
মোঃ শহীদুল ইসলাম,
বিশেষ প্রতিবেদকঃ
চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। জ্বালানি ঘাটতি ও একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গিয়ে লোডশেডিং ২৫০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। ফলে দিনের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎবিহীন কাটাতে হচ্ছে নগরবাসীকে, আর রাত নামলেই দুর্ভোগ চরমে পৌঁছাচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ১৫ এপ্রিল সকাল ১১টায় চাহিদা ছিল ১,৩৮৪ মেগাওয়াট, যা সন্ধ্যা ৭টায় বেড়ে দাঁড়ায় ১,৪৩২.৭৩ মেগাওয়াটে। বিপরীতে সরবরাহ ছিল সকাল ১,০৯৫.৯৬ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় প্রায় ১,৪৭০ মেগাওয়াট। বাস্তব চিত্রে কার্যকর লোডশেডিং ২৫০ থেকে ২৮০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে, যার প্রভাব ১৭ এপ্রিলেও বহাল রয়েছে।
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬টি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। জ্বালানি সংকট—বিশেষ করে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায়—এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট ২, ৩ ও ৫ বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি রাউজান-১ ও রাউজান-২ কেন্দ্র উৎপাদনের বাইরে। জুডিয়াক কেন্দ্রটিও বন্ধ থাকায় উৎপাদন সক্ষমতায় বড় ধরনের ধস নেমেছে।
সচল কেন্দ্রগুলোর অনেকই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এনলিমা কেন্দ্র সকালে ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও সন্ধ্যায় তা নেমে আসে মাত্র ১৭ মেগাওয়াটে। আনোয়ারা ইউনাইটেড, বিআর পাওয়ার, এনার্জিপ্যাকসহ বেশ কয়েকটি কেন্দ্র আংশিক সক্ষমতায় চলছে।
অন্যদিকে মাতারবাড়ি, শিকলবাহা ও বাঁশখালীর এস আলম বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন হলেও তা চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে সংকট কাটছে না।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইপিজেড, বন্দরটিলা, কাঁচা বাজার, চকবাজার, বহদ্দারহাট, পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, হালিশহর ও বন্দর এলাকায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে তা ফিরে আসতে সময় লাগছে দুই থেকে তিন ঘণ্টা।
ভ্যাপসা গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। ওয়াসার পানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় অনেক এলাকায় পানি সংকট তৈরি হয়েছে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন।
বিশেষ করে রাতের বেলায় লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে। কিন্তু বর্তমান জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অফিস সময় কমানো ও শপিং মল দ্রুত বন্ধ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং বন্ধ কেন্দ্রগুলো চালু না করা গেলে এই সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণের সম্ভাবনা কম।
চট্টগ্রাম পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসের চাপ কম এবং জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ১৭ এপ্রিলের চিত্র বলছে—চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ সংকট এখন নগরজীবনের জন্য এক গভীর দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।