
রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলী।। রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ৪ হাজার ৬২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান হওয়ায় জনগন দারুন খুশি। কাজ শেষ হলে রাজশাহী ওয়াসার পানি সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হবে। একইসঙ্গে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের বিশুদ্ধ পানির সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে লাখ লাখ মানুষের সুপ্রেয় পনি সমস্যার সমাধান হবে। ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের পাইপ বসানোর সময়, রাস্তার ধারের গোদাগাড়ী পৌরসভার বেশকিছু ড্রেন, সাধরন মানুষের বাড়ী, দোকান, মসজিদের কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেগুলি পুনঃনির্মান করে দিয়ে প্রশাংসায় ভাসছেন, চীন-বাংলাদেশ যৌথ প্রকল্পের কর্মকর্তা কর্মচারীগণ।
এ প্রকল্পের কাজটি সরজমিনে নেতা, কর্মী সমর্থকদের নিয়ে রাজশাহী ১ আসনের সংসদ, জামায়াতের নায়েবী আমীর অধ্যাপক মোঃ মুজিবুর রহমান। গত ২৪ জুলাই শুক্রবার সকাল ১১ সময় পরিদর্শনকালে তিনি প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান কর্মকর্তার সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি বলেন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক উদ্যোগ। স্থানীয় জনগণের জন্য নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে প্রকল্পের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল জনবল প্রদানে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী জেলা আমীর অধ্যাপক আব্দুল খালেক, রাজশাহী জেলা শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি ড. মোঃ ওবায়দুল্লাহ, গোদাগাড়ী উপজেলা আমীর মাস্টার নোমান আলীসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। জনস্বার্থে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের উন্নয়নমূলক উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
এ প্রকল্পের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। ওয়াসার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন কাজ শুরু করে প্রকল্পের ভবিষ্যত খুবই ভাল ভালমানের নির্মান সামগ্রী ব্যবহার করায় মানুষ প্রকল্পের বিষয়টি ভালভাবে নিচ্ছেন জনসাধারণ গোদাগাড়ীর পদ্মার ভূ-উপরিস্থ পানি শোধন করে সরবরাহ করা হবে রাজশাহী শহরে।
রাজশাহীতে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বাংলাদেশ-চীনের যৌথ উদ্যোগে নির্মাণাধীন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্প। চার বছরের মেয়াদের এই প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার তিন বছরের মাথায় শেষ হয়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। রাজশাহী – চাঁপাই নবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশ দিয়ে পাইপ বসানোর কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। একইসঙ্গে নগরজুড়ে পানি সরবরাহের পাইপলাইন বসানোর কাজও এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে। ক্রমবর্ধমান নগর রাজশাহীর জনসংখ্যা ও নগরায়ণের সঙ্গে বাড়ছে সুপেয় পানির চাহিদাও। বর্তমানে নগরীতে প্রতিদিন প্রায় তিন কোটি ৭০ লাখ লিটার পানির ঘাটতি রয়েছে। এই সংকট নিরসনে ২০১৮ সালের অক্টোবরে একনেক সভায় অনুমোদন পায় রাজশাহীতে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার প্রকল্প। পরে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয় গোদাগাড়ী উপজেলার জোত-গোসাইদাস এলাকায়।
উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এই পানি শোধনাগার প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে তিনটি ধাপে। পদ্মা ও মহানন্দা নদীর মোহনায় নির্মাণ করা হচ্ছে ইনটেক পয়েন্ট। এর কাছেই গড়ে উঠছে দৈনিক ২০ কোটি লিটার পানি শোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন মূল ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। আর নগরীর পাশে পবা উপজেলার হরিপুর এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে বুস্টার প্লান্ট। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবগুলো অংশের কাজই এগিয়ে চলছে পরিকল্পনা অনুযায়ী।
গোদাগাড়ী পৌরসভার সচিব ও প্রকৌশলী সারেয়ার জাহান মুকুল বলেন, পাইপ লাইন বসানোর সময় মহিশালবাড়ী বাড়ী হতে সিএন্ডবি পর্যন্ত পৌরসভার নির্মিত ড্রেন সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলি কিছু নির্মান করে দিয়েছেন, বাকী গুলি নির্মান প্রক্রিয়াধীন। কত মিটার ড্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কি পরিমান অর্থ পৌরসভার ব্যয় হয়েছে তা জানাতে পারে নি এ পৌরসভার প্রকৌশালী।
রাজশাহী ওয়াসার সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘সর্বমোট মিলে ১৮০০ প্লাস শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করছে। কাজের গতি খুবই ভালো, দৃশ্যমান। আমাদের কাজের ফিজিক্যাল পার্সেন্টেজ অলমোস্ট ৭৫ শতাংশ হয়ে গেছে। আমরা আশা করছি খুব দ্রুত কাজ শেষ হয়ে যাবে।’
রাজশাহী ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. পারভেজ মামুদ বলেন, ‘আগামী ২০৩৫ এর জন্য মহানগরে যে পানির চাহিদা থাকবে সেটাকে বিবেচনায় রেখে আমরা প্লান্টের ক্যাপাসিটি নির্ধারণ করেছি। ২৬.৫ কিলোমিটারের মধ্যে অলরেডি আমরা ২১ কিলোমিটার পাইপ বসিয়ে ফেলেছি।’
চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, পদ্মা নদীর ইনটেক পয়েন্ট এলাকায় বছরজুড়েই অন্তত ৩০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া যাবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আর আধুনিক চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার পানির গুণগত মান ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
প্রকল্পে দেখা যায়, পদ্মায় পানির উচ্চতা ঠিকই আছে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মার পানিকে প্রধান উৎস ধরে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করছে ওয়াসা। ওয়াসা বলছে, সারা বছর এখানে অন্তত ৩০ ফুট গভীর পানি থাকবে। প্রতিদিন পানি সাপ্লাই দেবে ২০ কোটি লিটার। রাজশাহী ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ও চীনের হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড যৌথভাবে কাজ করছে। এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৬২ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ১ হাজার ৭৪৮ কোটি ও হুনান কন্সট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ার গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড ২ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা অর্থায়ন করবে। প্রকল্পটি জুলাই ২০১৮ শুরু করে জুলাই ২০২৪ সালে শেষ করার কথা থাকলেও এখন দিন রাত সমান তালে কাজ করছরন। চাইনা এ কোম্পানী কতৃপক্ষ ৮০ ভাগ স্থানীয় লেবার, টেকনিশান ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন কয়েক হাজার স্থানীয় শ্রমিক, ড্রাইভার কাজ করছেন।
স্থানীয় বালু ব্যবসায়ীগন উপকৃত হচ্ছেন।
তাদের নিকট থেকে বালু ক্রয় করে নিচ্ছেন। সঠিক সময়ে বিলও পরিশোধ করছেন। গোদাগাড়ী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যবসায়ী, শ্রমিকগণ উপকৃত হচ্ছেন। দু হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
অত্যন্ত ব্যয়বহুল রাজশাহী ওয়াসার এই প্রকল্প নিয়েই কোন প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ ধরণের প্রকল্পে মূলে হল উন্নতমানের পাইপ ও অন্যান্য সামগ্রীর ব্যবহার। কারণ এ ধরনের শোধনাগার কমপক্ষে ৭০ বছরের জন্য করা হয়ে থাকে। রাজশাহী ওয়াসার ট্রিটমেন্টে চাইনা কোম্পানী উন্নত সামগ্রী ব্যবহার করায় এর জীবন কাল আরো দীর্ঘ হবে ইনসাল্লাহ। ট্রিটমেন্টে উন্নত সামগ্রী ও ফ্রান্সের বিশ্বখ্যাত পানিশোধন প্রযুক্তি ও চীনের উন্নতমানের জিংজিয়ান কোম্পানীর পাইপ স্থাপন করা হচ্ছে। এ কাজ আরও গতি পাবে বলে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন।
মোঃ হায়দার আলী
রাজশাহী।