
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহীঃ রাজশাহীর এককালের স্বনামধন্য রাজাবাড়ী ডিগ্রি কলেজের নজীরবিহীন ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে। কলেজের শিক্ষককর্মচারীগণ দলাদলি, একজন আরেক জনকে সাইজ, বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করতে, মামলা বানিজ্য, ব্যাপক অব্যবস্থা, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ব্যস্ত থাকায় পড়ালিখার মান দিন, দিন নিম্মগামি হচ্ছে।
২০২৬ সালের পরীক্ষার ফলাফলে চরম বিপর্যয়ের চিত্র দেখা গেছে রাজবাড়ী ডিগ্রি কলেজে। এ বছর কলেজটি থেকে মোট ১৪৭ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১৮ জন। ফলে কলেজটির পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ (প্রদত্ত মোট পরীক্ষার্থী ও পাসের সংখ্যা অনুযায়ী)। এমন হতাশাজনক ফলাফলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
প্রাপ্ত বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, মানবিক বিভাগে ১৫ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে এবং অকৃতকার্য হয়েছে ১১৯ জন। অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে ৩ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে এবং ৯ জন অকৃতকার্য হয়েছে। বাণিজ্য বিভাগে ১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়ে ১ জন্য অকৃতকার্য হয়েছে বলে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
বানিজ্য বিভাগে বর্তমানে কর্মরত আছেন
তিন জন অধ্যাপক মো: আব্দুস সবুর (সহকারী অধ্যাপক) আসাদুজ্জামান নাজিম (প্রভাষক) মাহবুব আকতার নামে একজন মৃত্যু বরণ করেছেন।
মাত্র ১জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারে ১ জন ছাত্রই ফেল। ২ জন শিক্ষক থেকে ১ জনকে পাস করতে পারেন নি। কি লজ্জার বিষয়। প্রভাষক নাজিমের বিরুদ্ধে ২ টি ছাত্রী ধষর্নের মামলা রয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে একটি বাসাবাড়ীতে, লুটপাট, ভাংচ্যুর, ধারালো অস্ত্র দিয়ে অধ্যক্ষকে যখমের মামলায় বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছে নাজিম। প্রভাষক নাজিম সাবেক এমপি আসাদুজ্জামান আসাদের ভাগনে পরিচয়ে আগে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন এবং সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে মুজিব কোট খুলে ফেলে বিএনপি জামায়াতের পরিচয় দিয়ে চলতে শুরু করে ছাত্রী ধর্ষন করে পার পেয়ে যান। সাময়িক বহিস্কার থাকায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান তাকে কলেজে আসতে নিষেধ করেছেন বলে জানা গেছে। বিগত কয়েক বছর গ বানিজ্য ভাগে ৩ শিক্ষক নিয়মিত বেতন ভাতা উত্তোলন করলেও কোন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় এবং এইচএসসি পরীক্ষা দেয় নি, যা তদন্ত করে কেঁচো খিড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে।
বিজ্ঞান বিভাগে ৭ জন শিক্ষক কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এরা হলেন, মো: সেরাজুল ইসলাম সহকারী অধ্যাপক (পদার্থ বিজ্ঞান), মোঃ সুলতানুল ইসলাম সহকারী অধ্যাপক (জীববিজ্ঞান), নীরেন্দ্রনাথ সাহা সহকারী অধ্যাপক (গণিত) প্রদর্শক একজন মোসা: সুফিয়া খাতুন। ল্যাব সহকারী তিনজন, মুক্তার হোসেন, শাহরিয়ার, মোঃ সাদিকুল ইসলাম। বিজ্ঞান বিভাগের ১২ পরীক্ষা দিয়ে মাত্র তিন জন ছাত্র পাস করেছে। ৯ জন ছাত্র ফেল করেছে।
ফলাফলের এই চিত্র কলেজটির শিক্ষার মান, পাঠদান কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এখানে ভাল পাঠদান হয় না। শিক্ষক কর্মচারীগণ নিজের খেয়ালখুশি মত আসেন এবং বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। বিশেষ করে মানবিক বিভাগে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের শ্রেণী কক্ষে পাঠদানে গাফলতি, পাঠ্যসূচি যথাসময়ে শেষ করতে না পারা, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকের অত্যন্ত দুর্বল, অযোগ্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের বিশেষ নজরদারির অভাব, অভিভাবক সমাবেশ, ক্লাস পরীক্ষা না হওয়া, নাইডগার্ড, সুইপারদের ক্ষমতার দাপটে কলেজে অবস্থান না করা নিয়মিত অধ্যক্ষ সেলীম রেজাকে অন্যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তথাকথিত সাময়িকভাবে বরখাস্তের মাধ্যমে বছরের পর বছর কলেজের বাইরে রাখার করণে এ বছর নজীরবিহিন এইচএসসির ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে বলে এলাকাবাসী, অভিভাবক, সচেতনমহল জানিয়েছেন।
রাজাবাড়ী কলেজের গর্ভনিং বডির সাবেক অধ্যক্ষ আলহাজ মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, সেলীম রেজাকে এলাকাবসীসহ আমরা কলেজেটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা জন্য অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলাম, তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর কলেজে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মান বৃদ্ধি, শ্রেণীকক্ষে সাদা বোর্ড, সিসি ক্যামেরা, লাগানো, শিক্ষকদের তথাকথিত অফডে বাতিল করে সপ্তাহে ৬ দিন শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানে আসতে ক্লাস নিতে বাধ্য করেছিলেন। এতে শিক্ষকগণ তখন থেকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান করে ছিলেন কিন্তু গর্ভনিং বডির সদস্যদের শক্তিশালী ভূমিকায় পিছু নামধারী সুবিধাবাদী শিক্ষকগণ। ক্লাস, পরীক্ষা, সাপ্তাহিক, মাসিক পরীক্ষা, কলেজের বিজ্ঞানাগার, পাঠাগার, কলেজ ক্যাম্পসে বাগান করার জন্য বাসা থেকে টবসহ ফুল, ফলজ গাছ নিয়ে বাগান নির্মান করা, নিয়মমিত অভিভাবকদের নিয়ে সমাবেশ, শিক্ষক সমাবেশ, ছাত্রীদের নিয়ে সমাবেশ করা হয়েছিল। তখন শিক্ষার পরিবেশ উন্নত ছিল পাবলিক পরীক্ষায় ফালাফল ভাল হতো। শুধু তা নয়, বিজ্ঞান মেলা, বিভিন্ন দিবসে অংশগ্রহণ, সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমে অংশ গ্রহন করে উপজেলায় প্রথম, দ্বিতীয় হবার গৌরব অর্জন করে। জেলাতে কয়েকবার অংশগ্রহন করার নজীর রয়েছে। কিন্তু মামলা, হামলা, দলাদলিতে কলেজের এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যে কোন মূল্য অধ্যক্ষ সেলীম রেজা চিয়ারে বসতে না দেয়া।
এদিকে কলেজটির এমন ফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন অভিভাবকরা। সব মিলিয়ে রাজবাড়ী ডিগ্রি কলেজের এ বছরের ফলাফল শিক্ষা কার্যক্রমের মান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। আগামীতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। এখন সচেতন মহলের প্রশ্ন—রাজবাড়ী ডিগ্রি কলেজের এই ফল বিপর্যয়ের পেছনে প্রকৃত কারণ কী? শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি, নাকি পাঠদান ও তদারকির দুর্বলতা বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
নিজস্ব প্রতিবেদক,
রাজশাহী।