শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :-
কুমিল্লা মনোহরগঞ্জে পদ না পেয়ে নিজের গালে জুতাপেটা ছাত্রদল নেতার বাংলাবাজার পত্রিকার সাংবাদিক জাহাঙ্গীর প্রধানকে প্রা-ণনাশের হু-মকি-আশুলিয়া থানায় জিডি আশুলিয়ায় ডিবি পুলিশ কর্তৃক ৫২ কেজি গাঁজাসহ একজন পেশাদার মাদক কারবারী গ্রে-ফতার একটি গাড়ী ‍উদ্ধার গোপালগঞ্জে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেছেন ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান  সন্তানের হাতের স্মার্টফোনই হতে পারে প্রিয় শিক্ষক, এআইনির্ভর শিক্ষায় পড়াশোনা হবে সহজ- ড. মো. শাহজামাল সাজু রাজশাহীতে ক্রিকেটারদের চু-রি হওয়া লাগেজ উদ্ধার ৪ জনকে আট-ক করেছে পুলিশ তানোরে ছাত্রলীগ-যুবলীগের ঝটিকা মশাল মিছিলের ভিডিও ভাইরাল দুর্গোৎসবে বিশৃঙ্খলা রোধে বাড়তি সতর্কতার আহ্বান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হকের স্বাধীনতার ৫৪ বছরে নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে বহু ঘরবাড়ি ও স্থাপনা: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী পার্বতীপুরে কোকো ক্রীড়া সংসদের বেলাইচণ্ডী ইউনিয়ন কমিটি গঠন

রাজশাহীর সাংবাদিক জগতের গর্ব সাইদুর রহমান মরেও অমর। তার অর্জিত কোটি কোটি টাকার সম্পদ দিয়ে গেছেন ট্রাস্টে

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২৭ Time View

লেখকঃ মোঃ হায়দার আলী।। সংবাদপত্রকে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনিবার্য এক উপাদান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সাংবাদিকদের জাতীর বিবেকও বলা হয়। সাংবাদিকগণ হচ্ছেন জাতির জাগ্রত বিবেক। আর সংবাদপত্র হচ্ছে সমাজের দর্পণ, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। তাই সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিকতা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনে। সংবাদপত্রের যাত্রা যথেষ্ট প্রচীন হলেও বিংশ শতাব্দিতে সংবাদপত্র বিভিন্ন দেশীয় আন্তজাতিক পরিমন্ডলে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ন ভূমিকা পালন করেছিল, বর্তমানেও করছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ওয়াটার গেট কেলেংকারী সংশ্লষ্ট সাংবাদিকতার গভীর তাৎপর্যপূর্ন নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছিল। বাংলাদেশের সাংবাদিকগণ তাৎপর্যপূর্ন ইতিবাচক ভূমিকার স্বাক্ষর রেখেছেন। একটি দেশের সাংবাদিক, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা, চেয়ারম্যান, মেয়র, এমপি, মন্ত্রী যদি সৎ, যোগ্য, বাস্তববাদী হয় তবে যে কোন ধরনের উন্নতি করতে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমাদের দেশের ওই সব মানুষ গুলি কতটা সৎ, তার নমূনা হিসেবে দেখা গিয়েছে করোনা প্রম্তুতিতে ত্রাণের চাল, ডাল, সোয়াবিন তেল চুরির প্রতিযোগিতায় নেমেছিল এক শ্রেণীর মানুষ। জামায়াত থেকে টিকিট নিয়ে এমপি নির্বচিত হোটেলের কক্ষে নারী নিয়ে ধরা তার পর বাধ্য হয়ে বিয়ে করা। শেষ পর্যন্ত ন্যাম ভবনে মরিয়মকে মেরে ফেলা এসব কিছু ভিতর থেকে বের করে আনেন জাতীর বিবেক সাংবাদিকগণ। তেমনী একজন নির্ভীক, সৎ, যোগ্য সাংবাদিক ছিলেন সাইদুর রহমান। তিনি শুধু রাজশাহীর সাংবাদিক ছিলেন না তিনি গোটা উত্তরাঞ্চের গর্ব ছিলেন।

আমি খুব কাছ থেকে তাকে দেখেছি, বিভিন্ন সময় সাংবাদিকতার প্রয়োজনে রিকসা, মাইক্রো, নৌকায় চলাচল করেছে। তিনি ছিলেন মিষ্টিভাষি, ভদ্র ছিলেন, তার মেধা, লেখনীর হাত বিস্তর ছিল। একদিন আমাকে সাইদুর ভাই বললেন, হায়দার তুমি নৌকা রেডি রেখ আমি ও বিবিসি বাংলার প্রতিনিধি কাদির কল্লোল ভাইসহ কয়েক জন্য পদ্মা নদীর ওপারে সীমান্তের গ্রাম গুলিতে যাব। ভারত যে সীমান্তে কাটা তারের বেড়া দিচ্ছে এবারে গ্রাম বাসীর কি সমস্যা হবে। চোরাচালান বাড়বে না কমবে, দুপুরের খাবার পর আমরা গিয়েছিলাম রেলওয়ে বাজার ঘাটে নৌকায় ওপারে যাওয়ার জন্য জৈনক আরমান মাঝিকে ঠিক করেছিলাম। আমাদের সাথে বড় বড় ক্যামেরা, সাংবাদিক দেখে ঘটের ইজারাদার, চোরাকারবারী, বিডিআর ( বিজিবি) দের চোখ তো ছানাবড়া, তারা আমাদের নিকট জানার চেষ্টা করেছেন আমরা কোথায় যাব, কেন যাব কখন ফিরবো না প্রশ্ন। তখন ব্যপক চোরাকারবারী চলতো। আমরা নৌকায় উঠার সাথে সাথে ওপারে কয়েক জন কাশফুল ও চারায় জ্বালিয়ে রেড সিগন্যাল জানিয়ে দিলেন এখন কোন চোরাচালানী পুন্য আসবে না যাবে না। সাংবাদিক সাইদুর ভাই আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন আগুন জ্বালানোর কারণ কি হায়দার ? এটা রেড এলাট। পুনরায় আগুন জ্বালালে তারা বুঝবেন চোরাকারবারী লাইন শুরু হয়েছে। এসময় শুনে কাদির কল্লোল ভাই হেঁসে বলেছিলেন চমৎকার বুদ্ধি তো। নদীর ওপারে চলে গেলাম হাঁটতে হাঁটতে যখন চর আষাড়িয়াদহ পৌঁছেছিলাম তখন আমরা সবাই আষাড়িয়াদহের বিখ্যাত মিষ্টি, পিয়াজু ও মহিষের দুধের দুধ চা খেয়েছিলাম। কাদির কল্লোল ও সাইদুর ভাই মিষ্টি ও দুধ চায়ের প্রশাংসা করেছিলেন। তারপর আমরা সাংবাদিকতার কাজে আরও দূরে সীমান্তবর্তী গ্রাম গুলিতে গিয়েছিলাম কিন্তু কেউ সাক্ষাৎকার দিতে রাজি ছিলেন না। আমি কয়েকজনকে সুকৌশলে রাজি করেছিলাম। কাদির কল্লোল ভাই ক্যামেরা ও রেকোডিং করেছিলেন। আমরা যখন ওপারে নৌকায় উঠলাম তখন রাত সাড়ে ৯ টা। রাত ১০ টায় নৌকা থেকে এপারে আসলাম। আবার আগুন জালিয়ে পুনরায় সংকেত দিলেন এতে বুঝা গেল এখন আর কোন সমস্যা নেই। পরে বিবিসি বাংলায় প্রচারও হয়েছিল, দৈনিক ভোরের কাগজ, সাপ্তাহিক রাজশাহী বিস্তর লেখা হয়েছিল। ওই প্রথিতযশা সাংবাদিক সাইদুর রহমান ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই।

রাজশাহীর সাংবাদিকতা অঙ্গনের পরিচিত ও প্রবীণ কণ্ঠ, রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতি গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনিজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর। সাইদুর রহমানের মৃত্যু শুধু একজন সাংবাদিকের প্রয়াণ নয়; এর মধ্য দিয়ে রাজশাহীর সাংবাদিকতার একটি দীর্ঘ অধ্যায়েরও অবসান ঘটেছে।
সাইদুর রহমান অবিবাহিত ছিলেন। সাত ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তাঁর জন্ম রাজশাহী নগরের পাঠানপাড়ায়। তিনি সাবেক গভর্নর ও আইনজীবী আতাউর রহমান এবং ভাষাসৈনিক মনোয়ারা রহমানের ছেলে। তাঁর নানা ছিলেন রাজশাহীর প্রখ্যাত আইনজীবী ও শিক্ষানুরাগী মাদার বখশ। ১৯৮০ দশকে দৈনিক করতোয়ায় কাজের মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন সাইদুর রহমান। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। সর্বশেষ তিনি দৈনিক ভোরের কাগজে কর্মরত ছিলেন। রাজশাহীর বিভিন্ন সমস্যা, সংকট ও জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন লেখালেখি ও সংগ্রাম করেছেন তিনি।

১৯৬৪ সালের দিকে রাজশাহীর পাঠান পাড়ায় জন্ম নেওয়া অত্যন্ত মেধাবী সাইদুর রহমান পড়াশোনা করেন রাজশাহী গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল ও রাজশাহী কলেজে। উচ্চশিক্ষার জন্য যান রাশিয়ার মস্কোতে। সেখানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর দেশে ফেরেন।

সাইদুর রহমান ছিলেন রাজশাহীর একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবারের উত্তরসূরি। তাঁর নানা মাদার বখশ ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ও রাজনীতিক। রাজশাহীতে উচ্চশিক্ষার প্রসারে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়ও তিনি অন্যতম ভূমিকা রাখেন।

সাইদুর রহমানের বাবা আতাউর রহমানও রাজশাহীর রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় তিনি নির্বাচিত হন। তাঁর মা ভাষাসৈনিক মনোয়ারা রহমান সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত ছিলেন।

পারিবারিক ঐতিহ্যকে শুধু স্মৃতিতে ধরে রাখেননি সাইদুর রহমান। জনকল্যাণের সেই ধারাকে নিজের জীবনেও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। রাজশাহীর বিভিন্ন সমস্যা, সংকট ও জনস্বার্থের বিষয়ে তিনি দীর্ঘদিন সোচ্চার ছিলেন।

রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন বলেন, রাজশাহীর সব নৈতিক আন্দোলনে সাইদুর রহমান সক্রিয় ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি রাজশাহীর সমস্যা ও সংকটসহ নানা বিষয়ে লিখেছেন। তাঁর মৃত্যুতে রাজশাহীবাসীর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
রাজশাহী প্রেসক্লাবই ছিল সাইদুর রহমানের ঘরবাড়ি। দিন-রাতের বড় একটি সময় কাটত সেখানেই। ঘর-সংসার করা হয়ে ওঠেনি। স্ত্রী-সন্তানও ছিল না। জীবনের শেষ সময়টুকুও কখনো প্রেসক্লাবে, কখনো সহকর্মীর বাসায় কেটেছে। অথচ জীবনের দীর্ঘ কর্মযজ্ঞে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। নিজের জন্য সেই সম্পদ ভোগ করেননি। মৃত্যুর মাত্র ২ মাস আগে সবকিছু মানুষের কল্যাণে দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রাজশাহী প্রেসক্লাবের সদ্য প্রয়াত সভাপতি সাংবাদিক সাইদুর রহমান।
নিজের সম্পদ তিনি দিয়ে গেছেন ‘জননেতা আতাউর রহমান ট্রাস্টে’। তাঁর ইচ্ছা ছিল, এই ট্রাস্টের মাধ্যমে গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো হবে। জীবনের শেষ দিকের এই সিদ্ধান্তেও ফুটে উঠেছে মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা। তিনি জানতেন ভোগে সুখ নেই ত্যাগের সব সুখ। জানা গেছে, প্রায় দুই বছর ধরে রাজশাহীর সাংবাদিক রাজীব আলী রাতুলের বাসায় থাকতেন সাইদুর রহমান। মৃত্যুর দুই মাস আগে ওই বাসায় বসেই ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নেন তিনি। একদিন দুপুরে জরুরি কথা আছে জানিয়ে রাতুল ও তাঁর বাবা মাসুদ রানা সরকারকে ডাকেন। এরপর তাঁদের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানান।

রাজীব আলী রাতুল বলেন, সাইদুর রহমান সেদিন বলেছিলেন, ‘আমার তো স্ত্রী-সন্তান নেই। আমার ইচ্ছে- আমার যে সম্পদ আছে তা ট্রাস্টে দিয়ে যাব। গরিব-দুঃখী মানুষের কল্যাণে ওই সম্পদ ব্যয় করা হবে।’

সেদিনই ট্রাস্ট গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। দুই দিন পর মনোনীত সদস্যদের ডেকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান সাইদুর রহমান। সবার সম্মতিতে গঠন করা হয় ট্রাস্টের পরিচালনা বোর্ড।

ট্রাস্টের চেয়ারম্যান করা হয়েছে তাঁর বোন আফরোজী রহমান খেলনাকে। সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে সাংবাদিক রাজীব আলী রাতুলের বাবা মাসুদ রানা সরকারকে। সদস্য করা হয়েছে রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী আসলাম-উদ-দৌলা, সাংবাদিক আল-আমিন, সালাহউদ্দিন মিন্টু এবং তাঁর সহকর্মী দৈনিক ভোরের কাগজের বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি মো. জনিসহ ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে।

সাইদুর রহমানের সম্পদের মধ্যে রয়েছে রাজশাহী নগরের পাঠানপাড়ায় ১০ কাঠার একটি প্লট, একটি বাসা ও ব্যাংকে জমা কয়েক কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যবসা করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিকে প্রায় দুই কোটি টাকা ধার দিয়েছিলেন তিনি। এসব সম্পদের নথিপত্রও রয়েছে। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী এসব সম্পদ ও পাওনা ট্রাস্টের আওতায় নেওয়া হবে।

তবে ব্যাংকে তাঁর ঠিক কত টাকা ছিল, তা কাউকে জানিয়ে যাননি সাইদুর রহমান। তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সাংবাদিকের ভাষ্য, ব্যাংকে অন্তত দুই কোটি টাকা ছিল। মৃত্যুর আগে সম্প্রতি তিনি সেখান থেকে প্রায় ১৭ লাখ টাকা তুলেছিলেন। ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আফরোজী রহমান খেলনাও ১৭ লাখ টাকা তোলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে বর্তমানে ব্যাংকে কত টাকা রয়েছে, তা তিনি জানাতে পারেননি।

ভাইয়ের রেখে যাওয়া সম্পদের চেয়ে তাঁর রেখে যাওয়া ইচ্ছাটিকেই বড় করে দেখছেন আফরোজী রহমান খেলনা। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই সারাজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। রাজশাহী প্রেসক্লাবকেই তিনি নিজের ঘরবাড়ি ভেবেছেন। সেখান থেকে বহু মানুষের উপকার করেছেন। মৃত্যুর আগেও তিনি মানুষের কল্যাণে সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে গেছেন।’ ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তানঃ সাইদুর রহমান ছিলেন রাজশাহীর একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি। তাঁর বাবা ছিলেন রাজশাহীর সাবেক গভর্নর ও প্রখ্যাত আইনজীবী আতাউর রহমান। মা ভাষাসৈনিক মনোয়ারা রহমান। তাঁর নানা ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী মাদার বখশ।

সাইদুর রহমানের জীবনের শেষ সিদ্ধান্তটি যেন তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনেরই প্রতিচ্ছবি। নিজের জন্য জমিয়ে রাখা সম্পদ ভোগ না করে তা রেখে গেছেন মানুষের জন্য। তাঁর মৃত্যুর পর সেই সম্পদ উত্তরাধিকারীদের কাছে নয়, যাবে অসহায় মানুষের কল্যাণে যে মানুষের কথা তিনি সারাজীবন তাঁর সাংবাদিকতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তুলে ধরেছেন।

১৯৯৭ সালের মার্চ মাসের দিকে সাইদুর ভাইয়ের সাথে প্রথম পরিচয় হয়। আমি তখন সাপ্তাহিক রাজশাহী বার্তার সাংবাদিক নিয়মিত আমার লেখা প্রকাশিত হয়। একদিকে রাজশাহী প্রেসক্লাব, অন্যদিকে বাজশাহী বার্তার অফিস। পত্রিকা অফিসের পাশের ইউনিটেই থাকতেন সাংবাদিক সাইদুর রহমান। সপ্তাহের প্রায় ৪/৫ দিন রাজশাহীতে যেতাম সাংবাদিকতার নেশায়, কারণ এটা ছিল আমার দ্বিতীয় পেশা।রাজশাহী বার্তার কাজ শেষে সাইদুর ভাইয়ের সাথে সময় কাটানো হতো তার পরামার্শে কিছুদিন দৈনিক ভোরের কাগজের গোদাগাড়ী সংবাদদাতা হিসেবে কাজও করেছিলাম। এখন আমি দৈনিক ইনকিলবের সাথে যুক্ত। সেই থেকেই তাঁকে খুব কাজ থেকে দেখেছি। প্রথম আলো পত্রিকা বাজার আসছে এমন খবর সাইদুর ভাই আমাকে জানালেন। কি করবো আমাকে ডাকছেন শেষ পর্যন্ত সাইদুর ভাই প্রথম আলো পত্রিকায় গেলেন না। ভোরের কাগজে থেকে গেছেন মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত। কাছ থেকে দেখা, তাঁর সম্পর্কে জানা ও সাংবাদিকতার জগতে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে অনেক ধারণা পাই। একদিন শনিবার সকাল সকাল সাইদুর ভাইয়ের প্রেসক্লাবে গিয়ে দেখি সাইদুর ভাই সোফাসেট বসে রাজশাহীর জেলা প্রশাসককে সম্ভাবত কাজী ফরিদ সাহেবকে টেলিফোন করছেন ( তখন মোবাইল ছিল না) কয়েকবার রিং করার পর ডিসি সাহেব টেলিফোন ধরেছেন। সাইদুর ভাই বলেছিলেন, ডিসি সাহেব বিডিয়ার যে ৩৫ গরু ধরে উৎকোচের বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন সেটি আমি নিউজ করেছি ব্যাক পেজে ছবিসহ ছেঁপেছে। একটু দেখবেন ওপর থেকে উত্তর আসলো সংশ্লষ্ট বিডিয়ার (বিজিবি) জোয়ানদের ক্লোজড করা হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর সিও সাহেব টেলিফোন করে সাইদুর ভাই নিউজের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে এককই সংবাদ দিলেছিলেন। এই ছিল সাংবাদিক সাইদুর ভাইয়ের লেখুনীর পাওয়ার। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। সর্বশেষ তিনি দৈনিক ভোরের কাগজ-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রায় চার দশকের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি রাজশাহীর সংবাদজগতের নানা পরিবর্তন, উত্থান-পতন এবং রূপান্তরের সাক্ষী হয়েছেন। তাঁর সাংবাদিকতায় আসার সময়টি ছিল আজকের মত ছিল না সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সময়। তখন হাতে হাতে মোবাইল, স্মার্টফোন ছিল না, সামাজিক ফেসবুক, ম্যাসেজ, what’ ap, viver, e-mail, যোগাযোগমাধ্যম ছিল না, ছিল না অনলাইন নিউজ পোর্টালের এই বিস্তৃত জগৎ। একটি সংবাদ সংগ্রহ করতে সাংবাদিককে ছুটতে হতো ঘটনাস্থলে, কথা বলতে হতো বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে, তথ্য যাচাই করতে হতো একাধিক সূত্র থেকে। একটি খবর প্রকাশের পেছনে দিতে হতো সময় ও শ্রম। সেই প্রজন্মের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল- দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতা এবং প্রচারের চেয়ে দায়িত্ববোধ গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ পাঠানোর মাধ্যম ছিল টেলিফোন ও Fax এর মাধ্যমে, আর মফস্বল পেজের জন্য নিউ লিখে ছবি ওয়াস করে পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে ডাক যোগে কিংবা বিমানে। তার পরে ও তিনি সাংবাদিকতায় অবিচল। তিনি নীতির কোন দিন আপোষ করেননি।
সাইদুর রহমান শুধু নিজে সাংবাদিকতা করেননি, নতুন সাংবাদিক তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর হাত ধরে অনেক তরুণ সাংবাদিক এই পেশায় এসেছেন, পেশাগতভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং পরবর্তীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। তাকে অনুকরণ অনুস্মরণ করে অনেকে আজ প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক। একজন সহকর্মী হিসেবে এখানেই তাঁর বড় একটি অবদান রয়েছে।

রাজশাহী প্রেসক্লাবের সঙ্গেও তাঁর নিবীর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। ২০১৮-২০২০ মেয়াদের নির্বাচনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে দীর্ঘ সময় তিনি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রেসক্লাবের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলি। সাংবাদিকতার বাইরেও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়াত সাংবাদিকদের সন্তানদের শিক্ষা সহায়তার মতো উদ্যোগেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
সাইদুর রহমানের পারিবারিক পরিচয়ও রাজশাহীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

প্রায় চার দশক ধরে তিনি রাজশাহীর সংবাদজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি যেমন সময়ের পরিবর্তন দেখেছেন, তেমনি দেখেছেন সাংবাদিকতার ধরন বদলে যেতে। ছাপা সংবাদপত্রের সেই সময় থেকে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর বর্তমান সাংবাদিকতা -এই দীর্ঘ পথের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন তিনি।

নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের হাতে আজ প্রযুক্তির সুযোগ অনেক বেশি। মুহূর্তেই সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তথ্য সংগ্রহ করা যায়, পাঠকের কাছে পৌঁছানো যায়। কিন্তু প্রযুক্তির এই সুবিধার সঙ্গে সাংবাদিকতার দায়িত্বও বেড়েছে। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় তথ্য যাচাই, মাঠপর্যায়ে যাওয়া, মানুষের কথা শোনা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়গুলো যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়। সাইদুর রহমানদের প্রজন্মের সাংবাদিকতা থেকে নতুনদের জন্য এটাই হতে পারে অন্যতম বড় শিক্ষা।

সাংবাদিকদের বলা হয় সমাজের ‘ওয়াচ ডগ’। অতন্ত্র প্রহরী। বিগত দিনে কিছু সাংবাদিকদের ওয়াচ ডগের পরিবর্তে প্যাট ডট বা ম্যাব ডগে পরিণত হয়েছিলেন। নির্বাচনে মানুষ খুন হয়েছে, গুম হয়েছে, ভিন্নমতের লোকদের ধরে নিয়ে ক্রসফায়ার দিয়েছে, নীরব থাকতো সাংবাদিকরা। উপরন্তু টকশোতে গিয়ে এসব মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গাইত। কিন্তু সাইদুর ভাই ছিলেন সবসময়
ওয়াচ ডগ’। অতন্ত্র প্রহরী।

সাংবাদিকতার তিনটি বড় শর্ত হচ্ছে সততা, নির্ভুলতা, পক্ষপাতহীনতা। সততা মানে সততার সঙ্গে সাংবাদিকতা চর্চা করতে হবে। নির্ভুলতা মানে যে তথ্য দিচ্ছেন সেটি সঠিক হতে হবে। ন্যায্যতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পক্ষপাতমুক্ত হতে হবে। প্রয়াত সাংবাদিক সাইদুর ভাইয়ের মাঝ সব গুনই ছিল তাই তিনি আজ মরেও অমর। তাকে অনুস্মরণ করে আমাদের নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকগণকে এগিয়ে যেতে হবেই। সে সাথে তার কোটি কোটি টাকার সম্পদ দান করা জননেতা আতাউর রহমান ট্রাস্টকে সবাইকে এগিয়ে নিতে হবে তা হলে সাইদুর ভাইয়ের আত্না শান্তি পাবে।

লেখক : মোঃ হায়দার আলী।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved.©natunbazar24.com
Developed by: A TO Z IT HOST
Tuhin