
জি.এম স্বপ্না,সিরাজগঞ্জ :
ঐতিহ্য,আধ্যাত্মিকতা আর গ্রামীণ জীবনের অনন্য মেলবন্ধনে এবারও শুরু হলো সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার আঙ্গারু গ্রামের প্রাচীনতম বৈশাখী মেলা।প্রায় দুইশ’ বছরের পুরোনো এই মেলা আজ থেকে শুরু হয়ে চলবে পুরো বৈশাখ মাস জুড়ে প্রতি শনিবার।
গ্রামের আঙ্গারু পাঁচ পীর মাজারকে ঘিরেই মূলত এই মেলার সূচনা।মাজার কমিটির প্রবীণ সভাপতি নুরুল হক (৯০) জানান,বহু বছর আগে ভারত থেকে আগত এক আধ্যাত্মিক সাধক এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে এসে স্থানীয়দের পাঁচ পীরের মাজারের কথা জানান।তার নির্দেশে জঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানে জিকির ও দোয়ার আয়োজন শুরু হয়।সেই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর ওরশ মাহফিলের পাশাপাশি বৈশাখের প্রতি শনিবার বসতে থাকে এই ঐতিহ্যবাহী আঙ্গারু মেলা।
সময়ের পরিক্রমায় মেলাটি শুধু ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি,এটি এখন গ্রামীণ জীবনের এক প্রাণবন্ত উৎসবে রূপ নিয়েছে।তবে জায়গার সংকট ও তীব্র গরমের কারণে মেলার পরিধি কিছুটা সীমিত হলেও, আগত মানুষের ঢল থামেনি।জায়গা না পেয়ে অনেক সময় মেলার বিস্তৃতি সড়ক পর্যন্ত গড়ায়,ফলে দর্শনার্থীদের কিছুটা ভোগান্তিও পোহাতে হয়।
মেলার প্রধান আকর্ষণ গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির নানা উপাদান বাঁশ ও বেতের তৈরি ডালা,কুলা,হাতপাখা,মাটির তৈজসপত্র ও পুতুল সবকিছুতেই ফুটে ওঠে বাংলার চিরচেনা ঐতিহ্য। পাশাপাশি মিষ্টান্নের দোকানগুলোতে ভীড় লেগেই থাকে। মুড়ি-মুড়কি, রসগোল্লা,বাতাসা,কদমা,পাঁপড় আর গরম জিলাপির ঘ্রাণে মুখর থাকে পুরো এলাকা।
শিশুদের জন্য খেলনার দোকান, নারীদের জন্য প্রসাধনী সামগ্রী,আর রান্নার উপকরণের মসলার দোকান—সব মিলিয়ে মেলাটি হয়ে ওঠে এক পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ বাজার।
এই মেলাকে ঘিরে এক বিশেষ সামাজিক রীতিও লক্ষ্যণীয়। আশেপাশের গ্রামের অনেক বিবাহিত নারীরা বৈশাখ মাসে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন।আত্মীয়-স্বজনদের আনাগোনায় পুরো অঞ্চল যেন পরিণত হয় মিলনমেলায়।অন্য যে কোন উৎসবের তুলনায় এ সময় গ্রামগুলোতে উৎসবের আমেজ থাকে সবচেয়ে বেশি।
মেলা কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মেলা পরিচালনার সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
ঐতিহ্য,সংস্কৃতি আর মানুষের মিলন—সব মিলিয়ে আঙ্গারুর বৈশাখী মেলা যেন গ্রামীণ বাংলার প্রাণের উৎসব,যা সময়ের স্রোত পেরিয়েও আজও একই আবেগে বেঁচে আছে।