
এস.এম.সাইফুল ইসলাম কবির, বিশেষ প্রতিনিধি :
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছে খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাম ফর আনপ্রিভিলিজড চাইল্ড (সি ইউ সি)। সংগঠনটির উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে ঈদবস্ত্র বিতরণ এবং দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা শিশুদের মুখে এনে দিয়েছে আনন্দের হাসি এবং সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছে সহমর্মিতার বার্তা।
গত সোমবার (৯ মার্চ ২০২৬) বিকেল ৪টায় নগরীর ৬১ সাউথ সেন্ট্রাল রোডস্থ নার্গিস মেমোরিয়াল হসপিটাল প্রাঙ্গণে অবস্থিত সি ইউ সি স্কুলে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। ঈদকে সামনে রেখে আয়োজিত এ মানবিক কর্মসূচিতে অংশ নেয় সংগঠনটির তত্ত্বাবধানে শিক্ষালাভ করা সুবিধাবঞ্চিত শিশু, তাদের অভিভাবক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সুধীজন।
গার্ড অব অনারে অতিথি বরণ
অনুষ্ঠানের শুরুতেই সি ইউ সি স্কুলের শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খলাবদ্ধ প্যারেড ও গার্ড অব অনারের মাধ্যমে প্রধান অতিথিকে সম্মাননা জানায়। শিশুদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই পর্ব উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায় এবং শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও শৃঙ্খলার পরিচয় তুলে ধরে।
সংগঠনের সভাপতি মোঃ শাহিন হোসেনের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সম্পাদক আরিফা ইসলাম খুকুমণির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান, বিপিএম (সেবা)।
অতিথিদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত আয়োজন
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নার্গিস মেমোরিয়াল হসপিটালের এমডি ও সিইও ডা. কাজী আরিফ উদ্দিন আহমেদ, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ এবং এম এম শাকিলুজ্জামান, সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. গোলাম মোর্শেদ, রোটারিয়ান মো. ইফতেখার আলী বাবু (উপদেষ্টা, সি ইউ সি খুলনা), সংগঠনের সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ শহীদ ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইমদাদ আলীসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন কোষাধ্যক্ষ মীমা আক্তার মনিকা, দপ্তর সম্পাদক কারীমা আক্তার, প্রচার সম্পাদক চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস, কার্যকরী সদস্য ধনঞ্জয় রায় ও মোঃ সোহানসহ সংগঠনের সদস্যরা।
মানবিক শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে সি ইউ সি
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং তাদের মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সি ইউ সি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শিক্ষা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে এসব শিশুদের আত্মনির্ভর নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সংগঠনটির কার্যক্রম প্রশংসনীয়।
বক্তারা আরও বলেন, সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষ যদি এগিয়ে আসে, তবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ ও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। মানবিক উদ্যোগগুলো সামাজিক বৈষম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিক্ষার্থীদের মাঝে ঈদবস্ত্র বিতরণ। নতুন পোশাক হাতে পেয়ে শিশুদের উচ্ছ্বাস ও হাসিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজনস্থল। অনেক শিশুই জানায়, নতুন পোশাক পাওয়ার আনন্দ তাদের ঈদকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।
এরপর সকলের অংশগ্রহণে দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ইফতার পর্বে অতিথি, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্বেচ্ছাসেবীরা একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেন, যা সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের এক সুন্দর উদাহরণ হয়ে ওঠে।
শিক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ
সি ইউ সি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ মুজাহিদ হোসেন মিরাজসহ শিক্ষকবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষকদের মধ্যে সহকারী শিক্ষক মুফতি সাজিদুর রহমান, আকলিমা বেগম, হালিমা বেগম, মোঃ মামুনুর রশিদ, মোঃ শুভ, মোঃ মনিরুল ইসলাম, আসমা হোসেন তুলি, শারমিন জাহান বর্ষা, হাওয়ারিয়া ও মোঃ ফজলুল হকসহ অন্যান্য শিক্ষক অংশগ্রহণ করেন।
এ ছাড়া বিএনসিসি ক্যাডেট সুখী আক্তার, ক্যাডেট শাহিন, ক্যাডেট পবন ও ক্যাডেট রেজওয়ানা ইসলামসহ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
মানবিক সমাজ গঠনের প্রত্যয়
আয়োজকরা জানান, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ভাগাভাগি করার লক্ষ্যেই প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজন করা হয়। ভবিষ্যতেও সমাজের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মানবিকতার এই আয়োজন প্রমাণ করে—সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসে, তবে কোনো শিশুই অবহেলিত থাকবে না। ভালোবাসা, শিক্ষা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর ও সমতাভিত্তিক সমাজ, যেখানে ঈদের আনন্দ হবে সবার জন্য সমান।