
রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলীঃ বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত রাজশাহী অঞ্চলে চলতি মৌসুমের বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয় শুরু হয়েছে। শুরুতেই শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। এতে জমিতে পাঁকা ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। জ্বালানি সংকটের কারণে কমেছে ধানের দাম, যার কারণে বহিরাগত শ্রমিকরা আসছেনা ধান কাটতে। রাজশাহী অঞ্চলে পাঁকা ধান জমিতে ভরপুর। শ্রমিক সংকটে ধান কাটতে পারছে কৃষকরা। এতে করে কৃষকের রক্ত ঘামের সোনালি ফসল যেন গলার কাঁটা হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ঝড় বৃষ্টির কারণে রাজশাহী অঞ্চলে বিলের নিচু জমির ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। চলছে বৈশাখ মাস, বিরাজ করছে তীব্র তাপ প্রবাহ, সাথে রয়েছে ভ্যাবসা গরম। ফলে শ্রমিকের জন্য হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মোট ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী জেলাতেই আবাদ হয়েছে ৬৮ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ধান পেকে সোনালি রঙে শোভা ছড়িয়ে দুলছে জমিতে। এখন সেই সোনা ধান ঘরে তুলতে মাঠে মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। তবে শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষকরা জানান, বিলের জমির ধান পেকে গেছে। ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু ধানের দাম নেই। এক মণ ধান বেঁচে একজন শ্রমিকের খরচ উঠছে না। ধান কাটার মুল ভরসা বহিরাগত শ্রমিকরা। কিন্তু দাম না থাকার কারণে শ্রমিকরা এখনো আসেনি বা আসতে চাচ্ছে না। আবার ধান কাটার পর ট্রলিতে করে রাস্তায় আনা হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রলিও নেই। পাকা ধান নিয়ে মহা যন্ত্রণায় পড়তে হচ্ছে। শাকির উদ্দিন নামের এক কৃষক জানান, কয়েকদিন ধরে ধান কাটা শ্রমিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ধানের দাম না থাকার কারণে শ্রমিকরা ধান কাটতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। শ্রমিকরা ধান কাটলেও বহন করতে চায়না। গাড়ি করে বহন করা হয়। কিন্তু তেল না পাওয়ার কারণে গাড়ি বন্ধ। বৈশাখ মাস। যে কোনো সময় ঝড় বৃষ্টি হলে পাকা ধানের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়বে।
সাহেব আলী নামের আরেক কৃষক জানান, বিগত বছর গুলোতে ধান কাটার আগেই শ্রমিকরা জমি দেখে যেত, কখন কাটা হবে, এজন্য কখন আসতে হবে। কিন্তু এবারের চিত্র পুরোটাই উল্টো। ধান পেকে গেছে কাটার সঠিক সময়। কিন্তু শ্রমিক মিলছে না। আবার তীব্র তাপমাত্রা শুরু হয়েছে। বিলের নিচু জমির প্রায় ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। মাটিতে নুয়ে পড়লে কাটতে চাইনা শ্রমিকরা। কাটলেও দ্বিগুণ খরচ হয়। তালন্দ এলাকার কৃষক আমিনুল ইসলাম, আরশাদ আলীসহ অনেকে জানান, ধানের চাষাবাদ করা যাবেনা। সারের সংকট, জ্বালানি সংকট, দামে ধস, শ্রমিক সংকটে ধান কাটা যাচ্ছে না। এক মণ ধানের দাম ৮০০/৯০০ টাকা। অথচ সারা দিন একজন শ্রমিকের মূল্য দিতে হচ্ছে ৮০০ টাকা করে। আবার পাকা ধানে ব্যাপকহারে দেখা দিয়েছে পাতাপোড়া বা বিএলবি রোগ। এরোগের কারণে ধান চিটা হয়ে পড়ছে। কীটনাশক প্রয়োগ করেও কাজ হচ্ছে না। শাকিল আহমেদ, মিলন হোসেন, এন্তাজ আলী, নাদিম মোস্তফা নামের কৃষকরা জানান, শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বহিরাগত শ্রমিকরা না আসলে ধান কাটা কষ্টকর ব্যাপার। বিগত বছরে গুলোতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা আসত। কিন্তু তেল সংকটের কারণে তারা আসতে পারছেনা। কারণ তারা নিজস্ব ট্রলি বা বহনের গাড়ি নিয়ে আসে। গাড়িতে তেল না পাওয়ার কারণে আসছেনা। স্থানীয় শ্রমিক খুবই কম। যারা ধান কাটে তারা মজুরি হিসেবে।
সকাল ৭ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত ধান কাটে। এজন্য ৫০০ টাকা করে মুজুরি দিতে হয়। আর চুক্তি হিসেবে বিঘায় ৫ মন করে ধান দিতে হচ্ছে। তাও শ্রমিক মিলছে না। বিঘা প্রতি কাটা মাড়ায় ৭ হাজার টাকা করে খরচ হবে। সেই হিসেবে রোপণ থেকে কাটা মাড়ায় পর্যন্ত বিঘায় ২৩ হাজার টাকা করে খরচ হবে। বিঘায় যদি ২৫ মণ ধান হয় তাহলে বর্তমান বাজার মূল্য এক মণ ৮০০ টাকা। সেই হিসেবে ২৫ মণ ধানের দাম আসে ২০ হাজার ধানের দামে ধস কাটতে আসছে না শ্রমিক বেকায়দায় বিলপাড়ের কৃষকরা টাকা। বর্তমান বাজারে ধানের দামে প্রতি বিঘায় ৩/৪ হাজার টাকা করে লোকসান হচ্ছে।
শাকির উদ্দিন আরো জানায়, মাটিতে পড়ে থাকা ধান কাটতে বিঘায় শ্রমিক লাগবে ৬ জন করে। খাড়া এক বিঘা জমির ধান কাটতে লাগবে ৪ জন করে। পড়ে থাকা ধান ভূত মেশিনে মাড়ায় করতে বিঘায় ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা করে লাগছে। বিগত ধানের দামে ধস কাটতে আসছে না শ্রমিক বেকায়দায় বিল পাড়ের কৃষকরা সময়ে ৫/৬ শত টাকা করে লাগত। জ্বালানি সংকটের কারণে বেড়েছে খরচ।
তানোর উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, উপজেলার চান্দুড়িয়া থেকে কামারগাঁ ইউপির চৌবাড়িয়া মালশিরা পর্যন্ত বিলের জমি। এসব জমিতে আগাম বোরো চাষ হয়। চলতি মৌসুমে ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর বিলের জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। প্রায় জমির ধান পেকে গেছে। তিনি আরো জানান, যেভাবেই হোক দ্রুত সময়ের মধ্যে ধান কাটতে হবে। কারণ বৈশাখ মাস। কোন সময় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করে তুলতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের উপপরিচালক সাবিনা বেগম বলেন, ধান কাটা কেবল শুরু হয়েছে। এখনই শ্রমিকসংকট বলা যাবে না। কারণ রাজশাহীতে ধান কাটতে বিভিন্ন জেলার শ্রমিকরা আসেন। তারা এখনো আসেননি। সব জমির ধান পাকলে ওই শ্রমিকরা আসবেন। তখন সংকট বোঝা যাবে না।
মোঃ হায়দার আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক,
রাজশাহী।