
তরিকুল ইসলাম তরুন, কুমিল্লা
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে একই গ্রামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ওই তরুণী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সম্প্রতি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। তবে সন্তান জন্মের পর নবজাতককে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এদিকে স্থানীয় সালিশে অভিযুক্তের পরিবারের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী পরিবারকে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও ওই অর্থ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে পরিবারটি।
ঘটনাটি উপজেলার কনকাপৈত ইউনিয়নের কালকোট গ্রামের। অভিযুক্ত যুবক জাহিদুল ইসলাম ওরফে আবির ওই গ্রামের আমির হোসেন প্রকাশ লাকির ছেলে। এ ঘটনায় স্থানীয় সালিশদার হাজী মোস্তফা ও অভিযুক্তের জেঠা নজরুল ইসলাম মনিরের নামও আলোচনায় এসেছে। তবে নবজাতককে বিক্রির অভিযোগ এবং সালিশে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
ভুক্তভোগীর মায়ের অভিযোগ, অসুস্থ বৃদ্ধ মায়ের চিকিৎসার জন্য তাঁকে দীর্ঘ সময় ঢাকার একটি হাসপাতালে অবস্থান করতে হয়েছিল। এ সময় বাড়িতে থাকা তাঁর মেয়েকে জাহিদুল ইসলাম ওরফে আবির জোরপূর্বক ঘরে প্রবেশ করে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। ভয়ে তরুণী প্রথমদিকে বিষয়টি কাউকে জানাননি।
পরবর্তী সময়ে মেয়ের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন ও নানা জটিলতা দেখা দিলে তাঁর মা বিষয়টি বুঝতে পারেন। পরে মেয়ের কাছ থেকে বিস্তারিত ঘটনা জানার পর অভিযুক্তের পরিবারকে বিষয়টি অবহিত করেন। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, প্রথমদিকে অভিযুক্তের পরিবার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং উল্টো তরুণীকে নিয়ে নানা অপবাদ দেওয়া হয়।
পরিবারটির অভিযোগ, একপর্যায়ে অভিযুক্ত যুবক ঘটনা স্বীকার করেন। এরপর ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলে অভিযুক্তের পরিবার তা নাকচ করে দেয়। পরে বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তির পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে দাবি স্বজনদের।
ভুক্তভোগী পরিবারের আরও অভিযোগ, অভিযুক্তের বাবা প্রবাসে থাকায় তাঁর জেঠা নজরুল ইসলাম মনির বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগে যুক্ত হন। একই গ্রামের হাজী মোস্তফার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মাকে আর্থিক প্রস্তাব দিয়ে বিষয়টি প্রকাশ না করার জন্য চাপ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। একাধিকবার হাজী মোস্তফার বাড়িতে ডেকে নিয়ে সমাধানের জন্য চাপ প্রয়োগ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও তুলেছে পরিবারটি।
ভুক্তভোগীর বাবা প্রায় ১২ বছর আগে মারা গেছেন। এরপর থেকে তাঁর মা চার সন্তানকে নিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন। পরিবারের দাবি, অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
সন্তান জন্মের পর নবজাতককে অন্যত্র দেওয়ার অভিযোগ
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর প্রসবব্যথা শুরু হলে শুক্রবার রাতে তাঁকে চৌদ্দগ্রাম বাজার এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়।
পরিবারের অভিযোগ, সন্তান জন্মের পর নবজাতককে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। প্রসবসংক্রান্ত ব্যয় অভিযুক্ত যুবকের পরিবারের পক্ষ থেকে বহন করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে নবজাতককে কার কাছে দেওয়া হয়েছে, বর্তমানে শিশুটি কোথায় রয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সালিশে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্তের দাবি
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগের সময় অভিযুক্তের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের ৩ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়। তবে এ অর্থ কবে দেওয়া হবে, আদৌ দেওয়া হবে কি না—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
ভুক্তভোগীর বোন বলেন, “আমার বাবা ১২ বছর আগে মারা গেছেন। এরপর থেকে মা আমাদের চার ভাই-বোনকে নিয়ে অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছেন। মা নানুর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় থাকার সময় আমার বোনের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা জানতে পারি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আমাদের বোনকে নানা অপবাদ দেওয়া হয়। পরে আমাদের ওপর চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “শুক্রবার রাতে আমার বোন একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু আমাদের পারিবারিক অবস্থা ও সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে নবজাতককে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। বোনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার হিসেবে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই টাকা পাব কি না, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।”
### অভিযোগ অস্বীকার সংশ্লিষ্টদের
অভিযোগের বিষয়ে সালিশদার হাজী মোস্তফা বলেন, তিনি অভিযুক্তের জেঠা মনিরের দোকানে বসা ছিলেন। অন্যরা বাড়ির ভেতরে গিয়ে সমঝোতা করেছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। টাকার বিনিময়ে সমঝোতা হয়ে থাকলেও কত টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। নবজাতক বিক্রির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও দাবি করেন।
অভিযুক্তের জেঠা নজরুল ইসলাম মনির বলেন, “এই বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গে বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানি না। কারা কীভাবে কী করেছে, তা আপনারা খোঁজ নেন।”
এ বিষয়ে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফ হোছাইন বলেন, “বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ দায়ের করলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, নবজাতকের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগী তরুণীর নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।