মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৩৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :-
সুজানগরে বিনা ধান -২০ এর প্রদর্শনীর কৃষক মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত ​সন্ধ্যার পর রাস্তায় বিনা কারনে শিক্ষার্থী পেলেই আ-টক- বানারীপাড়ায় এসিল্যান্ডের ক-ড়া বার্তা ও মাইকিং মুমূ-র্ষ রোগীর স্বজনরা র-ক্ত না পেয়ে দিশেহারা, নিজেই র-ক্ত দিলেন চিকিৎসক রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে নি-ষিদ্ধ ১৬০ কেজি চায়না দুয়ারী জাল জব্দ, ২ ব্যবসায়ীকে ১ লাখ ৮ হাজার অ-র্থদণ্ড প্রদান। এইচএসসি, আলিমর নজি-রবিহীন ফল : ব্যর্থ-তার দায় কার? নড়াইলে অনলাইন প্র-তারণা ও জু-য়ার অভিযোগে গ্রে-ফতার ৪ ছেলের শো-ক সইতে না পেরে প্রবাসী বাবার মৃ-ত্যু বসত ঘরের মেঝেতে অলৌকিত ভাবে দুটি কবর ঘিরে তোলপাড় ফরিদপুরে অ-বৈধ ইটভাটা গুঁ-ড়িয়ে দিলেন প্রশাসন ট্রেনে পরিচয় ধর্ষ-ণের পর হ-ত্যা যুবকের ফাঁ-সির রায় 

এইচএসসি, আলিমর নজি-রবিহীন ফল : ব্যর্থ-তার দায় কার?

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১০৮ Time View

লেখকঃ মোঃ হায়দার আলী।। কৃষক সার ঠিকভাবে পাচ্ছেন না । সার সিন্ডকেট, অধিক ধান্দাবাজ সার ডিলারগণ বিভিন্নভাবে সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশী দামে বিক্রির ব্যাপক অভিযোগ রেয়েছে। এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড, জেলে পাঠানো হয়েছে। কৃষক প্রকাশ্যে সার লুট করেছেন, লাখ লাখ বস্তা সার আটক করে কৃষকদের মাঝে সরকারী মূল্যে বিক্রি করারও নজীর রয়েছে। সার সংকট ও বেশী মূল্যের কারণে কৃষক ফসল চাষে আগ্রাহ হারিয়ে ফলেছেন। যার প্রভাব পড়বে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে। এ বিষয়ে লিখার জন্য তথ্য উপাত্ত নিয়ে ল্যাপটপ ওপেন করে বসলাম। এমন সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক পরিচালক, গোদাগাড়ী উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার প্রকৌশলী মোঃ সাইদুর রহমান মোবাইল করে এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয় সম্পর্কে কলাম লিখার জন্য অনুরোধ করলেন। আর পত্রিকা, টিভি, অনলাইন পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, দোকানের আড্ডায় চায়ের কাপে ঝড় উঠেছে এবারের এইচএসসি, আলিম পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফল নিয়ে। লিখার থিম পরিবর্তন করে আল্লাহর নাম নিয়ে এবারের এইচএসসি, আলিম ও সমমানের পরীক্ষায় ফলাফল বিপর্যয় নিয়ে লিখা শুরু করলাম।

এবারের এইচএসসি, আলিম ও সমমানের পরীক্ষায় ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে। এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। নিকট অতীত এমন ফলাফল বিপর্যয় দেখা যায়নি। পাবলিক পরীক্ষার এই ফলাফল বিপর্যয়ের সংখ্যাটি শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি শ্রেণিকক্ষ, পাঠদান, মূল্যায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, শিক্ষাকর্মকর্তা, প্রশাসকগন মনিটারিং এ চরম ব্যর্থতা এবং আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাদর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রকাশিত ফলের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, এ বছর পাসের হার গত বছরের ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ থেকে কমে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে নেমেছে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ৬৯ হাজার ৯৭ থেকে কমে ৪০ হাজার ৮৪ হয়েছে। তবে এই ফলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। বিপরীতে শতভাগ পাস করেছে মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠান। এই দুই বিপরীত চিত্রের মাঝখানেই লুকিয়ে এবার ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিলেন।

তাঁদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন। উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অর্থাৎ অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থীর ব্যর্থতাকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে পাশ কাটিয়ে উদর পিন্ডি বুদর ঘাড়ে চাপিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর মধ্যে আছে শিক্ষার্থীর প্রস্তুতির ঘাটতি, শিক্ষকের সীমাবদ্ধতা, প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, প্রশাসকদের প্রতিষ্ঠান মনিটারিং এ চরম ব্যর্থতা, অভিভাবকদের অসচেতেনতা, শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে শ্রেণী কক্ষে অনুউপস্থিত থেকে কোচিং, প্রাইভেট, আড্ডাবাজিতে ব্যস্ত, পাঠ্যক্রমের অসংগতি এবং মূল্যায়নব্যবস্থার সম্ভাব্য ত্রুটি। প্রতিটি স্তরের দায় নির্ণয় করতে হবে, সমাধানের পথও তৈরি করতে হবে। আমরা শতভাগ পাস চাই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চাই শতভাগ শেখা। পাসের হার কমেছে, কিন্তু শুধু এই একটি সংখ্যা দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার মান বিচার করা যাবে না। প্রশ্ন হলো, এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন উত্তীর্ণ হতে পারলেন না? তারা কি পড়াশোনা করেননি, নাকি তাঁদের শেখানোর ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল? প্রশ্নপত্র কি আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে, নাকি মূল্যায়ন এবার বেশি কঠোর হয়েছে? শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, প্রতিষ্ঠান গুলির সঠিক মনিটারিং, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান এবং পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন সবকিছুই পর্যালোচনার দাবি রাখে। ফল খারাপ হলেই শিক্ষার্থীদের অযোগ্য বলে দাগিয়ে দেওয়া সহজ; কিন্তু সেই ব্যর্থতার পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মনিটারিং, শিক্ষাব্যবস্থার দায় কতটা, সেটি খুঁজে দেখা অনেক বেশি জরুরি।

এবারের ফলের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করেছে। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংরেজিতে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুই বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক ফেলের সংখ্যা যোগ করলে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১। একই শিক্ষার্থী দুই বিষয়েই ফেল করে থাকতে পারেন, তাই সংখ্যাটিকে আলাদা শিক্ষার্থীর সংখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তবে এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, বিষয় দুটিতে বড় ধরনের শিখনঘাটতি রয়েছে।

ইংরেজিতে এত শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা আমাদের দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার দিকে আঙুল তোলে। স্কুলজীবন থেকে ইংরেজি পড়ানো হলেও বহু শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও একটি অনুচ্ছেদ বুঝে পড়তে, নিজের বক্তব্য লিখতে কিংবা ব্যাকরণের মৌলিক প্রয়োগ করতে হিমশিম খান। অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজি শেখা মানে হয়ে দাঁড়ায় পরীক্ষার জন্য কিছু নিয়ম মুখস্থ করা, প্রশ্নের ধরন চিনে উত্তর লেখা। ভাষা শেখার যে চারটি মৌলিক দক্ষতা শোনা, বলা, পড়া ও লেখা তার মধ্যে প্রথম দুটি প্রায়ই শ্রেণিকক্ষের চর্চায় উপেক্ষিত থাকে। ফলে পরীক্ষায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে সামান্য পরিবর্তিত প্রশ্ন এলেই শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন আছে। পাঠ্যসূচিতে প্রযুক্তি থাকলেই শিক্ষার্থী প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন না। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, সফটওয়্যার কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির মৌলিক ধারণা হাতে-কলমে শেখানোর সুযোগ না থাকলে বিষয়টি মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট কিংবা প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। কোথাও আবার ব্যবহারিক ক্লাসের নামে কেবল উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রযুক্তি শিক্ষার মূল্যায়ন কতটা কার্যকর হতে পারে? স্বভাবিকভাবে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের ২/৩ মাস পূর্বেই অর্থাৎ এলাকার কিছু দালারদের ম্যানেজ করে, চটকদার বিজ্ঞপনের মাধ্যমে জেলা শহর কিংবা উপজেলা, পৌরসভা সদরে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা বিভিন্ন কোচিং, প্রাইভেটে সেন্টারেগুলিত বিষয় প্রতি ২০/২৫ হাজার টাকা অগ্রীম নিয় ভর্তি করা হয়। তারা প্রচার করেন স্কুল কলেজে ক্লাসে পড়া লিখা, শিক্ষকগন ভাল না তারা ফাঁকীদেন তোমরা নাম মাত্র একটি কলেজে ভর্তি হয়ে আমাদের এখানে কোচিং প্রাইভেট পড়লেই হয়ে যাবে জিপিএ-৫। শিক্ষাকে বানিজ্য পুন্য হিবেবে ব্যবহার করছেন কোচিং, প্রাইভেট সেন্টার গুলি। তাদের এক ব্যাচে ৮০ থেকে ১৭০ জন শিক্ষার্থী থাকে। যা দেশের অনেক কলেজে নেই। কমলমতি শিক্ষার্থীদের সহজ সরলতাকে কাজে লাগিয়ে চলছে এ সব অবৈধ কারবার। কোচিং, প্রাইভেট সেন্টারগুলি তা হলে এবার কি করলো তারা শিক্ষার্থী লাখ লাখ টাকা নিয়ে এ+ তো দূরের কথা পাস করাতে পারলো না কেন? তাদের কী কোন দায় নেই? সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত কোচিং, প্রাইভেট বন্ধ রাখার সরকারী নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কিন্তু তার কোন বাস্তবায়ন নেই। যারা আইন করলো তারা কেন বাস্তব পদক্ষেপ নেন না।তারা কি মাসিক চুক্তিতে কোচিং প্রাইভেট সেন্টার গুলিতে উৎকোচ নিয়ে থাকেন। তা না হলে প্রশাসকদের নাকে ডগায় এটা হয় কি করে?

এসএসসিতে পাস করার অর্থ এই নয় যে শিক্ষার্থী পরবর্তী স্তরের সব বিষয়ে সমান দক্ষতা অর্জন করেছেন। অনেক সময় স্কুল পর্যায়ে দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও কোনোভাবে উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হন। কলেজে গিয়ে পাঠ্যসূচির পরিধি, বিষয়বস্তুর গভীরতা এবং বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নের মুখোমুখি হলে সেই দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। এখানে শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতার প্রশ্নও আছে। একজন শিক্ষার্থী এসএসসিতে কোন বিষয়ে দুর্বল ছিলেন, কোন দক্ষতা অর্জন করতে পারেননি, কলেজে ভর্তির পর সেই ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা কতটা থাকে? বাস্তবে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত শিখনঘাটতি চিহ্নিত করে আলাদা সহায়তা দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে যে শিক্ষার্থী স্কুলে ইংরেজিতে দুর্বল ছিলেন, কলেজে গিয়েও তাঁকে একই দুর্বলতা নিয়ে এগোতে হয়। উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ্যসূচি তখন তার কাছে নতুন শিক্ষার সুযোগ না হয়ে পুরোনো ঘাটতির ওপর নতুন চাপ হয়ে দাঁড়ায়। এবারের ফলের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২০২। এক বছরে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। বিপরীতে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০২৫ সালের ৩৪৫ থেকে কমে এবার হয়েছে ১৩৯। এই পরিসংখ্যান কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আনে। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস না করার ঘটনা স্বাভাবিক শিক্ষাগত ব্যর্থতা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক কাতারে ফেলে শাস্তি দেওয়াও সমাধান নয়। কোথাও শিক্ষকসংকট, কোথাও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই, কোথাও নিয়মিত ক্লাস হয় না, আবার কোথাও শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার অত্যন্ত কম। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অল্প হওয়ায় কয়েকজনের ব্যর্থতাতেই পাসের হার শূন্য হয়ে যায়। তাই প্রতিটি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা তদন্ত ও পর্যালোচনা প্রয়োজন। কতজন পরীক্ষার্থী ছিল, কোন বিষয়ে কতজন ফেল করেছে, শিক্ষক কতজন, ক্লাস কত দিন হয়েছে, ব্যবহারিক শিক্ষা হয়েছে কি না এসব তথ্য প্রকাশ করতে হবে।যেসব প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে ফল খারাপ হচ্ছে, সেখানে শিক্ষা বোর্ড ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সমন্বিত তদারকি জরুরি।

প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়ে পাঠদান, শিক্ষক উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি মূল্যায়ন করতে হবে। দুর্বল প্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষক পদায়ন, অতিরিক্ত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শকেন্দ্র চালু করা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠান প্রধানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা না দিয়ে শুধু শাস্তি দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। কোনো পরীক্ষায় পাসের হার কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে খাতা দেখার পদ্ধতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে পাসের হার কমেছে বলেই মূল্যায়নে ভুল হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আবার মূল্যায়ন শতভাগ নির্ভুল হয়েছে ধরে নেওয়ারও সুযোগ নেই। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন একটি দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল কাজ। একজন পরীক্ষকের সামান্য অসতর্কতা কিংবা প্রশ্নের উত্তর মূল্যায়নে অসামঞ্জস্য একজন শিক্ষার্থীর ফল বদলে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পরিবর্তন জরুরি। সেটা পরীক্ষকদের মাথায় থাকতে হবে।

প্রতিটি প্রশ্নের জন্য স্পষ্ট নম্বর বণ্টন ও মূল্যায়ন নির্দেশিকা থাকতে হবে। সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নের ক্ষেত্রে কোন উপাদানের জন্য কত নম্বর দেওয়া হবে, তা পরীক্ষকদের কাছে পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট নম্বরসীমার কাছাকাছি থাকা খাতা পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা, নমুনা খাতা একাধিক পরীক্ষকের মাধ্যমে যাচাই এবং পরীক্ষকদের মূল্যায়নের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করার ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের খাতা পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ আরও কার্যকর করা দরকার। সাধারণত পুনর্নিরীক্ষণে নম্বর যোগ, কোনো উত্তর মূল্যায়ন থেকে বাদ পড়েছে কি না, নম্বর যথাযথভাবে নথিভুক্ত হয়েছে কি না এসব বিষয় দেখা হয়। এটি সব ক্ষেত্রে নতুন করে উত্তরপত্র মূল্যায়নের সমান নয়। তাই পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি কোথাও মূল্যায়নগত ভুল পাওয়া গেলে সংশোধনের স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ বছর ১ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক থেকে দুই মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা কমবে। সময় কম ক্ষেপন হবে
মোটা দাগে বলা যায়, প্রতি ১০০ জনে ৪৮ জনই অনুত্তীর্ণ—এবারের এইচএসসির ফল কি কেবল একটি পরীক্ষা বিপর্যয়, নাকি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি?এইচএসসির ফল: বিপর্যয় নাকি এটিই শিক্ষার প্রকৃত মান? এইচএসসি পরীক্ষায় বিপুল ফেল কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়; আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষাকাঠামোর জন্য জরুরি সতর্কবার্তা। এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সম্মিলিত পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এই হার প্রায় ৫ শতাংশ কম। গত ২১ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন পাসের হার। এর আগে ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭.৭৪ শতাংশ। এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার শিক্ষার্থী, যা গত বছরের তুলনায় অন্তত ২৯ হাজার কম। সোজা বাংলায় বললে, এ বছর প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৮ জনই পাস করতে পারেনি।

প্রাথমিকভাবে এই ফলাফলকে বড় ধরনের ‘বিপর্যয়’ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু এটি কি কেবল একটি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়, নাকি এর মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র সামনে চলে এসেছে? বগত সরকারগুলি বিদেশী প্রভুদের খুশি করতে ঢ

পাসের হার নিয়ে আমার অবশ্য কিছুটা দ্বিমত রয়েছে। আমার ব্যক্তিগত হিসাব অনুযায়ী, প্রকৃত পাসের হার আসলে ৩৩.২৮ শতাংশ। শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনার আগে এই হিসাবের পেছনের কয়েকটি বিষয় বোঝা জরুরি।

এ বছর যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, তারা এসএসসি পাস করেছে ২০২৪ সালে। সে বছর এসএসসি উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু তাদের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষাতেই অংশ নেয়নি, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে, যারা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, তাদের ৪৮ শতাংশই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

দুই বছরের ব্যবধানে এসএসসি উত্তীর্ণ একটি বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা এবং অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেকের অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে পাসের হার দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ শতাংশ। এর সঙ্গে প্রথম দিন কেন্দ্রে অনুপস্থিত ২৪ হাজার শিক্ষার্থী যোগ করলে ফেলের হার আরও বাড়বে।

ফলাফলের এই বিপর্যয় কেন? এর কারণ আসলে বহুমুখী। কিন্তু এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, অভিভাবক কিংবা শিক্ষার্থী—যাকেই জিজ্ঞেস করা হোক না কেন, কেউই খুব একটা দায়িত্ব নিতে চাইবেন বলে মনে হয় না। প্রত্যেকেই দায় অন্যের কোর্টে ঠেলে দেবেন। অথচ শিক্ষার্থীদের এই ফলাফলের পেছনে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসন এবং রাষ্ট্র—সবারই কমবেশি দায় রয়েছে।

ফেল করা ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে ফেল করেছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। এর মধ্যে ইংরেজিতে ফেল করেছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। অর্থাৎ এ দুটি বিষয়ই শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে যেটুকু বুঝলাম, কলেজগুলোতে আইসিটি শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়েছে। যারা আইসিটি পড়ান, তাদের অনেকেরই পড়াশোনা এই বিষয়ে নয়। কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে তারা পাঠদান চালিয়ে যান। আর ইংরেজি তো আমাদের কাছে যুগের পর যুগ ধরে এক যমের নাম। বছরের পর বছর ধরে পড়েও শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারছে না, এমনকি পরীক্ষায়ও পাস করতে পারছে না। অথচ এত বছরেও আমরা সমস্যার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে পারলাম না। কোথায় ঘাটতি, কেন শিক্ষার্থীরা এই বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না, তা খুঁজে বের করে কার্যকর কোনো উদ্যোগও নেওয়া হলো না।

আরেকটি সমস্যা হলো, দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি এবং প্রচলিত শিখনপদ্ধতির সমস্যা। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষকদের প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্যের প্রতি ঝোঁক। শ্রেণিকক্ষে যেভাবে পড়ানো হয়, তার সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপদ্ধতির অসামঞ্জস্যও অনুত্তীর্ণের হার বাড়ানোর অন্যতম কারণ। শিক্ষার্থীরা শ্রেণী কক্ষে উপস্থিতি হতে চায় না। কর্মরত শিক্ষকদের প্রায় ৪০ শতাংশের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই। একজন শিক্ষক যত মেধাবীই হন না কেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া কার্যকর ও মানসম্মত পাঠদান সম্ভব নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের একটা বড় অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত। তারাদের অনেকে নেতা পাতি নেতা, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মেয়র, কাউন্সলর, চেয়ারম্যান প্রার্থী। যারা শিক্ষা না গিয়ে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী মাঠে বেশী সময় দিচ্ছেন। এমপি, মন্ত্রী এলাকায় আসলে তো কোন কথাই নেই সেদিন সবকিছু বাদ দিয়ে তাদের সাথে ঘুরে থাকেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠনের প্রধানগণ তেমন ভাবে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহন করতে পারছেন না। ফলে শিক্ষাথীদের পাঠের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, দেশের ২ হাজার ৬২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক নেই। বর্তমানে ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করছেন ৬৪ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষক। তাদের মধ্যে ৫১ হাজার ৩৬০ জনের ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনা করে নামমাত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে আইসিটি পড়ানোটা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তামাশা ছাড়া আর কী?

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী যদি কলেজে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের কাছ থেকে যথাযথ পাঠই না পায়, তাহলে তার কাছে ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করার যৌক্তিকতা কতটুকু? শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার দায় তার নিজের, কিন্তু তাকে শেখানোর দায়িত্ব যাদের, তাদের দায় কি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে?

এবার সোয়া ৯ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠানে। অন্যদিকে নটর ডেম কলেজ, ঢাকা কলেজ কিংবা রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, রাজশাহী ক্যাডেটসহ বিভিন্ন ক্যাডেট কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকই তাদের ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। এখন কেউ কেউ বলবেন, এসব প্রতিষ্ঠানে ভালো শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় বলেই তারা ভালো ফলাফল করে। কিন্তু এই যুক্তি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যান্য কলেজ, বিশেষ করে নামকরা বেসরকারি কলেজগুলোতেও প্রচুর মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। তাদের ফলাফল কেন বিপর্যস্ত হচ্ছে?

এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে, শিক্ষকদের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠনের অর্থ লুটপাটের জন্য শ শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে কথিত সাময়িক বরখাস্ত করে বছরের পর বছর ক্ষমতার অপব্যার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে রাখা হয়েছে। বিগত আওয়ামীলীগ সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শিক্ষকদের বাধ্যকরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন তা এখনও অব্যাহতভাবে চলছে। এতে পাঠদান ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অনেক শিক্ষক নিয়মিত কলেজে আসেন না ক্লাস নেন না। একদিন এসে ২/৩ দিনের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলি প্রতিদিন ৬ ঘন্টা চলার কথা থাকলেও তা মানা হয় না। চলে সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ২ টা, সকাল ৯ টা থেকে ১ টা। কলেজ ও মাদ্রাসা গুলিতে এপ্রবনতা খুবই বেশী।
এটা ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। প্রশাসনিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তর ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষকদের পাঠদানের ধরন, শ্রেণিকক্ষে নিবিড় তদারকি, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফলের পেছনে শুধু তার ব্যক্তিগত মেধা নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও পাঠদানের মানও গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো মুখস্থনির্ভরতা। মুখস্থবিদ্যা থেকে সরে আসার জন্য যে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই মুখস্থবিদ্যাকে নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে বরং একে নতুনভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে। প্রশ্নের ধরন বদলেছে, কিন্তু শেখার ধরন বদলায়নি। শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তরও মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখতে শিখেছে। যা-ই লিখুক, নম্বর দেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তাতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শেখার চেয়ে পরীক্ষায় জিপিএ – ৫ পাওয়া, পাস করাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী কতটা জানে, কতটা বুঝতে পারে কিংবা বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান কতটা কাজে লাগাতে পারে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পরীক্ষার ফলাফল। অথচ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু সনদ অর্জন নয়; একজন মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে শেখানো এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তোলা।

একটা কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায়, শিক্ষার্থীরা পড়েনি, তাই পাস করেনি। কিন্তু তারা কেন পড়েনি, কেন শিখতে পারেনি এবং তাদের শেখানোর দায়িত্ব যাদের ছিল, তারা কতটা দায়িত্ব পালন করেছেন? শ্রেণিকক্ষে যদি নিয়মিত পাঠদান হতো, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হতো এবং দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো সবাই জিপিএ-৫ পেত না, কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করত না।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বাইরে রাজনীতি, কোচিং, প্রাইভেট বানিজ্যসহ অন্য অন্য কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগী হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে গত দুই বছরে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের সংঘবদ্ধ হয়ে মব সৃষ্টি, শিক্ষকদের ওপর হামলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, সহঃ প্রধান, শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করেছেন এবং তাদের অসম্মানিত করার যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো ছিল উদ্বেগজনক। এসব ঘটনা শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং শিক্ষার পরিবেশের অবনতির চিত্র সামনে এনেছে।

এর সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিপুল প্রভাব এবং অভিভাবকদের উদাসীনতাও যুক্ত হয়েছে। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা এখন আর তাদের কথা শুনতে চায় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাসে উপস্থিত থাকে না। কেউ কেউ আসলে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায়। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পার্কে, নদীর ধারে, হোটেলে আড্ডায় বেশী সময় পার করেন। বেশি চাপ প্রয়োগ করলে মবের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে অভিভাবকরাও ছেলেমেয়েদের ওপর ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। তারা কোন খোঁজ খবর রাখেন না। অনেকে ছাত্রজীবনে মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটারে গেইম, আজেবাজে ছবি দেখে বেশী সময় পার করছেন।

এখন সরকার জানিয়েছে, এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অনুত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। আপাতত এটিকে ইতিবাচক উদ্যোগ বলেই মনে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর বেঁচে যাবে। একই সঙ্গে শিক্ষাজীবন থেকে স্থায়ীভাবে ঝরে পড়ার ঝুঁকিও কিছুটা কমবে। তবে এটা যেন মনে রাখা হয় যে, পরীক্ষার সুযোগ দিয়ে পাস করানো আর শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষাগত ঘাটতি পূরণ করা এক বিষয় নয়। কিন্তু অন্য দিকে কিছু মানুষ বলছেন ২ বছর পড়ে প্রস্তুতি নিয়ে যারা ব্যর্থ দেড় মাসে কিভাবে সফল হবেন।

শুধু আরেকবার পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা দুর্বল, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পাঠদান ও সহায়তার ব্যবস্থা করা, শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া জরুরি।

এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর কৌশল প্রণয়ন দরকার। জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষায় এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ফেল করছে, কোন বিষয়ে তাদের দুর্বলতা বেশি, কেন তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না এবং এর পেছনের কারণগুলো কী—তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফল হচ্ছে, সেগুলোর পাঠদানের মান, শিক্ষকসংকট, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি খতিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজন হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো অন্য প্রতিষ্ঠানেও কাজে লাগানো যেতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বের করে আনা দরকার।

শতভাগ পাসের নামে যদি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাই না করা হয়, তাহলে সনদের সংখ্যা বাড়বে, শিক্ষার মান বাড়বে না। আবার কঠোর মূল্যায়নের নামে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে ব্যর্থ হতে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করাও গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীকে শেখানো, তার সক্ষমতা তৈরি করা এবং পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত করা। পরীক্ষা সেই অর্জন যাচাইয়ের একটি মাধ্যম মাত্র। এ জন্য এসএসসি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত পাঠ্যক্রমের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। কলেজে ভর্তির পর শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক দক্ষতা যাচাই করে দুর্বলদের জন্য সেতুবন্ধনমূলক পাঠক্রম চালু করা যেতে পারে। ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে নিয়মিত অনুশীলন, ব্যবহারিক কাজ, দলীয় প্রকল্প ও ধারাবাহিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণকে এককালীন আনুষ্ঠানিকতা না রেখে নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নের অংশ করতে হবে। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ ও পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের আগেভাগে শনাক্ত করতে হবে। এইচএসসির এবারের ফল শুধু হতাশার সংবাদ নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর একটি সতর্কবার্তা।

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক দিনে ধ্বংস হয় না। ধীরে ধীরে শিক্ষকের মান কমে, পাঠদানের পরিবেশ নষ্ট হয়, মূল্যায়নব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, শিক্ষার্থীরা শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। একসময় পরীক্ষার ফলাফল সেই দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনারই প্রতিচ্ছবি হয়ে সামনে আসে। এবারের এইচএসসি ফলাফলকে সেই সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা উচিত।

লেখক : মোঃ হায়দার আলী
প্রধান শিক্ষক, মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়
গোদাগাড়ী, রাজশাহী।
ও
সাধারন সম্পাদক,
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি,
গোদাগাড়ী উপজেলা শাখা,
রাজশাহী।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved.©natunbazar24.com
Developed by: A TO Z IT HOST
Tuhin