
মোঃ হায়দার আলী (রাজশাহী): ভারতের উজান থেকে ধেয়ে আসছে বন্যা, রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে মরা পদ্মায় যেন যেন যৌবন ফিরে পেয়েছে। পদ্মার বিস্তীর্ন এলাকাগুলি হঠান ডুবে গেছে। ভারত ফারাক্কার সবগুলি গেট খুলে দেয়ায় এমন অবস্থা হয়েছে বলে সচেতনমহল মনে করছেন। যে কোন সময় বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ার আশাংকা করছেন অনেকে। ভারত থেকে থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে প্রতিদিন পদ্মা যেন ফুলেফেপে উঠছে। পদ্মার নদীর রেলওয়ে বাজার ঘটের সামনে অর্ধশত দোকান পানি বৃদ্ধির কারণে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এখানে বিশাল বিশাল খেলার ৫ টি খেলার মাঠ ছিল যেখানে বিকাল শিশু কিশোরগণ ফুটবল, ক্রিকেট, হাডুডু খেলতো সেগুলিও পানিতে তলিয়ে গেছে।
মাদারপুর, হাটপাড়া, থানার মোড, সুলতানগঞ্জ, মাটিকাটা, হাজিরমোড, বিদিরপুর, প্রেমতলী এলাকার পদ্মা এলাকায় জেগে উঠা চরে নারী পুরুষ, ছাত্র-ছাত্রী, কিশোর-কিশোরী, বালক- বালিকাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষদের মিলনমেলায় পরিনত হতো। বিদ্যুৎবিহীন প্রচন্ড গরম থেকে রেহায় পাবার ছুটি যাচ্ছে পদ্মার হিমেল বাতাসের পরশ নিতে। সেগুলি হঠাৎ করে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
পদ্মার চরই ছিল মানুষের বিনোদনের নতুন ঠিকানা। পদ্মার পাড়জুড়ে খুব সকাল, বিকেল থেকে সন্ধ্যা, গভীর রাত পর্যন্ত ছিল থাকে উউৎসবমুখর পরিবেশ। চর পেরিয়ে নদীতে গিয়ে তারা নৌকায় চড়ে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়ান, নদীর বাতাসে প্রাণ জুড়ান, আর পরিবারের সঙ্গে উপভোগ করছেন অনেকে। ফুটবল বিশ্বকাপের জোয়ার গেলেছে পদ্ম পরের জেগে উঠা চরে। শিশু, কিশোর, শিক্ষাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এ জেগে ওঠা চরে স্পেন, ব্রাজিল, আর্জেন্টািনা, মরক্কসহ বিভিন্ন দলের গেঞ্জি পড়ে দু,দলে বিভাক্ত হয়ে নেমে পড়ছেন। সেখানে দর্শকের কমতি নেই। বেশ আনন্দ উপভোগ করছেন। যে ভাবে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নিমিষে সব শেষ।
য দিন আগে যেদিকেই চোখ যায় নদীর বুকে জেগে উঠা চরে শুধু বালি আর বালি, রোদ্রের আলোতে চিক চিক করছে। এ যেন নদীর বুকে মিনি কক্সবাজার। সে মিনি কক্সবাজার যেন এখন পানির নীচে।
যদিও বিপদ সীমার অনেক নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফারাক্কার গেট পেরিয়ে হু হু করে পানি আসছে শুরু করেছে । গত বছর ভয়াবহ বন্যায় বিপুল পরিমান ফসলী জমি নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে, ছাড় পায়নি স্কুল, মসজিদ, ব্রিজ, রাস্তা, গবাদিপশু, জমির ফসল। ওই সময় পদ্মার ভাঙ্গন ঠেকাতে জরুরীভাবে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল কিন্তু খুব একটা লাভ হয় নি। পদ্মা আঘাত হেনেছিল রাজশাহীর গোদাগাড়ি, চাঁপাই নবাবগঞ্জ এলাকার কয়েকটি ইউনিয়নে। পদ্মা নদীর ওপারে চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে নদীর ঘাটের আশেপাশে দোকানগুলি দ্রুত সরিয়ে নিচ্ছিন মালিকগন।
উজানে (ভারত) বর্ষন হওয়ায় সেই পানি গঙ্গা হয়ে পদ্মায় নামছে। ওপারের পানির চাপ কমাতে উদার হস্তে খুলে দিয়েছিল ফারাক্কার গেট। এবারও তার ব্যতিক্রম করেনি ভারতে নরেদ্র মদির সরকার। নাব্যতা হারানো পদ্মায় এক সাথে ছুটে আসা পানিতে এমনিতে ফুসে উঠছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানাযায়, প্রতিদিন গড়ে ৫০/২৬ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। পদ্মা মহানন্দা নদীতে বন্যার পানি বাড়ার সাথে সাথে নদী ভাঙ্গন ব্যাপকহারে শুরু হয়।
গতবছর গোদাগাড়ীতে পদ্মা নদীর ভঙ্গনে চরাঞ্চলে ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকায় মাত্র দুই সপ্তাহে সমসজিদ, ব্রিজ, রাস্তা, ফসলী জমিসহ ৫০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছিল। বন্যা ও নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকার মানুষ নৌকায় করে ১ টিতে গরু-ছাগল, অন্যটিতে বস্তায় বস্তায় ধান আবার কোনোটিতে চর থেকে ভেঙে নিয়ে আসা বাড়ির চাল, টিনের ছাউনি, ধান, গম, ভুট্টা, চাউল,, বাড়ী ঘর নির্মানের পুরাতন সামগ্রী, ঢেউটিন, দরজা জানালা প্রভূতি নিয়ে ছিল। ওপারে বন্যা ও নদী ভাঙ্গনের ভয়াবহতা এত বেশী ছিল যা প্রকাশ করা যায় না। এ দুর্ভোগের বিষয় নদীর ধারে এসে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ দেখেছেন।
গোদাগাড়ী উপজেলার আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের মেম্বার জোহরুর ইসলাম জানান, পদ্মা নদীতে প্রতিদিন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে পানি। প্রতিবছরই বন্যার সাথে সাথে পদ্মায় ভাঙ্গন দেখা দেয়। গত বছর মানুষ ঘরবাড়ী, জায়গাজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এলাকার ৫০ বিঘা কৃষিজমি, জমির ফসল, গরু-মহিষ, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। মানুষ ঘর বাড়ি একাধিকবার সরিয়ে রেহায় পান নি। অন্তত ৬০ পরিবার ঘরবাড়ি নিয়ে ওপারে বরেন্দ্র এলাকায় চলে গেছেন। নদীতে পানি বাড়ার সাথে সাথে নদীপাড়ের হাজার হাজার হাজার মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
মরণবাঁধ ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মিত হয়েছে আবহমানকাল ধরে প্রবাহিত গঙ্গা-পদ্মা নদীর ভারতের অংশ ফারাক্কায় । ১৯৬৮-১৯৬৯ সালে ফরাক্কা ব্যরেজটি একতরফাভাবে নির্মাণ করে ভারত। কিন্তু ভারত কৌশলগতভাবে ব্যারেজটি তখনই চালু করেনি । তখন পাকিস্থানে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুথানের ১৯৭০ সালের জেনারেল ইয়াহিয়া সামরিক শাসন জারি এবং সবশেষে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বধীনতা অর্জনের কাল। তারপরেও ভারত অপেক্ষা করে এবং অবশেষে ১৯৭৫ ইং সালের ২১ এপ্রিল ভারত ফারাক্কা চালু করার পর থেকে অব্যাহতভাবে মরণদশা শুরু হয়েছে দেশের নদীর উপর।
শুস্ক মমৌসুমে ফারাক্কা ব্যরেজের সব কয়টি গেট বন্ধ করে নদী শাসন করে মেরে ফেলা হয় অসংখ্য নদ নদীকে জলবায়ুর বিরুপ প্রভাবে পরিবেশ জীবন জীবিকায় নেমে এসেছে প্রচন্ড ধ্বস। দেশের এক তৃতীয়াংশ এলাকা ধীরে ধীরে মরুভূমিতে পরিণত হয় । গ্রীষ্ম মৌসুমে পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নীচে নেমে যাওযায় উত্তাঞ্চলের বেশীর ভাগ নলকূপে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যায় । দেখা দেয় তীব্র পানির সংকট । উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবনে অভিশাপ বয়ে এনেছে এই ফারাক্কা ব্যারেজ; এসব এলাকার মানুষ যাকে মরণ ফাঁদ বলে জানেন ।
আবার বর্ষা মৌসুমে বিমাতৃসুলভ অচারণ করে ফারাক্কার সব কয়টি গেট খুলে দেশের মানুষকে ডুবিয়ে মারেন ভারত।
গত ৫০ বছরে ফারাক্কা ব্যারাজ বাংলাদেশের নদ-নদীতে যে বিরূপ প্রভাব রেখেছে তার বড় সাক্ষী বাংলাদেশে পদ্মা পাড়ের মানুষ।
আবার বন্যার সময় সেই ফারাক্কারই সবগুলো গেট খুলে দেওয়া হচ্ছে। এরে ফলে প্রায় প্রতিবছরই গঙ্গা ও পদ্মা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বন্যা ও ভাঙনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পদ্মা নদী। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এ নদীটি উত্তরবঙ্গে রাজশাহী বিভাগ থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
নদী গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের দীর্ঘতম এ নদীর গতিপথ থেকে শুরু করে এর শাখা নদনদীর প্রবাহে মারাত্মক ক্ষতি করেছে ফারাক্কা। এ বাঁধকে দুদেশের কল্যান হিসেবে গন্য করা হলেও বাংলাদের জন্য অকল্যানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ছোট বেলা থেকেই রাজশাহীর গোদাগাড়ী এলাকায় পদ্মা নদীতে মাছ শিকার করেন মোহাম্মদ রাব্বির হোসেন। পদ্মা নদীতে তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় নদীর পানি শুস্ক মৌসুমে, বর্ষা মৌসুমে ভারত ইচ্ছামত পানি ছেড়ে আমাদের ডুবিয়ে মারে।
প্রায় ৩৭ বছর নদীতে থাকার অভিজ্ঞতার স্মৃতি থেকে আরমান মাঝি বলেন, “পদ্মার অনেক শাখা নদীও গত ৫০ বছরে শুকিয়ে গেছে। আগে পদ্মা কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত ছিল। শুষ্ক মৌসুমে এখন অনেক যায়গায় সরু খালের মতো পানি প্রবাহিত হচ্ছে।” বর্ষা মৌসুমে ফারাক্কার সব কয়টি গেট খুলে আমাদের ভাসিয়ে দেয়।
চর আষাড়িয়াদহ কানাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ আব্দুল কুদ্দুস বলেন, প্রতিদিন নৌকায় পদ্দা পার হয়ে স্কুলে যায়। গত কয়েক দিনে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পেয়ে। দোকান, মেরামত করার জন্য রাখা নৌকাগুলি বন্যার পানিবৃদ্ধি হওয়ার কারনে ডুবে গেছে, কেউ সরাতে পেরেছে আর কেউ সরাতে পানেন নি
মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
গোদাগাড়ী পৌরসভার মাদাপুর মহল্লার অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মোঃ সাদেকুল ইসলাম বলেন, “যখন স্কুলে পড়ি তখন তো নদীতে সাঁতার দিয়েছি ব্যাপক খরস্রোত ছিল শুস্ক মৌসুমে মরা খালে পরিনত হয়। বর্ষা মৌসুমে ফারাক্কার সব কয়টি গেট খুলে দিয়ে ভারতের উঠানের পানি দিয়ে জান মালের প্রতিবছর ব্যাপক ক্ষতি করে।
মোঃ হায়দার আলী
রাজশাহী।।