
রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলীঃ ৫ সেপ্টেম্বর, শনিবার মাগরিবের পর মদিনায় কিং ফাহাদ হাসপাতালে ড. শাইখ মুস্তাফিজুর রহমান মাদানী ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
গতকাল শনিবার হঠাৎ করেই মোস্তাফিজ রহমান অসুস্থতা হন । অনেকে ধারনা করেছিলেন আল্লাহর রহমতে তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে তিনি সবাইকে আশাহত করে অবশেষে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। আল্লাহ তার ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে জান্নাত নসীব করুন।
তিনি রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ির মহিশালবাড়ী মহল্লার মোঃ আব্দুল মান্নান মিস্ত্রীর সন্তান। ছোট বেলাতেই তিনি মায়ের স্নেহ বঞ্চিত হন। আর আজ তিনি তার ছোট তিন মাসুম বাচ্চাকে এতীম করে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিলেন! আল্লাহ তাকে জান্নাতের মেহমান বানিয়ে নাও! আল্লাহ তার পরিবারকে সবরে জামিল দান করো।
তিনি কর্মজীবনে নানা প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। মাদ্রাসা মাহমাদিয়া আরাবিয়ার
যাত্রাবাড়ী ঢাকার অধ্যক্ষ শাইখ মোস্তফা বাহারুদ্দীন কাসেমী হাফিযাহুল্লাহ এর জামাতা, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বাংলাদেশী ছাত্রপ্রতিনিধি ও হাদীস ডিপার্টমেন্টে মেধার স্বাক্ষর রাখা পিএইচডি গবেষক, মাসজিদে নববীর সম্মানিত অনুবাদক, শাইখ মোস্তাফিজুর রহমান মাদানী রাহিমাহুল্লাহ।
শায়েখ মোস্তাফিজুর রহমানের ইন্তেকালে
বঞ্চিত হলো এলাকাবাসী , বঞ্চিত হলো দেশ জাতি!❞
তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধার অধিকারী। যাত্রাবাড়ি মাদরাসাতে ক্লাশে তিনি বরাবরই মেধাতালিকায় প্রথম ছিলেন। খুব সম্ভবত সানাবিয়া ৩ য় বর্ষে তিনি সকল ক্লাশের টপারদেরকে টপকে পুরো মাদরাসার মাঝে সর্বোচ্চ মার্ক অর্জনকারী হন। যা সে সময়ে অনেক কঠিন ছিলো। তৎকালীন জমঈয়ত সভাপতি প্রফেসর শামসুল আলমের হাত থেকে নগ অর্থ পুরস্কার হিসেবে গ্রহণ করেন।
দাখিন ও আলিম পরিক্ষায় তিনি মেধার সাক্ষর রাখেন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে দু’টি বোর্ড পরিক্ষাতেই A+ মার্ক পেয়ে উত্তীর্ণ হন। তিনার সেকেন্ড চয়েস ছিলো ডাক্টার হওয়া। সে লক্ষ্যে তিনি মেডিকেলে কোচিং ও শুরু করেছিলেন। তবে আল্লাহর অনুগ্রহে মদিনাতে চান্স পাওয়ায় তিনি মদিনাতুর রাসূলকেই বেছে নেন। সে ভালোবাসার প্রতিদানে তিনি আজ মদিনার মাটিতেই শায়িত হবেন।
মদিনাতে গিয়ে কুল্লিয়াতুল হাদিসে ভর্তি হন। সেখানে বেশ ভালো ফলাফল অর্জন করেন। কঠোর শিক্ষকদের (রুশাইদান, গামেদী, ওমর সুফিয়ানী) কাছে ক্লাশ করার পরেও তার পুরো অনার্সের সিজিপিএ যথাসম্ভব ৪.৯৫ -৯৬ ছিলো। যা কুল্লিয়াতু হাদিসে আমাদের সময়ের বাংলাদেশী ছাত্রদের বেষ্ট রেজাল্ট।
প্রত্যাশা মতো তিনি মাস্টার্সে চান্স পান উলুমুল হাদিস ডিপার্টমেন্টে। সেখানেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে মুমতায মা মারতাবতিশ শরাফ আল-উলা পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পিএইচডির পরিক্ষাতে উত্তীর্ণ হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন লেখাপড়ার সর্বশেষ স্তরে। এটি তার শেষ বর্ষ ছিলো। থিসিসের কাজও মোমুটি এগিয়ে চলছিলো…. তার মাঝে এই শোক সংবাদটি শুনতে হলো! দেশবাসীকে
কর্ম জীবনঃ
মাদরাসা মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া থেকে লেখা-পড়া শেষ করে কয়েক মাস সেখানেই শিক্ষকতা করেন। সৌদিতে বিভিন্ন দাওয়া সেন্টারে খন্ডকালীন দায়ী হিসেবে প্রবাসীদের মাঝে দাওয়াতী কাজ করেন।
গত ২০১৩ সালে বাংলাদেশ কন্স্যুলেট জেনারেল জেদ্দাতে অস্থায়ী এল. এ. হিসেবে তিন মাস কর্মরত ছিলেন। মদিনার মাকতাব তাআউনির দায়ী হিসেবে দীর্ঘদিন দাওয়াতী কর্মতৎপরতা চালান। মসজিদে নববীতে বাব মক্কার দায়ী হিসেবে হাজীদের মাঝে দাওয়াতী কাজ পরিচলানা করেন। মদিনাস্থ বাংলাদেশ হজ মিশনে তিন হজ মৌসুমে হাজীদের সেবা দান। ইসলাম হাউজ ডটকমের অধীনে অনুবাদক ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। মসজিদে নববীর অনুবাদ বিভাগের অধীনে মসজিদে নববীর খুতবার অনুবাদ ও পুস্তক-পুস্তিকার অনুবাদ করেন। সর্বশেষ কিং ফাহাদ কুরআন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতো আরেকটি প্রতিষ্ঠান কিং সালমান হাদিস গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এখানে একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর রেখে টিকে ছিলেন।
নেতৃত্বঃ
নেতৃত্বের প্রতি তীব্র অনীহা সত্ত্বেও তিনি একবার
বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদিস, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়াও মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশী ছাত্রদের মানদুব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি মূলত কিং সালমান হাদিস গবেষণা প্রতিষ্ঠানে হাদিস এর তাখীরজ (হাদিসের সহীহ যয়ীফ মান নির্ণয়) নিয়ে কর্মরত ছিলেন। তাকে হারানোর মাধ্যমে আমরা তার অর্জিত জ্ঞানের সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হলাম। যে বিষয় নিয়ে পড়ছেন সে বিষয় নিয়ে পেশাদারমূলক কাজ করার সৌভাগ্য কয়জনের কপালে জোটে! তিনি ছিলেন সেই সৌভাগ্যবানদের একজন। তার অকাল মৃত্যুতে গোদাগাড়ীবাসী, তথা দেশবাসী একজন ইসলামী গবেষককে হরালেন তার স্থান পূরণ হবার নয়।
মুরহুমের গায়েবানা জানাজার নামাজ বাদ আসর বিকাল ৪ টার সময় উপজেলার মহিশালবাড়ী কেন্দীয় জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত জানাজায় সকলকে উপস্থিত থাকার জন্য শোকার্ত পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষাবৃন্দ।
মোঃ হায়দার আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক,
রাজশাহী।।