
মুহম্মদ তরিকুল ইসলাম, তেতূলিয়া প্রতিনিধিঃ পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় স্থানীয় প্রকৌশলীর উপস্থিতিতে কাজ শেষ করার মাত্র এক সপ্তাহ না যেতেই উপজেলার চিমনজোত মসজিদ থেকে শারিয়ালজোত বিওপি সড়কের কার্পেটিং পায়ে ঘষা দিলেই উঠে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে সড়ক পাকাকরণের এই বেহাল দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। নামমাত্র বিটুমিন দিয়ে নিম্নমানের কাজ করায় এমনটা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
গত বুধবার ও মঙ্গলবার (২১ ও ২৭ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের পূর্ব শারিয়ালজোত গ্রামে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও শিডিউল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩ এর আওতায় প্রাক্কলিত মূল্য ৪৪ লাখ ১১ হাজার ৮৬২টাকা যার চুক্তি মূল্য ৪১ লাখ ৯১ হাজার ২৬৮ টাকা ব্যয়ে ৩নং তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের চিমনজোত মসজিদ থেকে শারিয়ালজোত বিওপি পর্যন্ত রাস্তায় পূর্ব শারিয়ালজোত গ্রামের আব্দুল কাশেম এর বাড়ী থেকে নুর ইসলাম/সুরুজ আলীর বাড়ী পর্যন্ত ৪৫০ মিটার রাস্তা নির্মাণের কাজ হাতে নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কাজটি পায় ওই উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের বুড়াবুড়ি গ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উমর ফারুক ট্রেডার্স। যার স্বত্বাধিকারী হচ্ছেন জাকির হোসেনের স্ত্রী বেলি আক্তার। এরপর উমর ফারুক ট্রেডার্স নামীয় প্রতিষ্ঠান কাজটি পাওয়ার পর রাফি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রেজাউল ইসলামের নিকট বিক্রি করে দেয় বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভোর রাতে ফজরের পর এসে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে রাস্তা নির্মাণের কাজ করেছে। সড়কটি নির্মাণে কোনো নিয়মকানুন মানা হয়নি। ঢালাইয়ের আগে তেল না মেরেই রাস্তার কাজ করেছে এই কারণেই হাত দিয়ে টানা দিলেই এবং পা দিয়ে ঘষা মারলেই কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢালাইয়ের এক সপ্তাহ না যেতেই পায়ের ঘষাতে উঠে যাচ্ছে কার্পেটিং। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ও সড়কের পাশে ভাঙনও দেখা যায়। তবে সরেজমিনে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উঠে যাওয়া কার্পেটিং ঠিকাদারের কাছ থেকে ঠিকঠাক করে নেওয়ার আশ^াস দিয়েও করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা সূর্য বানু বলেন, ‘রাস্তার কাজ ভালো হয় নাই দুই নম্বর কাজ হইছে। যে পিচ দিয়েছে তা ভালো হয়নি, মানুষ যখন ভোরে নামায পড়ে তখন এই রাস্তার ঢালাইয়ের কাজ করেছে, সন্ধ্যার পরেও কাজ হয়েছে। আমি আগে রাস্তার কাজ করেছি ওই সময় রাস্তার কাজ করেনা।’
স্থানীয় বাসিন্দা জনাব আলী বলেন, ‘আমার জীবনেও এমন কাজ দেখিনি, ঢালাইয়ের আগে পানি মারে, তেল মারে তা করেনি। তিন দিন হলো না, সব উইঠা গেল।’
শারিয়ালজোত গ্রামের তাহমিনা বেগম, এরশাদ আলী ও সাইফুল ইসলাম জানান, কার্পেটিংয়ের আগে যেভাবে বিটুমিন ছিটানো দরকার সেভাবে দেয়নি, কোথাও বিটুমিন পড়েইনি ওই অবস্থায় ঢালাই হয়েছে। ভোরে এসে তারা ঢালাই কাজ করেছে। বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সামান্য আঘাতেই বা পায়ের ঠেলায় পিচ-পাথর উঠে আসছে। এই অনিয়মের প্রতিবাদ জানিয়ে তারা দ্রুত সড়কটি পুনরায় সংস্কার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে ফেসবুকে সড়কটির কার্পেটিং উঠে যাওয়ার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর বিটুমিন মারতে গিয়ে বিটুমিন না মেরেই চলে যান ঠিকাদারের লোকজন।
স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল ও নুর হোসেন জানান, ‘উঠে যাওয়া কার্পেটিং ঠিক করতে পিচ গরম করছিলেন ওই সময় একটি সাদা গাড়ি আসে, গাড়িটি চলে গেলে ঠিকাদারের লোকজনও চলে যায়।’
সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে ঠিকাদার রেজাউল ইসলাম বলেন, “রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে, কাচা অবস্থায় গাড়ি ঢুকে গিয়ে ব্রেক দিচ্ছেন তাই এমনটি হচ্ছে, অন্তত ৭২ ঘন্টা সুযোগ দেওয়া উচিত।”
এ বিষয়ে উমর ফারুক ট্রেডার্স ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী বেলি আক্তারের স্বামী জাকির হোসেন বলেন, তিনি তাঁর সহধর্মিণীর লাইসেন্সে পেয়েছেন। স্ট্যাম্পের মাধ্যমে রাফি এন্টারপ্রাইজ নামে এক প্রতিষ্ঠান কাজটি ক্রয় করে নিয়েছেন। কাজটি বিক্রি করার সময় শর্ত ছিল কাজে কোনো অনিয়ম করবেনা। যদি কোনো অনিয়ম করে তার দায়ভার সেই নিবেন। বিল সাবমিটের সময় অফিসে গিয়ে কাজটি ভালোভাবে বুঝে নেওয়ার জন্য ইঞ্জিনিয়ারকে বলবেন জানান।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. রমজান আলী বলেন, ‘বিষয়টি ফেসবুকে দেখেছি, ঠিকাদারকে ফাইনাল বিল দেওয়া হয়নি, ঠিাকাদারের কাছ থেকে কাজটি ঠিক করে নেওয়া হবে। এছাড়া আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে ব্যবস্থা গ্রহন করব।’
উপসহকারী প্রকৌশলী ইব্রাহীম খলিল বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। তবে যতটুকু জানি, ঠিকাদার উঠে যাওয়া ওই কার্পেটিংয়ে পুনরায় বিটুমিন মারতে যাইতে এলাকাবাসীকে ভয় পাচ্ছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আনোয়ার হোসাইন বলেন, ‘তিনি বিষয়টি তদন্ত করতে ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়েছেন, ইঞ্জিনিয়ার বিষয়টা দেখে ব্যবস্থা নিবেন। তারপরেও যদি সে ব্যবস্থা না নেয়, তিনি ঠিকাদারকে ধরবেন জানিয়েছেন।’
মুহম্মদ তরিকুল ইসলাম।।