রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :-
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন রিয়াজ আহমেদ মৃধা বাবুগঞ্জ-মুলাদী-হিজলা মহাসড়কের সার্ফেসিং কাজের উদ্বোধন করলেন জয়নুল আবেদীন এমপি সুজানগরের পদ্মা নদীতে শেষ হলো আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি নৌকা বাইচ উৎসব সুপারি পাড়া কেন্দ্র করে ছোট ভাইয়ের লাঠির আঘাতে বড় ভাই নিহ-ত পীরগঞ্জে ‘দুর্গাপূজায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করণীয়’ সভায় অনুপস্থিত ৩ কর্মকর্তাকে শো-কোজের নির্দেশ ‎পাইকগাছায় গলায় ফাঁ-স দিয়ে গৃহবধূ আত্মহ-ত্যা মহেশপুরে ৭০ গ্রাম গাঁ-জাসহ ১ মা-দক কা-রবারি গ্রে-প্তার শিক্ষা খাতে এআই এখন সম্ভাবনার দরজা খুলছে, সন্তানের হাতের স্মার্টফোনই হতে পারে নির্ভরযোগ্য শিক্ষক মধুপুরে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম শারদীয় দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় নিশ্চিতে ময়মনসিংহে পুলিশ সুপারের ব্রিফিং

শিক্ষা খাতে এআই এখন সম্ভাবনার দরজা খুলছে, সন্তানের হাতের স্মার্টফোনই হতে পারে নির্ভরযোগ্য শিক্ষক

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪৪ Time View

লেখকঃ মোঃ হায়দার আলীঃ শিক্ষায় এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence) প্রযুক্তি হলো এমন একটি আধুনিক প্রযুক্তি, যা মেশিন লার্নিং ও ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাঠদান ও শিখন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও
ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের এককই বই; কিন্তু শেখার সুযোগ, গতি আর গভীরতায় তাদের মধ্যে দূরত্ব প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ছে। এই দূরত্বের নামই প্রযুক্তিগত ব্যবধান, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে এটি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত চওড়া হচ্ছে।

শিক্ষাবিজ্ঞানের একটি পুরোনো কথা আছে: শিক্ষণ তখনই সার্থক, যখন তা থেকে শিখন ঘটে। এআই এই শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ার দুই প্রান্তকেই বদলে দিচ্ছে, শিক্ষক কীভাবে পড়াবেন এবং শিক্ষার্থী কীভাবে শিখবে। বাংলাদেশের জন্য তাই বড় প্রশ্নটা এআই কতটা শক্তিশালী তা নয়, বরং এর সুফল কার কাছে পৌঁছাচ্ছে আর কে পিছিয়ে পড়ছে। এই লেখায় সেই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

এআই শিক্ষণ-শিখনে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন আনছে, তা হলো ব্যক্তিগতকৃত শিখন। একটি ক্লাসে ৬০ জন শিক্ষার্থীর শেখার গতি এক নয়; কিন্তু একজন শিক্ষকের পক্ষে প্রত্যেককে আলাদা সময় দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এআই টিউটর শিক্ষার্থীর ভুল ধরে তাতক্ষণিক ফিডব্যাক দিতে পারে, তার গতিতে পাঠ এগিয়ে নিতে পারে, আর গভীর রাতে নয়, যে কোনো সময় প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
কম্পিউটার ল্যাব, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক। অর্থাৎ এআই নিজে জাদুর কাঠি নয়, এর সুফল নির্ভর করে চারপাশের ব্যবস্থার ওপর।

বাংলাদেশে শহরের প্রতি চারজনের তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, গ্রামে করেন অর্ধেকেরও কম মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এপ্রিল ২০২৬-এ প্রকাশিত আইসিটি জরিপ অনুযায়ী, শহরে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ গ্রামে মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ব্যবধান প্রায় ৩২ শতাংশ পয়েন্ট।

সবচেয়ে বড় যে ব্যবধান বা ফারাক তা হচ্ছে কম্পিউটার। শহরের পরিবারে কম্পিউটার থাকার সম্ভাবনা গ্রামের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ। অথচ এআই দিয়ে লেখা, গবেষণা, প্রোগ্রামিং বা গভীর অনুশীলনের মতো কাজ মোবাইলের ছোট পর্দায় করা কঠিন নয়।
জেলাভিত্তিক চিত্র আরও পরিষ্কার। ইন্টারনেট ব্যবহারে সবার ওপরে ঢাকা সাতাত্তর দশমিক ১ শতাংশ, আর সবার নিচে শেরপুর পঁচিশ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ একই দেশে এক জেলার শিক্ষার্থীর অনলাইনে থাকার সুযোগ অন্য জেলার প্রায় তিনগুণ।

দ্যা ডেইলি স্টার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ, এপ্রিল-জুন ২০২৬ প্রান্তিকে দেশে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ঊনষাট দশমিক ২ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন, এক বছর আগে যা ছিল পঞ্চান্ন শতাংশ কিন্তু কম্পিউটার ব্যবহার আটকে আছে ১১ দশমিক ৮ শতাংশে, আর মোবাইল ব্যবহার করেন ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও নিজের ফোন আছে ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশের। গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী তাই বাবা-মায়ের ফোনে ভাগাভাগি করে পড়ে, যা নিয়মিত এআই-সহায়তায় শেখার পথে বড় বাধা।

সমস্যা শুধু যন্ত্র নয়, দক্ষতারও। বিবিএসের জরিপে মাত্র ১৫ শতাংশ ব্যবহারকারী ফাইল স্থানান্তরের মতো তুলনামূলক উন্নত কাজ পারেন, যেখানে কপি-পেস্ট পারেন ৮৪ শতাংশ। ইন্টারনেট না ব্যবহারের কারণ হিসেবে ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ উচ্চ খরচের কথা বলেছেন, যার চাপ বেশি গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে।

কাগজে-কলমে বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম আছে। ব্যানবেইসের ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে এই সুবিধা রয়েছে, তবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে হারটা ৮৪ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও নিম্ন মাধ্যমিকে মাত্র ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ; কিন্তু যন্ত্র থাকা আর তা দিয়ে শিখন ঘটানো এক কথা নয়।

শিক্ষকের প্রস্তুতিতেও ঘাটতি স্পষ্ট। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমওয়ালা স্কুলে অন্তত একজন শিক্ষককে বারো দিনের আইসিটি প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে, যার মূল জোর পাওয়ারপয়েন্টে কনটেন্ট তৈরি। গবেষকদের মতে, এই প্রশিক্ষণে প্রযুক্তি দিয়ে কীভাবে পড়াতে হয়, সেই শিক্ষাবিজ্ঞানের দিকটি অনেকটাই উপেক্ষিত। গ্রামীণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রশিক্ষণ পেলেও শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল টুল ব্যবহারে খুব সামান্যই এগোচ্ছেন।

এর সঙ্গে আছে তীব্র শিক্ষক সংকট। শিক্ষামন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, প্রায় ২৬ হাজার এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে ৬০ হাজার ২৯৫টি শিক্ষকের পদ ফাঁকা। মাধ্যমিকের মাত্র ৫৫ শতাংশ শিক্ষক ইউনেসকোর মানদণ্ডে যোগ্য, আর গণিত শিক্ষকদের ৫৭ শতাংশ কলেজ পর্যায়ে গণিত পড়েননি অনেক ক্লাসে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী, আর দূরবর্তী বিদ্যালয়ের জন্য নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও জটিল।

টিভি, রেডিও ও অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগ থাকলেও বিবিএস ও ইউনিসেফের জরিপ বলছে, দূরশিক্ষণে অংশ নিয়েছিল প্রতি পাঁচজনে একজনেরও কম, মাত্র ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু।

এখানেও গ্রাম-শহরের ফারাক ছিল স্পষ্ট। শহরের ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু দূরশিক্ষণে যুক্ত হতে পেরেছিল, গ্রামে পেরেছিল মাত্র পনের দশমিক ৯ শতাংশ। অঞ্চলভেদে বৈষম্য ছিল আরও তীব্র: খুলনায় ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ ও ঢাকায় ২৩ দশমিক ১ শতাংশ, অথচ ময়মনসিংহে মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রাথমিকের ছোট শিশুরা পিছিয়ে ছিল সবচেয়ে বেশি, তাদের অংশগ্রহণ ছিল ১৩ দশমিক ১ শতাংশ।

নীতির পর্যায়ে এআই নিয়ে তৎপরতা বাড়ছে; কিন্তু চূড়ান্ত কাঠামো এখনো আসেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাতীয় এআই নীতিমালা (২০২৬-২০৩০)-এর খসড়া প্রকাশ করে জনমত চেয়েছিল খসড়ায় শিক্ষাক্রমে এআই, ডেটা সায়েন্স ও ডিজিটাল নৈতিকতা যুক্ত করার কথা যেমন আছে, তেমনি এআই-এর ওপর অতিনির্ভরতা সীমিত রেখে শিক্ষার্থীর যুক্তি, লেখা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা রক্ষার কথাও বলা হয়েছে)।

নির্বাচিত সরকারের আইসিটি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জুলাই ২০২৬-এ জানিয়েছেন, নীতি প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি এআইভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিকেন্দ্রীভূত এআই সেন্টার অব এক্সেলেন্স গড়ার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। অন্তত কাগজে-কলমে তাই রাজধানীর বাইরে এআই ছড়িয়ে দেওয়ার ভাবনা আছে।

বাজেটেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত আছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জিডিপির ২ শতাংশ। আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এটি ছিল ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ, আর পাঁচ বছরে ৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেটে এডু-আইডি, ডিজিটাল লাইব্রেরি, এআই, রোবটিক্স, কোডিং ও ডিজিটাল সাক্ষরতার সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করার কথা এসেছে, এসেছে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষক উন্নয়নের কথাও।

যেখানে দেশে গণিতের যোগ্য শিক্ষক নেই, ইংরেজির শিক্ষক বিষয়টি পড়েননি, আর এক ক্লাসে ৬০/৮০ জন শিক্ষার্থী, সেখানেই একজন ধৈর্যশীল এআই টিউটরের মূল্য সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ যে তুলনামূলক সুবিধা এআই দিতে পারে, তা শহরের চেয়ে গ্রামেই বেশি কাজের।

শিক্ষকের কাজেও এআই সরাসরি সাহায্য করতে পারে। ভারতের রাজস্থানে এআই-চালিত মূল্যায়ন টুল দিয়ে ৪৫ লাখ শিক্ষার্থীর কাগজের ওয়ার্কশিট মূল্যায়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর হাতে যন্ত্র না থাকলেও শিক্ষকের একটি ফোন দিয়ে খাতা দেখা, দুর্বল শিক্ষার্থী চিহ্নিত করা ও আলাদা অনুশীলনী তৈরি করা সম্ভব। প্রতি ক্লাসে সাতান্ন জন শিক্ষার্থী সামলানো গ্রামের শিক্ষকের জন্য এটি বড় স্বস্তি।
এআই-এর প্রথম ব্যবহার হওয়া উচিত মৌলিক সাক্ষরতা ও গণিতের ঘাটতি পূরণে, প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তার নিজের স্তর থেকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে। এআই পদ্ধতিতে শিক্ষাকে সহজ থেকে সহজতর করে চমক সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশের রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মহিশালবাড়ী মহল্লার মোঃ আব্দুল হান্নানের বড় ছেলে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কম্পিউটার বিজ্ঞানী ড. মো. শাহজামাল সাজু । সুদূর অষ্টোলিয়ার মাটিতে বসে দেশের ছেলে মেয়েদের কথা চিন্তা করে সফল হতে যাচ্ছেন। বেশ সাড়া জাগিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের পড়াশোনার চিত্র, কমতে পারে শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য
নিজের সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন না—এমন অভিভাবক খুঁজে পাওয়া কঠিন। কেউ ভালো শিক্ষকের অভাবে চিন্তিত, কেউ ব্যয়বহুল প্রাইভেট ও কোচিংয়ের খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আবার অনেক অভিভাবকের অভিযোগ, সন্তান পড়তে বসতে চায় না, পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। অথচ সেই সন্তানের হাতেই রয়েছে একটি স্মার্টফোন। যে ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেম খেলা, ভিডিও দেখা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট করে কাটছে, সেই ফোনই যদি হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত শিক্ষক, পড়ার সঙ্গী এবং শেখার আনন্দময় মাধ্যম? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই সম্ভাবনাই তৈরি করছে। বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় এমন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে কাজ করছে Saj Academy নামের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
মুখস্থ নয়, আনন্দ নিয়ে শেখার সুযোগ
প্রযুক্তির ব্যবহার এখন আর কেবল অফিসের কাজ সহজ করা কিংবা বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ, দক্ষ শিক্ষকের প্রাপ্যতা এবং পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য—সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান নয়, সেখানে এআই হতে পারে নতুন সম্ভাবনার নাম।
একজন শিক্ষার্থী গণিতের কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে তাকে হয়তো বারবার শিক্ষকের কাছে যেতে হয়। কোনো কোনো শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করে। আবার কেউ দ্রুত বুঝতে পারলেও প্রচলিত পাঠদানের গতির কারণে নিজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এআইভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এখানে শিক্ষার্থী নিজের সুবিধামতো সময়ে প্রশ্ন করতে পারে, একই বিষয় বারবার বুঝে নিতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহজ উদাহরণ, ব্যাখ্যা কিংবা অনুশীলনের সাহায্য নিতে পারে। অর্থাৎ, সবার জন্য একই পদ্ধতিতে পড়ানোর পরিবর্তে শিক্ষার্থীর বোঝার ধরন অনুযায়ী শেখানোর সুযোগ তৈরি হয়।
শিক্ষার এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক পদ্ধতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সব শিক্ষার্থী একইভাবে শেখে না। কেউ উদাহরণ দিয়ে বুঝতে পারে, কেউ ছবি বা চিত্রের সাহায্যে, আবার কেউ বাস্তব জীবনের ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি সহজে আয়ত্ত করতে পারে। সঠিকভাবে তৈরি এআই টিউটর শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাখ্যার ধরন বদলাতে পারে।
ফোন কেড়ে নেওয়া নয়, ফোনের ব্যবহার বদলে দেওয়া
বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের স্মার্টফোন থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। কিন্তু ফোন ব্যবহারের সময়টিকে কীভাবে আরও অর্থবহ করা যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার চেয়ে গেম খেলতেই বেশি পছন্দ করে। প্রচলিত পদ্ধতিতে তাকে পড়ার টেবিলে বসানোই হয়তো অভিভাবকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু পড়ার বিষয়গুলো যদি কুইজ, চ্যালেঞ্জ, পয়েন্ট অর্জন কিংবা ছোট ছোট লক্ষ্য পূরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে শেখার অভিজ্ঞতা আরও আকর্ষণীয় হতে পারে।
আবার বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের অভ্যাসকে কাজে লাগিয়ে যদি দলগত অনুশীলন, প্রশ্নোত্তর কিংবা পড়াশোনাকেন্দ্রিক কমিউনিটি গড়ে তোলা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীরা একে অপরের কাছ থেকেও শিখতে পারবে। পড়াশোনা তখন কেবল একা বসে বই মুখস্থ করার বিষয় থাকবে না; বরং হয়ে উঠতে পারে অংশগ্রহণমূলক ও আনন্দদায়ক একটি অভিজ্ঞতা।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—প্রযুক্তি নিজে থেকেই শিক্ষার্থীর মনোযোগ বাড়িয়ে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এআইভিত্তিক অ্যাপের কার্যকারিতা নির্ভর করবে তার নকশা, শিক্ষাসামগ্রীর মান, শিক্ষার্থীর ব্যবহার এবং অভিভাবক-শিক্ষকের সহযোগিতার ওপর। সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে স্মার্টফোন বিনোদনের পাশাপাশি শেখারও কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
অভিভাবকের দুশ্চিন্তা কমাতে পারে এআই
সন্তান আসলে কতটা পড়ছে, কোন বিষয়ে ভালো করছে, কোথায় পিছিয়ে আছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে অভিভাবকদের অনেক সময় নিয়মিত খোঁজ নিতে হয়। কিন্তু প্রতিদিন সন্তানের পড়াশোনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।
এআইভিত্তিক শিক্ষাপ্ল্যাটফর্মে শিক্ষার্থীর অনুশীলন, সম্পন্ন করা পাঠ এবং পারফরম্যান্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে অগ্রগতির প্রতিবেদন তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের প্রতিবেদন নিয়মিত ই-মেইল বা বার্তার মাধ্যমে অভিভাবকের কাছে পৌঁছালে তাঁরা সন্তানের পড়াশোনার অবস্থা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন।
কোন বিষয়ে অতিরিক্ত অনুশীলন প্রয়োজন, কোথায় উন্নতি হচ্ছে, কিংবা কোন অধ্যায়ে শিক্ষার্থী বারবার ভুল করছে—এসব তথ্য পরবর্তী পড়াশোনার পরিকল্পনা করতে সাহায্য করতে পারে।
এতে অভিভাবকের ভূমিকা কমে যায় না; বরং সন্তানের শেখার প্রক্রিয়ায় তাঁরা আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।
Saj Academy: সহজ, সাশ্রয়ী ও আনন্দময় শিক্ষার উদ্যোগ

এমন সম্ভাবনাকে সামনে রেখে গত এক বছর ধরে Saj Academy নামের একটি ডিজিটাল শিক্ষাপ্ল্যাটফর্ম তৈরিতে কাজ করছেন একদল কম্পিউটার প্রকৌশলী। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কম্পিউটার বিজ্ঞানী ড. মো. শাহজামাল।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পড়াশোনাকে সহজ করা, শিক্ষার ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি করা এবং শেখার অভিজ্ঞতাকে আরও আনন্দময় করে তোলা।
বিশেষ করে যেসব পরিবারের সন্তানদের জন্য নিয়মিত প্রাইভেট টিউটর বা কোচিংয়ের ব্যয় বহন করা কঠিন, তাদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাসহায়তা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী নিজের সুবিধামতো সময়ে পড়তে পারবে, না-বোঝা বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুশীলনের সুযোগ পেতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, যেখানে অভিজ্ঞ শিক্ষক কিংবা মানসম্মত কোচিংয়ের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। তবে এর সুফল পেতে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, উপযুক্ত ডিভাইস, মানসম্মত বাংলা শিক্ষাসামগ্রী এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
ভর্তি প্রস্তুতি থেকে শ্রেণিকক্ষ—একাধিক সেবার পরিকল্পনা
Saj Academy ইতোমধ্যে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য AdmitPrep নামের একটি সেবা চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগ্রহী শিক্ষার্থীরা এখানে বিনা মূল্যে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া, ভর্তি-সংক্রান্ত গাইডবুক পাওয়া এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক পড়াশোনার সুযোগ গ্রহণ করতে পারবেন।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনায় রয়েছে আরও দুটি সেবা। এর একটি TeacherDesk, যার লক্ষ্য শিক্ষকদের দৈনন্দিন কাজ সহজ করা। পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষাসামগ্রী তৈরি কিংবা মূল্যায়নের মতো কাজে এআইয়ের সহায়তা শিক্ষকদের সময় বাঁচাতে পারে। ফলে তাঁরা শিক্ষার্থীদের শেখানো এবং ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
অন্য সেবা StudyPrep। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এআইভিত্তিক এই সেবার মাধ্যমে পাঠ্যবিষয় শেখা, প্রশ্নের উত্তর জানা এবং টিউটরের মতো সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে। এর উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষার্থীরা যেন প্রয়োজনের সময় পড়াশোনার সাহায্য পায় এবং প্রতিটি প্রশ্নের জন্য আলাদা বই বা ব্যক্তিগত শিক্ষকের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে না হয়।
তবে এসব সেবার কার্যকারিতা, শিক্ষাসামগ্রীর মান এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল মূল্যায়নে ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শিক্ষার্থীর ধরন বুঝে শেখাবে এআই
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, একই শ্রেণিকক্ষে ভিন্ন সক্ষমতা ও শেখার ধরনসম্পন্ন অনেক শিক্ষার্থীকে একই গতিতে পড়ানো হয়। ফলে কেউ পাঠ বুঝতে না পেরে পিছিয়ে পড়ে, আবার কেউ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগোনোর সুযোগ পায় না।
এআইভিত্তিক শিক্ষার অন্যতম সম্ভাবনা হলো, শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাখ্যা ও অনুশীলন সাজানো। একজন শিক্ষার্থী কোনো গাণিতিক সমস্যার সমাধান বুঝতে না পারলে এআই ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা দিতে পারে। অন্য একজন একই সমস্যার সমাধান উদাহরণ, চিত্র বা সহজ ভাষায় বুঝতে চাইতে পারে।
এভাবে শেখার পদ্ধতি ব্যক্তিভেদে বদলানোর সুযোগ তৈরি হয়। শিক্ষার্থী ভুল করলে শুধু সঠিক উত্তর দেখানোর পরিবর্তে কোথায় ভুল হয়েছে, কেন হয়েছে এবং কীভাবে সঠিক পথে এগোনো যায়, তা বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও তৈরি করা সম্ভব।
তবে এআইয়ের দেওয়া প্রতিটি উত্তর নির্ভুল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যবিষয়, পরীক্ষার তথ্য ও জটিল প্রশ্নের ক্ষেত্রে উত্তর যাচাই করার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে শিক্ষকের সহায়তা থাকা প্রয়োজন।

শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য কমানোর সম্ভাবনা
বাংলাদেশে শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য শুধু শহর ও গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই শহরেও আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থী এবং সীমিত আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগে বড় পার্থক্য থাকতে পারে। কেউ একাধিক গৃহশিক্ষক ও কোচিংয়ের সুবিধা পায়, কেউ আবার স্কুলের পড়াশোনার বাইরে অতিরিক্ত সহায়তা পাওয়ার সুযোগই পায় না।
এআইভিত্তিক শিক্ষাপ্ল্যাটফর্মের বড় সম্ভাবনা হলো, তুলনামূলক কম খরচে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে শেখার সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। তবে প্রযুক্তি সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে না পারলে নতুন ধরনের বৈষম্যও তৈরি হতে পারে। তাই সাশ্রয়ী সেবা, সহজ ব্যবহার, বাংলা ভাষায় মানসম্মত কনটেন্ট এবং ডিজিটাল সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
শিক্ষাব্যবস্থায় এআইয়ের সার্থকতা কেবল নতুন অ্যাপ তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে, কতজন শিক্ষার্থী বাস্তবে ভালোভাবে শিখতে পারছে, কতটা কম খরচে মানসম্মত সহায়তা পাচ্ছে এবং শেখার প্রতি তাদের আগ্রহ কতটা বাড়ছে—তার ওপর।
শিক্ষককে সরিয়ে নয়, শিক্ষকের কাজকে আরও কার্যকর করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষকের বিকল্প হয়ে উঠবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা হতে পারে শিক্ষককে সহায়তা করা। এআই দ্রুত তথ্য দিতে পারে, অনুশীলন তৈরি করতে পারে কিংবা কোনো বিষয় বারবার বুঝিয়ে বলতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষকের মানবিক সংযোগ, শিক্ষার্থীর আবেগ বোঝার ক্ষমতা, অনুপ্রেরণা দেওয়া এবং নৈতিক বিকাশে ভূমিকার বিকল্প হিসেবে একে দেখা ঠিক হবে না।
বরং শিক্ষক, অভিভাবক ও এআই—এই তিনের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীর জন্য আরও কার্যকর শেখার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
Saj Academy-এর মতো উদ্যোগ সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এখন দেখার বিষয়, এসব প্রযুক্তি কতটা সহজলভ্য হয়, শিক্ষার্থীরা কতটা উপকৃত হয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে তাদের সেবার মান ও কার্যকারিতা প্রমাণ করতে পারে।
একসময় সন্তানের হাতে স্মার্টফোন দেখলেই অভিভাবকের মনে প্রশ্ন জাগত—সে কি পড়ছে, নাকি সময় নষ্ট করছে? ভবিষ্যতে সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো নির্ভর করবে ফোনে কী আছে, তার ওপর। প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে সন্তানের হাতের সেই স্মার্টফোনই হয়ে উঠতে পারে শেখার সঙ্গী—যেখানে প্রশ্ন করতে ভয় নেই, না বুঝলে আবার শেখার সুযোগ আছে, আর পড়াশোনা কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়, সত্যিকার অর্থে বোঝার আনন্দও হয়ে উঠতে পারে। গড়ে উঠবে আপনার সন্তানের সোনালী ভবিষ্যৎ।

পরিশেষ বলা যায়,
২৭ শতাংশ শিক্ষক এ পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, শিক্ষা খাতে এআই এখন সম্ভাবনার দরজা খুলছে, প্রয়োজন দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারণ, যাতে ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থা হয় ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর হলেও মানবিক।

লেখক : মোঃ হায়দার আলী।।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved.©natunbazar24.com
Developed by: A TO Z IT HOST
Tuhin