
আজিজুল ইসলাম।।
দেয়ালের ঠিক বাম পাশের একটি পিলারে নিরিখ করে তাকিয়ে আছে সিসিটিভি ক্যামেরা। সামনে ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর শেড। চারদিকে অসংখ্য সিসিটিভি নজরদারি। প্রতিটি শেডে দায়িত্বপ্রাপ্ত একাধিক কর্মকর্তা। প্রবেশ ও বের হওয়ার একমাত্র গেটে আনসার, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী, কাস্টমস এবং বন্দরের নিজস্ব security বাহিনী—সব মিলিয়ে এক দুর্ভেদ্য বহুস্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী। কিন্তু এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার সমীকরণটি যখন বাস্তবে মেলাতে যাওয়া হয়, তখন দেখা যায় এক অবিশ্বাস্য এবং ভয়ঙ্কর দৃশ্য।
দুপুর ঠিক ১টা ৩৯ মিনিট। একটি ভারতীয় ট্রাকের পাশে এসে দাঁড়ায় একটি বাংলাদেশি ট্রাক। অভিযোগ অনুযায়ী, সবার চোখের সামনেই প্রকাশ্য দিবালোকে ভারতীয় ট্রাক থেকে একের পর এক ৪০টি পণ্যের প্যাকেট বাংলাদেশি ট্রাকে তোলা হলো। কোনো চোরের মতো লুকিয়ে নয়, রীতিমতো একদল লোক মিলে প্রকাশ্যেই এই পণ্য স্থানান্তর সম্পন্ন করল। এরপর দুটি ট্রাকই কোনো প্রকার বাধা বা তল্লাশি ছাড়াই নির্বিঘ্নে বন্দর এলাকা ত্যাগ করল। কেউ তাদের থামাল না, কেউ বৈধ কাগজপত্র দেখতে চাইল না, এমনকি কেউ একটি প্রশ্ন করার প্রয়োজনও বোধ করল না।
মূল প্রশ্নটি এখানেই: সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো কি তবে কেবলই দেয়াল সাজানোর কোনো শো-পিস? নাকি এই বিশাল নিরাপত্তা বেষ্টনী কেবল কাগজ-কলমের নথিতেই সীমাবদ্ধ? এতগুলো নিরাপত্তা স্তর এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীর চোখের সামনে দিয়ে এমন একটি প্রকাশ্য শুল্ক ফাঁকি ও পণ্য পাচারের ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে, তা যেকোনো সচেতন নাগরিককে স্তম্ভিত করে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যে বাংলাদেশি ট্রাকটি অবৈধ পণ্য নিয়ে বন্দর ছেড়ে বের হলো, সেটি কীভাবে বন্দরের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘বাঁশকল গেট’ অতিক্রম করল? প্রয়োজনীয় শুল্কায়ন এবং গেট পাস যাচাই ছাড়া একটি পণ্যবাহী ট্রাক কীভাবে বাইরের রাস্তায় চলে যেতে পারে? ঘটনাটি এখানেই শেষ হতে পারত, যদি না সেই ট্রাকটি বেনাপোল থেকে নিরাপদে ঢাকা গিয়ে পণ্য খালাস করে আবার বেনাপোলে ফিরে আসত। ট্রাকটি ফিরে আসার পরই কেবল এই বিশাল কেলেঙ্কারি জনসাধারণের সামনে উন্মোচিত হয়।
তদন্তের নামে ‘অজ্ঞাত’র আড়াল ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি
ঘটনা জানাজানির পর স্বভাবসুলভভাবেই মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় আসামি করা হয়েছে আনসার সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী, ট্রাকচালক এবং হেলপারকে। কিন্তু সেখানে সবচেয়ে রহস্যময় একটি শব্দ জুড়ে দেওয়া হয়েছে—”অজ্ঞাত কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারী”। এই ‘অজ্ঞাত’ শব্দের ব্যবহারই পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর একটি বড় রকমের সন্দেহের ছায়া ফেলে। ঘটনার সময় যে সমস্ত কর্মকর্তা নির্দিষ্ট শেড বা গেটে ডিউটিতে নিয়োজিত ছিলেন, ডিজিটাল এই যুগে তাঁর পরিচয় কীভাবে ‘অজ্ঞাত’ থাকে? বন্দরের ডিউটি রেজিস্টার বা হাজিরা খাতা দেখলেই তো মুহূর্তের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা যে, সেই সময়ে কার সেখানে থাকার কথা ছিল এবং কার গাফিলতিতে বা যোগসাজশে এই ঘটনা ঘটেছে।
যেসব শেডের পাশে এই ঘটনা ঘটল, যে গেট দিয়ে ট্রাক প্রবেশ ও বের হলো, সেই সময় দায়িত্বে থাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল? তদন্তের রিপোর্টে কি এই মূল হোতাদের নাম উঠে আসবে, নাকি অতীতের মতোই সমস্ত দায়ভার চাপানো হবে নিচের সারির কয়েকজন চুক্তিভিত্তিক বা অস্থায়ী কর্মচারীর ঘাড়ে? এটি শুধু একটি সাধারণ চুরির মামলার প্রশ্ন নয়, এটি দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ও জবাবদিহির কাঠামোগত সংকটের প্রশ্ন।
রাজস্বের রক্তক্ষরণ ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব
বেনাপোল স্থলবন্দর কেবল একটি সীমান্ত চৌকি নয়, এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনী। এখান থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সংগৃহীত হয়। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে এই বন্দরে একের পর এক শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ, ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য উদ্ধার, এবং কাস্টমস চত্বর থেকে রহস্যজনকভাবে পণ্য উধাও হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার পরই লোকদেখানো মামলা হয়, সাময়িক বরখাস্তের আদেশ আসে, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি বারবার কেন ঘটছে?
এই প্রশ্নটি আজ শুধু বেনাপোলের স্থানীয় প্রশাসনের নয়, এই প্রশ্নটি সমগ্র রাষ্ট্রের এবং জনগণের। যে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্র এই শুল্ক ফাঁকির সাথে জড়িত, তারা কি রাষ্ট্রের আইন, সিসিটিভি নজরদারি এবং একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির চেয়েও বেশি শক্তিশালী? নাকি এই দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা প্রাচীরের ভেতরেই এমন কোনো অদৃশ্য ফাঁক বা ‘ভেতরের শত্রু’ তৈরি হয়েছে, যারা অর্থের বিনিময়ে রাষ্ট্রকে অন্ধ করে রাখছে?
যদি তদন্তে সত্যিই কোনো গভীর ও শক্তিশালী সংঘবদ্ধ চক্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, তবে তাদের আসল মুখোশ উন্মোচন করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। রাষ্ট্রের রাজস্বের এই প্রকাশ্য ডাকাতি বন্ধ করতে হলে চুনোপুঁটিদের বলির পাঁঠা বানানো বন্ধ করে রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায়, ডিজিটাল নজরদারি আর বহুস্তরের নিরাপত্তার গল্পগুলো কেবল জনগণের সাথে এক নিষ্ঠুর তামাশা হিসেবেই গণ্য হবে। বেনাপোল বন্দরের নিরাপত্তা ও রাজস্বের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এখন সময়ের দাবি।