
মোঃ নাঈম মল্লিক,
ঝালকাঠি প্রতিনিধি।।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর
অধিকার প্রতিষ্ঠা, দুর্যোগে মানবিক সহায়তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সুবিচারে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় সম্মাননা ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ পেলেন ঝালকাঠির তরুণ সংগঠক আরিফুর রহমান। এক দশকের বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছাসেবামূলক ও সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ সম্মাননা অর্জন করেন।শনিবার (১৭ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে আরিফুর রহমান এ পুরস্কার গ্রহণ করেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ ও সমাজ উন্নয়নে অবদানের জন্য তাকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।বর্তমানে ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আরিফুর রহমান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে দুর্যোগকালীন মানবিক সহায়তা, পরিবেশ শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং তরুণদের সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক দশক ধরে কাজ করছেন তিনি।২০১৬ সালে বরিশালের মান্তা জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবনসংগ্রাম কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা বদলে দেয় আরিফুর রহমানের জীবনের গতিপথ। জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের অভাব, চিকিৎসাসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং সন্তানদের শিক্ষার অনিশ্চয়তা তাঁকে প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই শুরু হয় তাঁর স্বেচ্ছাসেবামূলক পথচলা। বরিশাল অঞ্চলের মান্তা জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম নৌকায় বসবাস করে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এসব পরিবারের অনেক সদস্যের জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে সমস্যা হয়। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, সরকারি সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁদের নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়।মান্তা জনগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আরিফুর রহমান প্রথমে সাক্ষরতা, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি সহায়তামূলক কার্যক্রমে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের নাগরিক অধিকার, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিষয়েও কাজ শুরু করেন।ইয়ুথনেট গ্লোবালের ‘মান্তাকানেক্ট’ উদ্যোগের মাধ্যমে এ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়েছে।পাশাপাশি ৩০০ মান্তা সদস্যকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসেন।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় মান্তা জনগোষ্ঠীর জন্য কবরস্থানের জমির ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও অধিকারভিত্তিক প্রচেষ্টা ভূমিকা রেখেছে। স্থায়ী বসতি না থাকা পরিবারগুলোর জন্য এটি দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল।
দুর্যোগে মানবিক সহায়তা ও জীবিকা উন্নয়নপ্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন আরিফুর রহমান। তরুণদের সঙ্গে কমিউনিটি কিচেনের মাধ্যমে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেন সংকটে থাকা পরিবারগুলোর কাছে।ঘূর্ণিঝড় আম্পান এবং পরবর্তী বিভিন্ন বন্যায় ফেনী, সিলেট, কুড়িগ্রাম, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও রংপুরের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাদ্য, চিকিৎসা ও জরুরি সামগ্রী বিতরণেও অংশ নেন তিনি।দুর্যোগকালীন জরুরি সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার ও জীবিকার সুযোগ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ২০২২ সাল থেকে কুড়িগ্রামে ইয়ুথনেট গ্লোবালের ‘চর ইয়ুথনেট কমিউনিটি' এর উদ্যোগের মাধ্যমে চরাঞ্চলের ৯৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের আশ্রয়, জীবিকা ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে কাজ করেছেন সে। এছাড়াও পরিবেশ শিক্ষায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী,শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা তৈরিতে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো। ইকো অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের আয়োজন ও সমন্বয়ে তাঁর ভূমিকা রয়েছে অপরিসীম। এসব কার্যক্রমে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছে শিক্ষার্থী ও তরুণরা।ঝালকাঠির ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা ইয়ুথ ক্লাইমেট ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৩০০ শিক্ষার্থী ও ২০ জন শিক্ষক। ক্লাবগুলোর সদস্যরা বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্লাস্টিকদূষণ প্রতিরোধে কাজ করছে।এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু সুবিচার ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচিতেও ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির এসব কার্যক্রমের সাথে দেশের ৫০টি জেলার প্রায় ১৫ হাজার তরুণ-তরুণী যুক্ত রয়েছেন।
আরিফুর রহমান বলেন, আমার এ সম্মাননা প্রিয় জন্মভূমি ঝালকাঠিবাসী এবং সকল তরুণ সমাজকে উৎসর্গ করলাম।
কারন আমি বিশ্বাস করি, তরুণরাই পারে সমাজ বদলাতে।
পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তরুণেরা যেন নিজেদের এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করে স্থানীয় পর্যায় থেকেই সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারে, সেটিই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, “আরিফুর রহমান মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে কখনো দয়া বা দান হিসেবে দেখেননি। তিনি কাজ করেছেন মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য। তাঁর এই অর্জন তরুণদের জলবায়ু সুবিচারের জন্য কাজ করা তরুণদের আরও উৎসাহিত করবে।