
আজিজুল ইসলামঃ যশোরের শার্শা উপজেলায় পারিবারিক কলহ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশৃঙ্খলার এক করুণ পরিণতি দেখা গেছে। নিজের দুই অবোধ শিশুসন্তানকে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যার পর বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট সেবন করে আত্মহত্যা করেছেন কামাল হোসেন (৪৫) নামে এক ব্যক্তি। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে উপজেলার চটকাপোতা দক্ষিণপাড়া গ্রামে নিজ বসতবাড়ি থেকে একই পরিবারের এই তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত শিশুরা হলো—সাবির হোসেন (৫) এবং তার ছোট ভাই জাবির হোসেন (আড়াই বছর)। নিহত কামাল হোসেন ওই গ্রামের মৃত নেদন আলীর ছেলে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও অনুসন্ধানী তথ্য
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, কামাল হোসেনের পারিবারিক জীবন ছিল অত্যন্ত জটিল ও অশান্তিপূর্ণ। তিনি একাধিক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁর মোট সাতজন সন্তান রয়েছে।
পারিবারিক বিচ্ছেদ ও অস্থিরতা: কামাল হোসেনের আগের দুই স্ত্রীর সঙ্গেই ইতিপূর্বে বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে তিনি তৃতীয় বিয়ে করেন। তবে দীর্ঘদিন ধরেই ওই স্ত্রীর সাথেও কামাল হোসেনের তীব্র পারিবারিক কলহ চলছিল।
স্ত্রীর গৃহত্যাগ: প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে পারিবারিক বিরোধ চরমে উঠলে কামাল হোসেনের বর্তমান স্ত্রী দুই শিশু সাবির ও জাবিরকে রেখে নড়াইলে নিজ বাবার বাড়িতে চলে যান।
মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও একা হয়ে পড়া: স্ত্রী চলে যাওয়ার পর থেকে দুই ছোট শিশুকে নিয়ে কামাল হোসেন একাই বাড়িতে ছিলেন। একাধিক বৈবাহিক জটিলতা, দায়িত্বের বোঝা এবং নতুন করে দাম্পত্য কলহের কারণে তিনি চরম মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মৃত্যুর ধরণ ও পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ
মঙ্গলবার দুপুরে প্রতিবেশীরা বাড়িতে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে কামাল হোসেনের বসতবাড়িতে গিয়ে তারা তিনজনের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
প্রাথমিক আলামত পর্যালোচনায় জানা গেছে, কামাল হোসেন প্রথমে তাঁর দুই শিশুসন্তান সাবির ও জাবিরকে গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। সন্তানদের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর তিনি নিজে বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট সেবন করে আত্মহত্যা করেন।
আইনশৃঙখলা বাহিনীর বক্তব্য
ঘটনার পরপরই শার্শা থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে এবং প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে।
শার্শা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শামিনুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান:
”আমরা প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছি যে কামাল হোসেন বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে দুই শিশুর মৃত্যু কীভাবে ঘটানো হয়েছে—তা শতভাগ নিশ্চিত হতে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করতে হবে। পুলিশ পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। পারিবারিক কলহ ছাড়াও এর পেছনে অন্য কোনো প্রভাব রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।