
রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলীঃ বাংলার পূঞ্জিকা অনুযায়ী দেশে আমের মৌসুম শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেন। কিন্তু মৌসুম শেষে বরেন্দ্র অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। এখানে এখনো গাছে গাছে ঝুলছে সুস্বাদু কাটিমন নানা প্রজাতির আম, যেন নতুন করে শুরু হচ্ছে আমের মৌসুম।
গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার মরিয়ম আহম্মেদের মতে, গোড়মতি, ইলামতি, ঝিনুক, আশিনা বেনানা আম। কাটিমন বা সুইট কাটিমন হলো থাইল্যান্ড থেকে আনা একটি প্রজাতি। দেশীয় জাতের বাইরে সারাবছর চাষ করা যায় বলে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অনেক। মৌসুমের বাইরেও বাজারে এই আমের চাহিদা থাকে, ফলে দামও ভালো। চাষিরা বছরে দু’বার আম সংগ্রহ করতে পারেন। এজন্যই দিন দিন বাড়ছে কাটিমন চাষে আগ্রহ।
সরেজমিনে বাগান বৃহস্পতি বার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, গোদাগাড়ী বরেন্দ্রভূমিতে এবং তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা থেকে কলমা পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে অসংখ্য কাটিমন আমের বাগান।
বিশেষ করে রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ বিভিন্ন উপজেলা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় শত শত বাগানে জুড়ে ঝুলছে থোকায় থোকায় কাটিমন আম, দেখে মন জুড়িয়ে যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আমনুরা থেকে নাচোল-আড্ডা, নওগাঁর পোরশা-নিয়ামতপুর সড়ক কিংবা নাচোল উপজেলার লক্ষিপুর মোড়ের একটি বাগানে দেখা যায়—ছোট ছোট গাছে ঝুলছে টসটসে আম, যা পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ছে।
কয়েকজন আম চাষী জানান, খিরসাপাত আম গাছে মৌসুমে যখন মুকুল আসে তখন যদি ভেঙ্গে দেয়া হয় তবে পরবর্তীতে আবার মুকুল আসে তখন কয়েক মাস দেরীতে আমগুলি পরিপক্ক হয়। যেখানে মৌসুমে এ আম ২ হাজার টাকা মন নিতে চায় না ব্যবসায়ীগন। আর এ সময়ে দেরীতে খিরসাপাট আম ২৫/২৭ হাজার টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। অসময়ে মানুষ খিরসাপাত আমের স্বাদ নিতে প্রতিযোগিতায় নামছেন ক্রেতা সাধারণ।
গোদাগাড়ী উপজেলার বিশ্বনাথপুর বাজার এলাকার বাগানের মালিক কৃষক মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, কাটিমন পাঁকা আম সুমিষ্টি, আঁটি ছোট, কোন শ্বাস নেই, চাহিদা বেশী, খাওয়ার সময় চিনির মতো মিষ্টি। আমার ৫০ বিঘা মিশ্র বাগানের কাটিমন আম, গৌড়মতি, ইলামতি আছে গত কয়েক বছর থেকে এ জতের আম চাষ করচ্ছি ফলন ফলন কম হলেও দাম পাওয়ায় আমি দারুন খুশি। তিনি বলেন, আমার মিশ্র বাগানে বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা, কর্মচারী, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, মন্ত্রী, এমপি, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, কৃষক বিভিন্ন পেশার মানুষ এসেছেন। তারা বাগানে এসে প্রশাংসা করেছেন। আনন্দ উপভোগ করেন।
তিনি আরও বলেন বাজারে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি আম ২০০–৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বছরে দু’বার আম সংগ্রহ করে তিনি কয়েক লাখ টাকা আয় করছেন।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার কৃষক তাবারক হোসেন জানান, আগে তিনি দেশি জাতের আম (গোপাল ভোগ, নেংড়া, ঘিরসা) চাষ করতেন। কিন্তু খরচের তুলনায় লাভ না হওয়ায় সেগুলো কেটে এখন ২৫ বিঘা জমিতে প্রায় আড়াই হাজার কাটিমন গাছ করেছেন। চলতি বছরই তিনি ভালো ফলনের আশা করছেন।
গোদাগাড়ী পৌরসভার মহিশালবাড়ী বাজরের আম বিক্রেতা সুমন আলী বলেন, খিরসা, গোপালভোগ, ল্যাংগা আম ২৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি বিক্রি করতে পরিনি। লাভ তো করতে পারিনি প্রায় ক্ষতি হয়েছে। থাই জাতের কাটিমন আমা সুমিষ্ট, সুস্বাদু, শ্বাস নেই, চোকা পাতলা চাহিদা খুব বেশী। ২৫০ থেকে ৩৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আমের মৌসুমের শেষ হওয়ার পর কাটিমন আমের মৌসুম শুরু হয়। তাই দাম বেশী হলেও সবাই এ আমের স্বাদ পেতে চাই।
উপ-সহকারী কৃষিকর্মকর্তা অতনু সরকার বলেন, খিরসাপাত আম আমাদের দেশের একটি জনপ্রিয় ও সুস্বাদু আমের জাত। সঠিক প্রযুক্তি ও পরিচর্যা অনুসরণ করে খিরসাপাত আমের লেইটে চাষ করলে ভালো ফলন ও আশানুরূপ ফল পাওয়া সম্ভব। লেইটে চাষের ক্ষেত্রে উন্নতমানের চারা নির্বাচন, উপযুক্ত জমি ও সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সুষম সার প্রয়োগ, প্রয়োজনীয় সেচ এবং রোগ-পোকামাকড় দমন নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি অনুসরণ করে খিরসাপাত আমের লেইটে চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং আম উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। তিনি আরও বলেন, সুইট কাটিমন আম (Sweet Katimon) মূলত একটি থাই বারোমাসি আমের জাত, সারা বছর পাওয়া যায় । এই আম আমগুলো অত্যন্ত মিষ্টি, আঁশহীন, এবং এর আটি বেশ পাতলা হয়। এছাড়া গাছ ছোট থাকায় ছাঁদবাগান বা টবেও এটি সহজে চাষ করা যায়। ফলের বৈশিষ্ট্যস্বাদ ও ঘ্রাণ: আমগুলো ভীষণ মিষ্টি ও রসালো, এবং কাঁচা অবস্থায়ও এতে কোনো টক ভাব থাকে না বা মিষ্টি লাগে। এর চমৎকার একটি সুগন্ধ রয়েছে। আমের আঁটি বা বিচি খুবই পাতলা।
বরেন্দ্র অঞ্চলের গ্রামীণ সড়ক দিয়ে যেকোনো পথচারী গেলেই দেখতে পাবেন আমে ভরা ছোট-বড় বাগান। মৌসুম শেষে
হলেও গাছে ঝুলন্ত কাটিমন, এখন লোভনীয় সুস্বাদু খিরসাপাত, কাটিমন আম বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। ওই সব আম মনে করিয়ে দিচ্ছে—বরেন্দ্রে যেন বারোমাসই আমের উৎসব।
মোঃ হায়দার আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক,
রাজশাহী।