
তরিকুল ইসলাম তরুণ | কুমিল্লা
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে কুমিল্লার রাজনীতি বহু নেতৃত্ব, আন্দোলন ও পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যে দলের যাত্রা শুরু, সেই দলের কুমিল্লা অধ্যায় গড়ে উঠেছে প্রবীণ নেতাদের দূরদর্শিতা, তৃণমূলের ত্যাগ এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে।
এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় কর্নেল (অব.) আকবর হোসেনের সাংগঠনিক ভিত্তি, বেগম রাবেয়া চৌধুরীর প্রভাবশালী নেতৃত্ব, আমিন-উর রশিদ ইয়াছিনের সংগঠনকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং মনিরুল হক সাক্কুর নগর জনপ্রিয়তা—প্রতিটি অধ্যায় কুমিল্লা বিএনপির ইতিহাসে স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে।
আকবর হোসেন: কুমিল্লা বিএনপির ভিত্তি নির্মাতা
বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন ছিলেন কুমিল্লা বিএনপির অন্যতম স্থপতি। সামরিক জীবন শেষে তিনি রাজনীতিতে এসে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেন এবং জাতীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়েই কুমিল্লা বিএনপি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
প্রবীণ নেতাকর্মীদের মতে, আকবর হোসেনের নেতৃত্বে দলীয় ঐক্য ছিল কুমিল্লা বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি।
রাবেয়া চৌধুরী: দৃঢ় নারী নেতৃত্বের উত্থান
কুমিল্লার রাজনীতিতে বেগম রাবেয়া চৌধুরী ছিলেন প্রভাবশালী নারী নেতৃত্বের প্রতীক। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ সক্রিয়তার মাধ্যমে তিনি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলেন এবং কুমিল্লা বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
নতুন যুগের সূচনা: ইয়াছিন ও সাক্কু
আকবর হোসেনের মৃত্যুর পর কুমিল্লা বিএনপিতে নেতৃত্বের নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। সাংগঠনিক রাজনীতিতে সামনে আসেন আমিন-উর রশিদ ইয়াছিন, আর নগর রাজনীতিতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসেন মনিরুল হক সাক্কু।
ইয়াছিন দলীয় সংগঠনকে শক্তিশালী করার রাজনীতিতে পরিচিত হলেও সাক্কু জনপ্রতিনিধি হিসেবে নগরবাসীর আস্থার ভিত্তিতে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেন।
সাক্কুর রাজনৈতিক উত্থান
যুবদলের নেতৃত্ব থেকে শুরু করে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরে পৌর চেয়ারম্যান—ধাপে ধাপে এগিয়ে ২০১২ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হন মনিরুল হক সাক্কু। ২০১৭ সালে দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি কুমিল্লার নগর রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
তবে ২০২২ সালের সিটি নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় তাঁর বহিষ্কার কুমিল্লার রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে আছে।
নেতৃত্ব বদলেছে, ইতিহাস রয়ে গেছে
কুমিল্লা বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস আসলে নেতৃত্বের ধারাবাহিক পরিবর্তনের ইতিহাস। আকবর থেকে রাবেয়া, রাবেয়া থেকে ইয়াছিন, আর নগর রাজনীতিতে সাক্কুর উত্থান—প্রতিটি সময়ই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে।
তৃণমূলের ত্যাগই সবচেয়ে বড় শক্তি
ইতিহাসের পাতায় বড় নেতাদের নাম লেখা থাকে, কিন্তু ইতিহাসের ভিত গড়ে দেন সেই কর্মীরা, যারা পোস্টার লাগিয়েছেন, রাজপথে আন্দোলন করেছেন, মামলা-হামলা সহ্য করেছেন এবং নিঃস্বার্থভাবে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন।
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই শ্রদ্ধা শুধু নেতৃত্বের প্রতি নয়, কুমিল্লার সেই অগণিত নীরব তৃণমূল নেতাকর্মীর প্রতিও—যাঁদের ত্যাগেই গড়ে উঠেছে কুমিল্লা বিএনপির গৌরবময় রাজনৈতিক ইতিহাস।