
মুহাম্মদ মুনতাসীর মামুন, স্টাফ রিপোর্টার:
পেটের দায়ে হাট-বাজারে পান ও ঝালমুড়ি বিক্রি করত দুই শিশু ভাই রহমাতউল্লাহ্ ও আব্দুল্লাহ্। বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার বয়সে জীবন-সংগ্রামে নেমে পড়েছিল তারা। অবশেষে তাদের করুণ পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে পাশে দাঁড়িয়েছেন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মোঃ ইজাজুল হক। তাঁর উদ্যোগে দুই ভাইয়ের স্কুলে ভর্তি ও শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চরবিশ্বাসের একটি দরিদ্র পরিবারে বেড়ে উঠছে রহমাতউল্লাহ্ ও আব্দুল্লাহ্। তাদের বাবা আলিউল মাতুব্বার দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান পাননি। স্বামীর অনুপস্থিতিতে অসহায় হয়ে পড়েন দুই শিশুর মা। পরে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। এতে বাবাকে হারানোর পর মায়ের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে সম্পূর্ণ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে দুই ভাই।
শেষপর্যন্ত তাদের আশ্রয় হয় বৃদ্ধ দাদা মনির মাতুব্বরের কাছে। পেশায় কৃষক মনির মাতুব্বর নিজেও অসচ্ছল। বয়সের ভার ও অসুস্থতার কারণে সংসারের দু’বেলা খাবার জোগাড় করাই তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দুই শিশুর লেখাপড়াও অনিশ্চিত হয়ে যায়।
জীবিকার তাগিদে একসময় পান ও ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু করে তারা। বিভিন্ন হাট-বাজার ও খেলার মাঠে ঘুরে ঘুরে পণ্য বিক্রি করে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করত দুই ভাই। শৈশবের আনন্দ আর স্কুলের বদলে তাদের দিন কাটছিল কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে।
দুই শিশুর এমন পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মোঃ ইজাজুল হক তাদের নিজ কার্যালয়ে ডেকে নেন। তাদের পড়াশোনার আগ্রহের কথা শুনে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। পরে চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রহমাতউল্লাহ্ ও আব্দুল্লাহ্’র ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়।
শুধু ভর্তি নয়, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের জন্য নতুন স্কুল ড্রেস ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে আনন্দিত দুই ভাই।
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মোঃ ইজাজুল হক বলেন, “রহমাতউল্লাহ্ ও আব্দুল্লাহ্’র করুণ পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে ওদের আমার অফিসে নিয়ে আসি। পরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছে। ওদের স্কুলে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ওদের সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়েও গলাচিপা উপজেলা প্রশাসন খেয়াল রাখবে।”
উপজেলা প্রশাসনের এমন মানবিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে ঝরে পড়া শিশুদের আবারও শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এমন উদ্যোগই পারে শিশুদের হাতে ঝালমুড়ির বাটির বদলে বই-খাতা তুলে দিতে এবং তাদের ভবিষ্যৎকে আরও সুন্দর করে গড়ে তুলতে।