
রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলীঃ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলীর ঐতিহাসিক খেতুরীধামে শুরু হয়েছে সনাতন বৈষ্ণব ধর্মের মহান সাধক ঠাকুর নরোত্তম দাসের তিরোভাব মহোৎসব। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবে দেশ-বিদেশের ভক্ত ও সাধু-সন্ন্যাসীদের আগমনে মুখর হয়ে উঠেছে পদ্মাপাড়ের খেতুরীধাম। এখানে ৭শ বছরের একটি তমাল গাছ আছে, যে গাছে ফুলফল কিছুই হয় না । এটা একটি ব্যতিক্রমধর্মী গাছ। বিশ্বাস করে এগাছের পাতা, বাকল গেলে নানা জটিল রোগ থেকে আরগ্য পাওয়া যায় বলে মনে করেন। উৎসবকে ঘিরে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মেলা। আগত ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় ভজন-কীর্তন, সন্ধ্যা আরতি, দামোদর আরতি, নরোত্তম চরিতকথা ও অধিবাস কীর্তনের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী এ মহোৎসবের সূচনা হয়।
আজ শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) উৎসবের দ্বিতীয় দিনে ভোর থেকে মঙ্গল আরতি, হরিনাম সংকীর্তনসহ খেতুরীধাম পরিক্রমা, দর্শন আরতি ও শ্রীল প্রভুপাদ গুরুপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অষ্টপ্রহর কীর্তন, প্রসাদ গ্রহণ ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন ভক্তরা। আগামী শনিবার (৩১ অক্টোবর) গঙ্গাস্নান ও দীর্ঘ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মহোৎসব শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
মহোৎসব উপলক্ষে খেতুরীধামে বসেছে বিশাল মেলা। এতে ধর্মীয় উপকরণের পাশাপাশি বাহারি খাবার, পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী, কারুশিল্পের পণ্য এবং কামার-কুমারের তৈরি মৃৎ ও লৌহজাত সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। আয়োজকদের ভাষ্য, এ মেলা মূলত সাধু-সন্ন্যাসীদের মিলনক্ষেত্র হলেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে এখানে সমবেত হন।
খেতুরীধাম ট্রাস্টি বোর্ডের ম্যানেজার গোবিন্দ পাল বলেন, অনুষ্ঠান ভালভাবে চলছিল কিন্তু ২ দিনের ভারী বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। রাস্তা পিচ্ছল হওয়ায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটছে। লাখ লাখ লোক সমাগমের কারণে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগতদের জায়গার সংকুলান না হওয়ায় আরও বিপদে পড়েছি আমরা। অনেকে বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। তমাল তোলার পাশে একটি মন্দির রেয়েছে, সেখানে পদ্মা নদীতে আগত ভক্তরা স্নান করেন কিন্তু নদীর ধারে পলিমাটি পড়ায় খুবই সমস্যা হচ্ছে।
খেতুরীধাম ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল বলেন, শত শত বছর ধরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষও সম্প্রীতির টানে এখানে আসেন। ট্রাস্টি বোর্ড ও প্রশাসনের সহযোগিতায় এবারও সুষ্ঠুভাবে উৎসব সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ ঙসুজন মিয়া জানান, উৎসবে আগত ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উৎসব প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই যাতে ভক্তরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারেন, সে বিষয়ে সতর্ক নজরদারি রাখা হচ্ছে।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান জানান, ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা দিচ্ছে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুর নরোত্তম দাস ষোড়শ শতকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী এলাকার গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন তৎকালীন জমিদার কৃষ্ণনন্দ দাস মজুমদার। বিত্তশালী পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি বিলাসী জীবন পরিহার করে ধর্মসাধনা, মানবসেবা ও বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।
জীবদ্দশায় গোপালপুরের কাছে খেতুরীতে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে ধর্মসাধনায় নিয়োজিত হন তিনি। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। বৈষ্ণব পদাবলি ও লীলারসকীর্তনের বিকাশে তাঁর ভূমিকা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। খেতুরীধামে তাঁর স্মৃতিকে ঘিরেই প্রতিবছর এ তিরোভাব মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
প্রেমতলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মুক্তার হোসেন বলেন, শত বছর পূর্বে থেকে ঐতিহাসিক খেতুরীধামে শুরু হয়েছে সনাতন বৈষ্ণব ধর্মের মহান সাধক ঠাকুর নরোত্তম দাসের তিরোভাব মহোৎসব পালন করে আসছেন। এলাকার স্কুল, কলেজের স্থান ব্যবহার করতে দেয়া হয়। মসুলমানগন তাদেরকে খুব আন্তরিকতা সাহায্য সহযোগিতা করে থাকেন। কোন প্রকার সমস্যা হয় না।
মোঃ হায়দার আলী
গোদাগাড়ী,
রাজশাহী।।