
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে :
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে আগামীকাল (২ এপ্রিল) ভোর থেকে শুরু হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত দুই মাসব্যাপী মধু আহরণ মৌসুম। চলবে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত। এ বছর বন বিভাগ ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু ও ৯০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বনজ ফুলের প্রাচুর্যে উৎপাদন বৃদ্ধির আশা দেখা দিলেও মৌসুম শুরুর আগেই বনদস্যুদের তৎপরতা বাড়ায় মৌয়ালদের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে ৭০০ কুইন্টাল মধু ও ৩০০ কুইন্টাল মোম এবং পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফুলের সমারোহে আশার আলো
চলতি বছরে আগাম বৃষ্টির কারণে সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে খলিসা, গরান, পশুর ও হারগোজাসহ বিভিন্ন গাছে ব্যাপক ফুল ফুটেছে। এতে মৌমাছির বিচরণ বেড়েছে এবং বনাঞ্চল মুখর হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে এ বছর মধুর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তবে শরণখোলা ও চাঁদপাই এলাকায় তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত ও দেরিতে ফুল ফোটায় ওই অঞ্চলের মৌয়ালরা মৌসুম শুরুর কয়েকদিন পর পূর্ণমাত্রায় মধু আহরণ শুরু করবেন।
প্রস্তুত হাজারো মৌয়াল
ইতোমধ্যে মৌয়ালরা নৌকা মেরামত, সরঞ্জাম প্রস্তুত এবং দল গঠন শেষ করেছেন। মৌসুমের শুরুতে খলিসা, গরান, পশুর ও হারগোজা ফুলের মধু সংগ্রহ করা হবে। পরে কেওড়া ও ছইলা ফুলের মধু আহরণ চলবে।
শরণখোলার সাউথখালী গ্রামের মৌয়াল আব্দুর রশিদ ও মোজাম্মেল হোসেন জানান, গত মৌসুমে তাদের ১৫ সদস্যের দল প্রত্যেকে দুই মণের বেশি মধু সংগ্রহ করেন। সব খরচ বাদ দিয়ে একজন মৌয়াল প্রায় ৮০ হাজার টাকা আয় করেন। এবার ফুল বেশি থাকায় আয় বাড়ার প্রত্যাশা করছেন তারা।
গত বছরের তুলনায় নতুন প্রত্যাশা
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ২ হাজার ২৫০ জন মৌয়াল পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ থেকে ৬৫০ কুইন্টাল মধু ও ২০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করেন। সময়মতো ফুল না ফোটায় উৎপাদন কম হয়েছিল বলে জানানো হয়।
বনদস্যু আতঙ্কে নিরাপত্তা দাবি
মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই বনদস্যুদের অপহরণ ও চাঁদাবাজির আশঙ্কা বাড়ায় মৌয়ালদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তারা সুন্দরবনে যৌথ বাহিনীর টহল বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
মোংলার চিলা এলাকার মৌয়াল ইব্রাহীম হোসেন বলেন, “জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আমরা বনে যাই। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে মধু আহরণ কঠিন হয়ে পড়বে।”
বন বিভাগের নির্দেশনা ও অনুমতিপত্র
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ রেজাইল করিম চৌধুরী জানান, মৌয়ালদের জন্য ১৪ দিন মেয়াদি পাস প্রদান করা হবে। তিনি বলেন, গাছে ফুলের পরিমাণ বেশি থাকায় এ বছর উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায় বন বিভাগ কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে—মৌমাছি তাড়াতে আগুন বা রাসায়নিক ব্যবহার নিষিদ্ধ, বনাঞ্চলে আগুন না ফেলা, বন্যপ্রাণী শিকার ও নদী-খালে বিষ প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নির্দেশনা অমান্য করলে বন আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিষেধাজ্ঞার আগে শেষ সময়
উল্লেখ্য, প্রতিবছর জুন মাস থেকে তিন মাস সুন্দরবনে সব ধরনের বনজ ও জলজ সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকে। ফলে এপ্রিল ও মে মাসই মৌয়ালদের জন্য বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রকৃতি, জীবিকা ও ঝুঁকির সমন্বয়ে শুরু হচ্ছে সুন্দরবনের আরেকটি মধু মৌসুম—যেখানে আশা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে নিরাপত্তা ও টেকসই ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জও।