
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহীঃ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাট দরগাপাড়ায় বাল্যবিবাহের প্রস্তুতির খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) পরিচালিত এ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বাল্যবিবাহ বন্ধের পাশাপাশি আয়োজনকারীদের বিরুদ্ধে মোট ৩৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান।
প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, কাঁকনহাট দরগাপাড়া এলাকায় অপ্রাপ্তবয়স্ক এক কিশোরীর বিয়ের আয়োজন চলছে—এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিকেলে সেখানে উপস্থিত হয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে আয়োজকদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। তারা প্রাপ্তবয়স্ক বলে অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু পরে বয়স যাচাই করে বাল্যবিবাহের সত্যতা পাওয়ায় অনুষ্ঠানটি তাৎক্ষণিকভাবে পণ্ড করে দেওয়া হয়।
অভিযানে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর ৭ ও ৯ ধারার বিধান লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মোট ২টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় কোনো কারাদণ্ড দেওয়া না হলেও অপরাধ স্বীকার করায় মোট ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। একই সঙ্গে মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দেওয়া হবে না মর্মে অভিভাবকদের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান জানান, বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক অপরাধ ও আইনত দণ্ডনীয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় প্রশাসনের এ ধরনের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। সচেতন নাগরিক হিসেবে কোথাও বাল্যবিবাহের খবর পেলে প্রশাসনকে দ্রুত অবহিত করার আহ্বান জানান তিনি।
সম্পতি গোদাগাড়ীতে ৬ষ্ঠ শ্রণির ছাত্রীর বাল্য বিয়ে বন্ধ করে প্রশাংসায় ভাসছেন উপজেলা নির্বাহী নির্বাহী আফিসার ইসরাত জাহান। গভীর রাতে গোদাগাড়ী পৌরসভার ডাঙ্গাপাড়া মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার দিন বর সাকিব আলী, লোকজন নিয়ে গভীর রাতে গোদাগাড়ীর ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে আকতার হোসেনের বাড়ীতে ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ুয়া কনে আরিফা খাতুনকে বিয়ে করতে যান। বিয়ের জন্য রান্নার সকল প্রক্রিয়া শেষ হয়। এ সময় গোপন সংবাদের ভিক্তিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান কনের বাড়ীতে উপস্থিত হন এবং এ সময় বরসহ বরযাত্রী বাড়ীর পেছন দরজা দিয়ে পালিয়ে যান। বর সকিব আলীর পিতার নাম রবিউল ইসলাম, বাড়ী পৌরসভা এলাকার রেলবাজার এলাকায়।
আরিফা খাতুন উপজেলার মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী, বয়স ১২ বছর । আর বর সাকিবের বয়স ১৬ বছর সে গোদাগাড়ী সরকারী স্কুল এন্ড কলেজ থেকে টেষ্ট পরীক্ষা দিয়ে ৬ বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় এসএসি পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি পান নি।
কনের মা মোসাঃ মহাসিনা খাতুন জানান, যুগের অবস্থা ভাল নয়। মেয়ে নিয়ে চিন্তায় থাকি। তাই রাতে বিয়ের আয়োজন করেছিলাম। ইউএনও স্যার এসে প্রথমে আমাদেরকে ধরে নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। অনেক অনুরোধ করে ১৮ বছরের আগে বিয়ে না দেয়া শর্তে মুচলেকা লিখে দেয়া শর্তে ছাড়া পান। আমার স্বামী ও মেয়ে বিয়েতে রাজী ছিলেন না। কিন্তু আমি ভুল করে রাজমিস্ত্রির যোগালি, টেষ্টে ৬ বিষয়ে ফেল করা ছেলে সাথে বিয়ে দিচ্ছিলাম। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। চোখ এখন খুলে গেছে, আর বিয়ে দিব না, মেয়েকে চাকুরী করাবো, তারপর বিয়ের চিন্তা করবো। স্যার আমাদের বুঝিয়ে রাত সাড়ে ১২ টায় বাড়ী থেকে যান। খাবার নষ্ট হয়েছে, তাতে দুঃখ নেই, মেয়ের বাল্যবিয়ে দেয়া হয় নি এতে আমরা খুশি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান বলেন, গোদাগাড়ীতে ৫ম. ৬ষ্ঠ শ্রেণির বিয়ে হয়, এটা খুবই দুঃখজনক। আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ুয়া আরিফা খাতুনের বিয়ে বন্ধ করেছি। তাদের একটা সুযোগ দিয়েছি। ভবিষ্যতে ১৮বছরের আগে আর বিয়ে দিবেন না বলে আমাদের নিকট অঙ্গিকার করেছে। রাষ্ট্রের নির্দেশনা মোতাবেক বাল্যবিয়ে দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অভিভাবক, কাজি, ইমাম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সমাজের নেতা, জনপ্রতিনিধি সাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের স্বার্থে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কোথায় বাল্যবিয়ে, মাদক, সার সংকট ও কেলেঙ্কারির অভিযোগ থাকলে আমাকে এ মোবাইল নাম্বারে ০১৭৬১৪৯১২২১ জানাবেন আমরা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিব।
মোঃ হায়দার আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক,
রাজশাহী।