রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :-
চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিক্ষা সম্মেলন ‎পাইকগাছায় স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ‎পাইকগাছায় ১৫১টি মন্দিরে অনুষ্ঠিত হবে শারদীয় দুর্গাপূজা; চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি পীরগঞ্জে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে দুঃস্থদের মাঝে বস্ত্র বি-তরণ মুকসুদপুরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষ আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত কেশবপুর পৌরসভার উদ্যোগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক অভিযান ও পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালন রাতের আঁধারে জ-বাই করা গরু ভ্যানে পরিবহন ক্ষেতলালে চারজনকে জ-রিমানা চারঘাটে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণ সাড়ে ৩ লাখ টাকায় চাকরি, পরে অব্যাহতি—সংবাদ প্রকাশের পরও বহাল ইমন রুহিয়ায় সাংবাদিকদের সাথে বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনের মতবিনিময়

‎পাইকগাছার শোল মাছ চাষে বদলে দিচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ৯২ Time View

‎ইমদাদুল হক, পাইকগাছা (খুলনা)।।
‎ভোর বা বিকেল—প্রকৃতির রূপ যাই হোক না কেন, নির্দিষ্ট সময় আসতেই খুলনার পাইকগাছা উপজেলার প্রত্যন্ত চাঁদখালী ইউনিয়নের পূর্ব গজালিয়া, উত্তর গড়ের আবাদ, দক্ষিণ গড়ের আবাদ, কালুয়া এবং বাদুড়িয়া গ্রামের পুকুরপাড়গুলোতে শুরু হয়ে যায় এক অন্যরকম কর্মযজ্ঞ। কারও হাতে ধারালো বটি, কেউ নিপুণহাতে তেলাপিয়া ও সিলভার কার্প মাছ সহ ছোট বড় মাছ কেটে প্রস্তুত করছেন শোল মাছের সুষম খাদ্য। ঘড়ির কাঁটায় নির্ধারিত সময় মেনে পুকুরের জলে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সেই খাবার।
‎মুহূর্তের মধ্যেই শান্ত জলের নিচ থেকে শত শত রুপালি-কালচে শোল মাছ একসঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে ভেসে ওঠে খাবারের জন্য। পানির সেই তীব্র আলোড়ন কেবল খাবার গ্রহণের প্রতিযোগিতা নয়; সেই দৃশ্য যেন মৌন ভাষায় জানিয়ে দেয়—এই জলের প্রতিটি তরঙ্গে প্রতিদিন অঙ্কুরিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের বহুকালের অবদমিত স্বপ্ন। যে প্রত্যন্ত জনপদ একসময় বঞ্চনা ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার গল্প বলত, হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকা আজ দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে শোল মাছ চাষের সফল জনপদ হিসেবে।
‎জঞ্জালভরা পুকুর থেকে লাখ টাকার আয়ের হাতছানি
‎সরেজমিনে উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে পা রাখতেই চোখে পড়ে এক সুশৃঙ্খল গ্রামীণ চিত্র। এই জনপদের ছোট-বড় অজস্র পুকুরে সকাল ও বিকালে নিয়ম মেনে বাণিজ্যিকভাবে চলছে শোল মাছের নিবিড় চাষ। প্রতিটি পুকুরের চারপাশ বাঁশের চটা ও জালের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা, যাতে কোনো জলচর ক্ষতিকর প্রাণী প্রবেশ করতে না পারে।
‎অথচ এই দৃশ্যপট কয়েক বছর আগেও সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। পুকুরগুলো ছিল আগাছায় ভরা, মালিকদের কাছে যা ছিল কেবলই এক অলস সম্পদ। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা রমেশ চন্দ্র সরকার স্মৃতির পাতা উল্টে বলেন, “আজ থেকে পাঁচ-ছয় বছর আগে এই পুকুরগুলোর বেশির ভাগই কচুরিপানায় ঢেকে থাকত। পুঁজি উদ্ধার করা দায় হতো। কিন্তু আজ আমাদের এই অলস জলই গ্রামের পুরো চেহারা বদলে দিয়েছে।”
‎বেকারত্বের অভিশাপ পেরিয়ে উদ্যোক্তার মুকুট
‎শহরের গলিতে গলিতে চাকরির আবেদনপত্র হাতে ঘুরে ঘুরে জুতো ক্ষয় করা যুবকদের জন্য পাইকগাছার এই গ্রামগুলো এখন এক আশার আলোকবর্তিকা। স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা প্রসেনজিৎ রায় বলেন, “যখন বুঝলাম চাকরি আমার কপালে নেই, তখন নিজের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে একটি ছোট পুকুর লিজ নিয়ে শোল মাছ চাষ শুরু করলাম। শুরুতে ভীতি থাকলেও আজ তা জয় করেছি। এই চাষ থেকে যে আয় হয়, তাতে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আমি এখন আত্মবিশ্বাসী।”
‎শোল মাছ চাষের এই সফলতার গল্প কেবল পুরুষদের হাত ধরে লেখা হয়নি; এর পেছনে রয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অদম্য নারীদের নিরলস শ্রম। গৃহিণী পম্পা রানী বলেন, “প্রতিদিন সকালে ও বিকালে মাছের খাবার প্রস্তুত করার মধ্য দিয়ে আমার দিন কাটে। এই কাজের বাড়তি আয় দিয়ে ছেলের পড়াশোনার খরচ মেটাচ্ছি। আজ পরিবারের আর্থিক সংকটে নিজে ভূমিকা রাখতে পারছি—এর চেয়ে বড় তৃপ্তি কী হতে পারে!”
‎ক্ষুদ্র পরিসরে বৃহৎ সাফল্য ও অর্থনীতির নতুন চক্র
‎শোল মাছ চাষের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর কম জমির ব্যবহার এবং আকাশচুম্বী মুনাফা। স্থানীয় সফল চাষি সুভাষ চন্দ্র মণ্ডল জানান, মাত্র ৬ শতক আয়তনের একটি ছোট পুকুরে তিনি ২ হাজার ৬০০টি শোল মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। মাত্র সাত-আট মাসের ব্যবধানে সেই মাছগুলো একেকটি ৭০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের হয়ে ওঠে। সমস্ত খরচ বাদ দিয়েও তাঁর লাভ থাকে প্রায় দ্বিগুণ।
‎চাষিদের তথ্যমতে, প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে নির্দিষ্ট সময়ে তেলাপিয়া এবং সিলভার কার্প মাছ কেটে সুষম খাদ্য হিসেবে সরবরাহ করা হয়। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল সহযোগী বাজার। খাদ্য প্রস্তুতকারী শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক এবং পাইকারি ব্যাপারী—সব মিলিয়ে পুরো এলাকায় তৈরি হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থান। স্থানীয় পাইকারি মাছ ব্যবসায়ী অনিল কুমার দাস বলেন, “খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ দক্ষিণ জনপদের বিভিন্ন জেলা থেকে বড় বড় পাইকার ও ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন আমাদের এই গ্রামগুলোতে ছুটে আসেন নগদ টাকায় মাছ কিনে নিয়ে যাওয়ার জন্য।”
‎মৎস্য বিভাগের চোখে এক অনুকরণীয় মডেল
‎পাইকগাছার এই শোল মাছ চাষের বিপ্লবকে গভীর গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে সরকারি মৎস্য বিভাগ। উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত মল্লিক অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “পাইকগাছার চাঁদখালীর এ অঞ্চলে শোল মাছ চাষ দেশের অন্যতম সফল ও টেকসই মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এখানকার চাষিদের অদম্য আগ্রহ ও পরিশ্রমই এর মূল চালিকাশক্তি। পরিকল্পিতভাবে এ চাষ আরও সম্প্রসারণ করা গেলে পাইকগাছা দেশের অন্যতম শোল মাছ উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হবে।”
‎ভোরের মিষ্টি রোদে বা বিকালের আলোয় যখন পাইকগাছার পুকুরের জলে ঝাঁকে ঝাঁকে শোল মাছের রূপালি ঝিলিক ছড়ায়, তখন তা কেবল একটি মাছ চাষ প্রকল্পের সাফল্য প্রকাশ করে না; বরং তা এক সম্ভাবনাময় গ্রামীণ জনপদের ঘুরে দাঁড়ানোর অবিনাশী উপাখ্যান। অবহেলা আর জঞ্জালকে পেছনে ফেলে পাইকগাছা আজ প্রমাণ করেছে—ইচ্ছা এবং সঠিক পরিশ্রম থাকলে জলের বুদবুদেও সোনা ফলানো সম্ভব।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved.©natunbazar24.com
Developed by: A TO Z IT HOST
Tuhin