শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :-
ধানক্ষেত থেকে লালমাইয়ে স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার, পাশে সিএনজি ক্ষেতলালে আরএম স্যাটেলাইট ডিস ব্যবসার বিরোধ আপস-মীমাংসায় নিষ্পত্তি মহেশপুরে আ-কস্মিক ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে লণ্ড-ভণ্ড সবজি, ধান ও কলাবাগান, নিমিষেই শেষ কৃষকের স্বপ্ন নেছারাবাদে মি-থ্যা ও মানহানিকর সংবাদ প্রকাশের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মা ও নদীতে বন্যার পানিবৃদ্ধির সাথে সাথে ফের নদী ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় আত-ঙ্কিত জি-নাইন কলা চাষে সফল পাইকগাছার নারায়ণ অধিকারী রাজশাহী ১ আসনের এমপি মুজিবুর রহমান অ-সুস্থ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুইদিন ব্যাপী শিখন কর্মসূচির সমাপনী পঞ্চগড়ে কলেজভিত্তিক ভিডিপি মৌলিক প্রশিক্ষণের সমাপনী উপলক্ষ্যে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত আশুলিয়ায় ২৪ ঘন্টায় পৃথক স্থান থেকে তিন নারী ও পুরুষসহ ৪ জনের লা-শ উদ্ধার

হারিয়ে যাওয়া শৈশব: আমাদের শিশুদের সুরক্ষায় দায় কার?

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪০ Time View

– নিকোলাস বিশ্বাস।।

একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবার শুধু তার সন্তানকেই হারায় না; হারায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। আমরা প্রায়ই দেখি, উদ্বিগ্ন বাবা-মা সন্তানের ছবি হাতে নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটছেন। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করছেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো – একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের ব্যবস্থা কত দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? আর শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষার দায়িত্বই বা কার?
সংখ্যা শুধু গল্পের একটি অংশ
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ২,০৩৮ শিশু অদৃশ্যই রয়ে গেছে। সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে এগুলো সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ থানায় করা জিডি কেবলমাত্র নথিভূক্ত ঘটনার সংখ্যাই তুলে ধরে; নিখোঁজ শিশুর প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে। কিছু ঘটনার পরবর্তী তথ্য নথিতে হালনাগাদ নাও হতে পারে, আবার অনেক ঘটনা হয়তো কখনো রিপোর্টই হয় না।
সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও এক ধরনের নয়। কোনো শিশু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যার কারণে বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে। আবার কেউ অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন কিংবা শোষণের শিকার হতে পারে। মানবপাচারবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশে শিশু পাচারের ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। তাই শুধু কতজন শিশু নিখোঁজ হয়েছে তা জানাই যথেষ্ট নয়। আমাদের জানতে হবে – কেন তারা নিখোঁজ হচ্ছে, এরপর তাদের কী ঘটছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে আমাদের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর।
বর্তমান সময়ে শিশুদের ওপর সহিংসতার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউনিসেফ (UNICEF) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ একটি শক্তিশালী শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য জোড়ালো আহ্বান জানিয়েছে।
নিখোঁজ শিশু কোনো সাধারণ নিখোঁজ ব্যক্তির মামলা নয়
একটি শিশু নিজেকে সুরক্ষিত রাখার মতো সক্ষমতা সবসময় রাখে না। তাকে সহজেই প্রলোভন দেখানো, ভয় দেখানো বা প্রতারণার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বিশেষভাবে ঝূঁকিপূর্ণ।
তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা শিশু সুরক্ষার জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিলম্ব হলে অপরাধীরা শিশুকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে, পরিচয় গোপন করতে কিংবা পাচারের সুযোগ পেতে পারে।
জিডি করাই পুলিশের চূড়ান্ত কাজ নয়, বরং কাজের শুরু হওয়া উচিত। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, পরনের পোশাক, সর্বশেষ অবস্থান, যোগাযোগ এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন। আইনসম্মত ক্ষেত্রে ফোন বা অনলাইন কার্যক্রমের তথ্যও তদন্তের কাজে লাগানো জরুরী।
পরিবারের অসহায়ত্ব যেন একটি ফাইলে আটকে না থাকে
সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা-মা যখন পুলিশের কাছে সাহায্য চাইতে যান, তখন উদাসীনতা, সন্দেহ বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়। পুলিশ ও পরিবারের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক।
প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন, যিনি পরিবারকে অভিযোগ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাবেন, নিয়মিত তথ্য দেবেন এবং প্রয়োজন হলে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। একজন অসহায় মা-বাবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল – কেউ তাদের কথা শুনছে এবং তাদের সন্তানের সন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
শিশু ফিরে এলেই দায়িত্ব শেষ নয়
নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবার স্বস্তি পায়। কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল? কার সঙ্গে ছিল? তাকে কি নির্যাতন, ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হতে হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে। একটি শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা, ভয় দেখানো বা ঘটনার জন্য তাকে দায়ী করা যাবে না। ফিরে আসা শিশুর প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পুনর্বাসন। মূল ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত না করে শুধু শিশুকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে সে আবার একই বিপদের মুখে পড়তে পারে।
সুরক্ষা শুরু হোক পরিবার ও বিদ্যালয় থেকে
শিশুদের যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও নীরবতা বড় বাধা। সামাজিক কলঙ্ক, লাঞ্ছনা, বা নেতিবাচক ধারণা অথবা পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না। আবার কখনো শিশুকেই দোষারোপ করা হয়।
এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে – তাদের ভয় দেখানো, অস্বস্তিতে ফেলা বা অনিরাপদ করার অধিকার কারোর নেই। কেউ ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে কিংবা গোপন কিছু রাখতে বললে শিশুকে অবশ্যই বিশ্বস্ত কোনো প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। আর শিশু যখন কথা বলবে, তখন বড়দের তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।
স্কুল ও মাদ্রাসা শুধু শিক্ষার স্থান নয়; এগুলো হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ও। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি (Child Safeguarding Policy) থাকা এবং শিক্ষক-কর্মীদের শিশু নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া এবং শিশুর গোপনীয়তা রক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কেও বয়স-উপযোগী শিক্ষা জরুরি।
তথ্য-প্রযুক্তি ঝুঁকি তৈরি করে, আবার সহায়তাও করতে পারে
নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে একটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ফুটেজ এবং পরিবহন-সংক্রান্ত তথ্যসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত উপায়ও অনুসন্ধানে সহায়ক হতে পারে।
ঢাকার একটি থানায় কোনো শিশু নিখোঁজ হলে সেই তথ্য যেন শুধু একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। শিশুটিকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত এ সংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানানো প্রয়োজন।
হেলফ লাইন-১০৯৮ সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবে
বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য Child Helpline 1098 একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার কতজন অভিভাবক এবং কতজন শিশু এই নম্বরটি জানে? স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশনসহ জনসমাগমস্থলে এই ১০৯৮ নম্বরটি দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা উচিত। শিশুদের মনে সহজ একটি বার্তা পৌঁছাতে হবে – বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও।
শিশু সুরক্ষা সবার দায়িত্ব
শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম – সবারই ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকা, বেড়ে ওঠা এবং শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে এখনই জোরালো প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্ত করা এবং পরিবারকে সরকারি ও অন্যান্য সেবার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গণমাধ্যমেরও বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গোপনীয়তা বিবেচনা করতে হবে। এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিরোধ
একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই উদ্ভূত ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়।
আমাদের এমন একটি সমাজ গঠন করতে হবে, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, স্কুলে সুরক্ষিত থাকবে, অনলাইনে কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে হয় তা জানবে এবং নির্যাতনের কথা ভয় ছাড়াই বলতে পারবে। আর কোনো শিশু যখন মুখ খুলবে, তখন তাকে দোষী নয় – সুরক্ষা ও সহায়তা লাভের অধিকারী একজন শিশু হিসেবে দেখতে হবে।
শিশু নিরাপত্তা; শিশুর একটি অধিকার
শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে আমাদের শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয় – “শিশুটি কোথায়?” আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করতে হবে – “কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?”
আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন দেরিতে না হয়। কারণ, একটি শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো – তাকে নিরাপদ রাখা। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved.©natunbazar24.com
Developed by: A TO Z IT HOST
Tuhin