
আজিজুল ইসলামঃ বেনাপোল কাস্টমস হাউসের নিলাম শাখার গুদাম থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডারে পাঠানোর নামে কোটি টাকার মালামাল পাচারের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (২২ জুন) গভীর রাতে বেনাপোল বাজারে একটি কাভার্ড ভ্যানে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ শাড়ি ও কসমেটিকসসহ চোরাচালানি পণ্য জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
এ ঘটনায় কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জীসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি ত্রাণের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চোরাচালানি পণ্য পাচার করে আসছিল একটি চক্র।
কাস্টমস সূত্র জানায়, গত ২১ মে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের নিলাম শাখা থেকে ৩ হাজার ২২ পিস শাড়ি, ৫৮ পিস থ্রি-পিস, ২০৮ পিস চাদর, ২৬৩ পিস কম্বল এবং ৮ পিস ওড়না ঢাকার কেন্দ্রীয় ত্রাণ ভাণ্ডারে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সংক্রান্ত একটি চিঠিতে সহকারী কাস্টমস কমিশনারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন মো. রাহাত হোসেন। এই পণ্যগুলো পাঠানোর মূল দায়িত্বে ছিলেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ত্রাণের আড়ালে কাস্টমসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা গভীর রাতে অতিরিক্ত চোরাচালানি পণ্য ট্রাকে লোড করে পাচারের চেষ্টা চালান। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার রাত আনুমানিক ৩টার সময় বেনাপোল বাজারের বাহাদুরপুর সড়কের মুখ থেকে ‘ঢাকা মেট্রো-ট-২৪-৫৬২১’ নম্বরের একটি কাভার্ড ভ্যান আটক করে বিজিবি।
তল্লাশিকালে গাড়িটি থেকে কাস্টমসের নথিবহির্ভূত বিপুল পরিমাণ শাড়ি, থ্রি-পিস, চাদর, কম্বল, ওড়না ও কসমেটিকস উদ্ধার করা হয়। এ সময় গাড়িচালক কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। কাস্টমসের ভেতর পণ্য বোঝাই আরও একটি ট্রাক খালাসের অপেক্ষায় থাকলেও প্রথম ট্রাকটি আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে সেটি আর বের হতে দেওয়া হয়নি।
আটককৃতরা হলেন, বেনাপোল কাস্টমস এর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইনদ্রজিৎ মুখার্জী কাভার্ড ভ্যান চালক মহসিন আলী ও হেলপার জাহিদ হাসান।
স্থানীয় ও কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, বেনাপোলে সীমান্ত দিয়ে আসা পাসপোর্টধারী যাত্রী ও চোরাকারবারিদের কাছ থেকে বিজিবি, কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দারা যেসব পণ্য আটক করে কাস্টমস গুদামে জমা রাখেন, পরবর্তীতে সেগুলোই টার্গেট করা হয়। বিভিন্ন সরকারি বা সামাজিক ত্রাণ তহবিলে পণ্য পাঠানোর নাম করে সুকৌশলে কাগজে-কলমে হিসাব মিলিয়ে কোটি কোটি টাকার পণ্য খোলা বাজারে পাচার করে দেয় এই অসাধু চক্রটি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, কাস্টমস হাউসের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য বাইরে আসার ঘটনা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এর পেছনে কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরোক্ষ মদদ রয়েছে। আটক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী এই হাউসে কর্মরত থাকা অবস্থায় শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন বলে কাস্টমস পাড়ায় জোর গুঞ্জন রয়েছে।
বর্তমানে বেনাপোল বিজিবি সদর ক্যাম্পে জব্দকৃত মালামালের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এ সময় বেনাপোল পোর্ট থানা পুলিশের একটি দলও উপস্থিত ছিল। প্রাথমিক তদন্তে নথির চেয়ে অতিরিক্ত ও চোরাই পণ্য পাচারের সত্যতা মিলেছে।
বিজিবি ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কাস্টমসের এই বড় ধরনের জালিয়াতি ও চোরাচালানের ঘটনায় জড়িত অন্য ‘রাঘব-বোয়াল’দের শনাক্ত করতে গভীর তদন্ত শুরু হয়েছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে চোরাচালান বিরোধী আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
উল্লেখ্য, ইতিপূর্বেও বেনাপোল কাস্টমস হাউসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর এই কাস্টমস হাউসের লকার থেকে ১৯ কেজি ৩১৮ গ্রাম স্বর্ণ চুরির ঘটনা ঘটেছিল, যার রহস্য ও হদিস আজ পর্যন্ত মেলেনি।