
কে এম সোহেব জুয়েল বরিশালঃ
বরিশালের গৌরনদী বাটাজোর বসার গ্রামের যৌতুকের সাত লাখ টাকা না দেওয়ায় পিতৃহীন এক অসহায় তরুণী—প্রিয়াঙ্কা বেপারী—আজ দুই বছর ধরে স্বামীর সংসার থেকে বিতাড়িত। অভিযোগ, স্বামী দেবাশীষ বৈরাগীর নির্মম নির্যাতনে গুরুতর আহত হয়ে তাকে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। মানবিক বোধকে নাড়া দেওয়া এ ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার চানপুর ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের অনিল বৈরাগীর ছেলে দেবাশীষ বৈরাগী ২০১৭ সালে সামাজিকভাবে প্রিয়াঙ্কাকে বিয়ে করেন। বিয়ের কিছুদিন পরই বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্যে শ্বশুরের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করেন। মেয়ের সুখের আশায় অসহায় পিতা নিজের ধানের জমি বিক্রি করে দুই লাখ টাকা দেন। সেই অর্থ নিয়ে দেবাশীষ মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান।
দীর্ঘ সাত বছর বিদেশে থাকার পর ২০২৪ সালে দেশে ফিরে তিনি আবারও নতুন করে সাত লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন—ইতালি যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে প্রিয়াঙ্কার পিতা মারা যান। পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। টাকা দিতে অপারগতার কথা জানালে, অভিযোগ আছে—দেবাশীষ তাকে বেদম মারধর করেন, অমানবিক নির্যাতন চালান এবং প্রায় দুই বছর আগে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। এমনকি আইনের আশ্রয় নিলে প্রাণনাশের হুমকিও দিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রিয়াঙ্কার ভাই অপূর্ব বেপারী সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের পরিবার ইতিমধ্যে অনেক টাকা ও স্বর্ণ দিয়েছে। যৌতুকের চাপে আমার বাবার জীবনটাই শেষ হয়ে গেছে। এখন সাত লাখ টাকা দেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আমরা আইনের আশ্রয় চাই।”
এলাকাবাসী আলমগীর হোসেন জানান, “প্রিয়াঙ্কা অত্যন্ত ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের মেয়ে। লোভী স্বামীর নির্মম আচরণে তার জীবন বিপন্ন। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে সমাজে একটি বার্তা যাবে।”
পরিবারের অভিযোগ, দেবাশীষ বর্তমানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তবে এ বিষয়ে তার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
যৌতুক: এক অমানবিক সামাজিক ব্যাধি
বাংলাদেশে যৌতুক আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইন ও পরবর্তী সংশোধন অনুযায়ী, যৌতুক দাবি, প্রদান বা গ্রহণ—সবই শাস্তিযোগ্য। তবুও সামাজিক কুসংস্কার, লোভ ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে আজও বহু নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
প্রিয়াঙ্কার গল্প কেবল একটি পরিবারের নয়—এটি একটি সমাজের বিবেকের প্রশ্ন। যেখানে একজন পিতা মেয়ের সুখের জন্য জমি বিক্রি করেন, আর শেষ পর্যন্ত সেই মেয়েই নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসে ভাঙা স্বপ্ন নিয়ে—সেখানে কেবল একটি মামলা নয়, প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ।
অসহায় প্রিয়াঙ্কা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা চেয়েছেন। এখন দেখার বিষয়—আইন ও সমাজ কত দ্রুত তার পাশে দাঁড়ায়।
যৌতুকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে এমন নির্মমতার অবসান ঘটাতে—এটাই এখন সময়ের দাবি।