োজন হলেও দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে যেমন সময়মতো পণ্য সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে উৎপাদন খরচও।
বিজয়পুর কুমারপাড়া মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি শ্রীপদ চন্দ্র পাল বলেন,
“১৯৯৯ সালে সরকারি সহায়তায় আমাদের এখানে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরে আবাসিক ও বাণিজ্যিক লাইনের পরিবর্তনের পর থেকে গ্যাসের নিয়মিত সরবরাহে সমস্যা শুরু হয়। এখন গ্যাস না থাকায় উৎপাদন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি আমরা আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন,
“প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে জানিয়েছি। কিন্তু এখনো কার্যকর সমাধান হয়নি। দ্রুত গ্যাস সমস্যার সমাধান না হলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আরও সংকটে পড়বে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুমিল্লার এই মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়—এটি বাংলার লোকঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শত বছরের পুরোনো এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে কারিগরদের জন্য প্রয়োজন সহজ ঋণ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সুবিধা, বাজার সম্প্রসারণ, প্রশিক্ষণ, এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজন চন্দ্র রায় বলেন,
“মৃৎশিল্প আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। গ্যাসসহ যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সমাধানের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল মাটির তৈরি বাসন-কোসন। আধুনিকতার চাপে সেই ব্যবহার অনেকটাই কমে গেলেও, পহেলা বৈশাখের মতো উৎসব এখনো মনে করিয়ে দেয়—বাংলার মাটি, মানুষ আর সংস্কৃতির সঙ্গে মৃৎশিল্পের সম্পর্ক এখনো অটুট। এবিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু রেজা হাসান বলেন গ্যাস সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।