
রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলীঃ ইলিশের ভরা মৌসুমেও পদ্মা নদীতে কাঙ্খিত ইলিশের দেখা মিলছে না। রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জেলেদের জালে আগের তুলনায় ইলিশের পরিমাণ কমে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় কমে গেছে ইলিশের বিচরণ ও আহরণ। ইলিশ শিকারের নেশায় পদ্মায় দিন-রাত চষে বেড়াচ্ছেন জেলেরা। এ সময়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ার কথা থাকলেও কাঙ্খিত ইলিশের দেখা না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন জেলার কয়েক হাজার জেলে। এতে বিপাকে পড়েছেন জেলে, নৌযান চালক এবং নদীপাড়ের মানুষ।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মার মাঝপথে গত তিন বছর থেকে বেশ কিছু স্থানে চর জেগে উঠেছে।
এতে নতুন চ্যানেল তৈরি হওয়ায় নদীর মূল প্রবাহ অনেকটা সরে গেছে। নদীর তলদেশে পলি জমে থাকায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণেও প্রভাব পড়েছে। আগে যেই অংশে জাল ফেললেই ইলিশ মিলত। এখন নদীর স্রোত ও গভীরতা বদলে যাওয়ায় মাছের চলাচলের পথও পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে আগের তুলনায় আহরণ কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
তবে পদ্মা নদীতে জেলের জালে ধরা পরছে ঝাঁকে ঝাঁকে বড়, বড়, বাঘাইড়, পাঙ্গাস, রুই, বোয়াল, চিতল, কাতল মাছ। বিগত বছরের তুলনায় এই বছর নদীতে এ সময় অনেক বেশি ধরা পড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গোদাগাড়ী উপজেলার রেলওয়ে বাজার মাছের আড়তে সামান্য কিছু জাটকা ধরা পড়েছে। বড় ও মাধ্যম সাইজের ইলিশের কোন দেখা পাচ্ছেন না জেলেরা। তবে আড়তে জেলেরা বেলে, পাবদা, খরি, পিয়ালি, বাঁশপাতা, চিংড়ী, ভোলা মহালা, বড়, বড়, চিতল আঁড়, বাঘাইড়, বুয়াল, রিঠা, পাঙ্গাস, রুই, বোয়াল, কাতলসহ নানা প্রজাতির নদীর মাছ বিক্রি হচ্ছে। নদীধার ও মৎস্য আড়ৎগুলিতে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে বাঘাইড় পাঙ্গাস, রুই কাতল, চিতল রেখে দিয়েছে জেলেরা। পরে সেই মাছগুলো আড়তের মালিকরা পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন। এছাড়াও দাম কম হওয়ায় দূরদূরান্ত হতে অনেক ক্রেতাও বাঘাইড়, চিতল, পাঙ্গাস মাছ ক্রয় করছেন। একেকটা পাঙ্গাস মাছের ওজন ১০-১৮ কেজি এবং বাঘাইড় মাছ ৫ কেজি হতে ২৫ কেজি। দেখা গেছে প্রতি কেজি পাঙ্গাসের মূল্য পরে প্রায় ৬৫০-১৩শ টাকা, বাঘাইড় প্রতিকেজি ৬শ থেকে ১১শ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
গত ২ বছর আগে গোদাগাড়ীতে পদ্মায় ধরা পড়েছিল ৭১ কেজি ওজনের বিশাল আকৃতির বাঘাইড় মাছ। গোদাগাড়ীর হরিশংকরপুর ঘাটে জেলে হবি, দুরুল, মান্নান ও খোশ মোহাম্মদ এর জালে ধরা পড়েছিল বিশালাকৃতির এই বাঘাইড় মাছটি । এটি এলাকায় গত কয়েক বছরে এটি সর্বোচ্চ ওজনের মাছ। ৭১ কেজি ওজনের মাছটি ৯৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রয় করা হয়। মাছটি বিক্রি করেছিল জেলেরা পেয়েছিলেন ৬৮ হাজার ৮৭০ টাকা। মাছটি ধরতে পেলে জেলেরা দারুন খুশি হয়েছিল। এবারও ধরা বড় বড় মাছ ধরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রেলওয়ে বাজার মৎস্য আড়তে মাছ বিক্রি করতে আসা জেলে কামাল হোসেন জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার এসময়ে নদীতে বেশি বেশি বাঘাইড়, পাঙ্গাস, রুই, কাতল, পিয়লী, চিতল, বাচা, মাছ ধরা পড়ছে। প্রত্যেক দিন সবাই মাছ পাচ্ছে, দামও ভাল পাওয়া যাচ্ছে।
এছাড়া রেলওয়ে বাজার মৎস্য আড়তদারদের সাথে এ বিষয়ে কথা হলে তারা জানান, জাটকা ইলিশের মতো যদি সরকার পাঙ্গাসের বাচ্চা বিক্রি বন্ধ করে তাবে ভবিষ্যতে আরো অনেক পাঙ্গাসের দেখা মিলবে।
এ প্রসঙ্গে গোদাগাড়ীর সিনিয়র মৎস্যজীবী বেলাল হোসেন জানান, গোদাগাড়ীর রেলবাজার হতে সুতানগঞ্জ পর্যন্ত মাটিতে কাঙ্গর জাতীয় খাবারের প্রাচুর্যতা থাকাই এসব মাঝের দেখা মিলছে এবং এসব অঞ্চলকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে মনে করছে। এগুলি সংরক্ষণ করা হলে, মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। রেলবাজার মাছের আড়ৎ গুলিতে চলছে জমজমাটভাবে মাছের ব্যবসা। কাঁক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে এ আড়ৎ গুলি। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদীতে মাছ কমে গেছে।
পুরানো দিনের সেই এক সময়ের চিরচেনা পদ্মায় যখন জেলেরা মাছ ধরে আনন্দ করত আর সুখে রুজি রোজগার করত এখন সেই অবস্থা বিরাজ করছে না।
গোদাগাড়ীর রেলবাজরের আড়ৎদার নূর জামান বলেন, সর্বনিন্ম ৫ কেজি ওজন হতে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৫ কেজি পর্যন্ত ওজনের বাঘাইড় ও ২০ কেজি ওজনের পাঙ্গাস মাছ ধরা পড়ছে জেলেদের জালে। এছাড়াও বড় বড়, বোয়াল, রুই, কাতল মাছ ধরা পড়ছে। ২২ কেজি ওজনের কাতল মাছ ১২২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গত ২ হতে ৩ বছর হতে এই মৌসুমে পদ্মায় হঠাৎ পাঙ্গাস ও বাঘাইর মাছের আবির্ভাবে পদ্মা পাড়ের বাসিন্দাদের মাঝেও চোখে মুখে আনন্দ দেখা দিয়েছিল কিন্তু এখন সে অবস্থা নেই। তারা বলছে অনেক দিন পর অন্তত বড় বড় মাছ আমরা দেখতে ও কিনে খেতে পাচ্ছি। মাছ ব্যবসায়ী দয়াল বলেন, এমন বড় বড় মাছে ক্রয় করে রাজশাহী, বগুড়াসহ অন্য বাজারে নিয়ে বিক্রি করে ভালই হচ্ছে।
এই বছর পদ্মা নদীতে বড় বড় বাঘাইর ও পাঙ্গাস মাছের আবির্ভাব হওয়ার কারন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলেরা বলেন, পদ্মানদীতে এই সময় বেশী পানি থাকে। পানির গভীরতার জন্য এসব মাছ এই অঞ্চলে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে এসেছে তাই এসব মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে পাওয়া যাচ্ছে। সারারাত দিন কর্ডের ফাঁস জাল দিয়ে এসব মাছে পাওয়া যাচ্ছে বলে জেলেরা জানান। তারা আরও বলেন, প্রচুর পরিমানে বাঘাইর ও পাঙ্গাস ধরা পড়ায় মাছ বিক্রি করে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে।
রেল বাজারের মাছের আড়তে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মাছ ক্রয় করতে আসা মাছ ব্যবসায়ী নূর সুলতান বলেন, এখানে মাছের দাম বেশী। তবে মাছ সাইজ ভাল।
বষস্ক আড়ৎদার আনারুল বিশ্বাস জানান, প্রতিবছর অক্টোবর যে, ২২ দিন মা ইলিশ সংরক্ষন অভিযান পরিচালনা করা হয় তারই ফলশ্রুতিতে পাঙ্গাস, বাঘাইড়, রুই, কাতল, পাবতা, বাসপাতা, চিতল,বাচাসহ অন্যান্য মাছের অধিক্য বেড়ে যায়। এ বছরও গোদাগাড়ীর পদ্মা নদীতে বাঘাইড়,পাঙ্গাসসহ অন্যান্য মাছ বেশী পাওয়া যাচ্ছে।
মোঃ হায়দার আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক,
রাজশাহী।