
মোঃ তরিকুল ইসলাম তরুন, কুমিল্লা।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসকের অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ উঠেছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে প্রত্যন্ত এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষের চিকিৎসাসেবা। দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে এসে চিকিৎসককে না পেয়ে অনেক রোগীকেই ফিরে যেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেপ্টেম্বর মাসের হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১ ও ২ সেপ্টেম্বর চিকিৎসকের উপস্থিতির স্বাক্ষর রয়েছে। এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাজিরা খাতায় আর কোনো স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় রোগীদের অভিযোগ, উপসহকারী মেডিক্যাল অফিসার এনামুল হক চৌধুরী নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। মাঝে মধ্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এলেও অল্প সময় অবস্থান করে চলে যান। ফলে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক রোগী চিকিৎসাসেবা না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে দেবিদ্বার উপজেলার সুবিল উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বাঙ্গরা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে বদলি হয়ে আসেন উপসহকারী মেডিক্যাল অফিসার এনামুল হক চৌধুরী। এরপর থেকেই তার কর্মস্থলে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ ওঠে।
সরকারি কর্মঘণ্টা অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি অনেক সময় সকাল ১০টা থেকে ১১টার দিকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন এবং দুপুর সাড়ে ১২টার পর আর কর্মস্থলে থাকেন না।
সরেজমিনে চিকিৎসককে পাওয়া যায়নি-
সরেজমিনে বাঙ্গরা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অফিস সহায়ক ওয়াসিমের কক্ষে কয়েকজন রোগী টোকেন হাতে নিয়ে চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছেন। ফার্মাসিস্ট না থাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অফিস সহায়ক ওয়াসিম সেখানে ফার্মাসিস্টের দায়িত্ব পালন করছেন।
সেদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসকের ২ নম্বর কক্ষে তালা ঝুলছে। অপেক্ষমাণ রোগীদের মধ্যে কেউ এলার্জিজনিত সমস্যা, কেউ ঠান্ডা-জ্বর এবং কেউ শরীরের বিভিন্ন ধরনের ব্যথা নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। চিকিৎসক না থাকায় অফিস সহায়ক রোগীদের সামলানোর চেষ্টা করেন। তবে চিকিৎসা না পেয়ে কয়েকজন রোগীকে ফিরে যেতে দেখা যায়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, উপসহকারী মেডিক্যাল অফিসার এনামুল হক চৌধুরী দেবিদ্বারের ‘দি ডক্টরস ল্যাব’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখেন। তাদের দাবি, সেখানে চেম্বার করার কারণে তিনি কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে।
রোগীদের অভিযোগ-
বাঙ্গরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশে ব্যবসা করেন মো. হারিস মিয়া (৫৮)। তিনি বলেন, “নতুন ডাক্তার আসার পর থেকেই তিনি অনিয়মিত। চিকিৎসা নিতে এসে অনেক সময় ডাক্তারকে পাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এসে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যায়।”
বাঙ্গরা বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আল-মামুন (৩৫) শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা নিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। অসুস্থ হলে বিনামূল্যে সরকারি চিকিৎসা নিতে এখানে আসি। কিন্তু এসেও দেখি ডাক্তার নেই। প্রতিদিন রোগীরা এসে ফিরে যায়। এর জরুরি সমাধান চাই।”
আসাদ মিয়া (৩২) বলেন, “শনিবার চিকিৎসা নিতে এসে ফিরে গেছি। এর আগেও এসে ডাক্তার পাইনি।”
৬০ বছর বয়সী জুলেখা বেগম নাতনিকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছিলেন। নিজেও অসুস্থ ছিলেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসককে না পেয়ে তাকেও ফিরে যেতে হয়। জুলেখা বেগম বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। বড় কোনো হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে পারি না। এখানে এসেও ডাক্তার পাই না। এখন যাব কোথায়?”
যোগীরখিল গ্রাম থেকে শিশুদের চিকিৎসা নিতে আসা মায়মনা (৩০) ও বিউটি আক্তার (২৮) একই অভিযোগ করেন। তারা জানান, চিকিৎসককে না পেয়ে ফার্মাসিস্টের কক্ষ থেকে কিছু ওষুধ নিয়েছেন। চিকিৎসক না থাকায় তারা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন।
হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না থাকার বিষয়ে চিকিৎসকের বক্তব্য-
টানা ২৫ দিন হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না থাকার বিষয়ে উপসহকারী মেডিক্যাল অফিসার এনামুল হক চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ভুলবশত টানা ২৫ দিন হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করা হয়নি। বিষয়টি এখন খারাপ লাগছে। তবে রোগীর রেজিস্টার নিয়মিত সংরক্ষণ করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে আগে ১২টার দিকে চলে যান এবং শনিবার অফিস করেন।
২৬ সেপ্টেম্বর শনিবারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন ছুটি না নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে বের হয়েছিলেন।
প্রায়ই তাকে কর্মস্থলে পাওয়া যায় না—রোগীদের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এনামুল হক চৌধুরী বলেন, “টুকটাক এমন অভিযোগ থাকবে। কারণ সবাই একদিনে আসে না।”
নিয়মিত অফিস করার নির্দেশ-
এ বিষয়ে মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “বাঙ্গরায় চিকিৎসক অনিয়মিত থাকার বিষয়টি জানতে পেরেছি। এছাড়াও ওনার ডক্টরস নামে একটি চেম্বার রয়েছে বলে খবর পেয়েছি। বিষয়টি আরও খোঁজখবর নেবো।”
তিনি বলেন, “তাকে নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালনের জন্য বলে দেওয়া হবে।”