
আজিজুল ইসলাম,যশোর: যশোরের পুলেরহাটে অবস্থিত আদ্-দ্বীন সখিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। নিহত যুবকের নাম ইমরান হোসেন (২৮)। তিনি যশোরের শার্শা উপজেলার ৮ নং বাগআঁচড়া ইউনিয়নের গাজীপাড়ার শওকত আলী বিশ্বাসের ছেলে।
গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দিবাগত রাত ১১টার দিকে এই মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নিহতের স্বজনদের মধ্যে দফায় দফায় হাতাহাতি ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
পারিবারিক ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, তীব্র জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ইমরানকে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে আদ্-দ্বীন সখিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ভর্তি করে পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে পাঠান। স্বজনদের অভিযোগ, ওই ওয়ার্ডে দায়িত্বরত সহকারী রেজিস্টার ডা. রাহাত ও মেডিকেল অফিসার ডা. মুন্নি কোনো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রোগীকে একের পর এক ইনজেকশন প্রয়োগ করেন।
নিহতের খালাতো ভাই ইসমাইল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, "প্রথম ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই ইমরান তীব্র অস্বস্তি বোধ করছিল। বিষয়টি বারবার চিকিৎসকদের জানানো হলেও তারা কোনো গুরুত্ব দেননি। এরপর আরেকটি ইনজেকশন দেওয়ার সাথে সাথেই ইমরানের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে এবং সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।"
পরবর্তীতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগীকে দ্রুত হাসপাতালের আইসিইউতে (ICU) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে রাত সাড়ে ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ভুল ইনজেকশন ও অবহেলায় ইমরানের মৃত্যু হয়েছে— এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতের স্বজন ও স্থানীয় জনতা হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং দায়ী চিকিৎসকদের শাস্তির দাবিতে স্লোগান দেন। খবর পেয়ে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, এই হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর পাশাপাশি সিজার, অপারেশন ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ইতিপূর্বেও এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য বিভাগে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি বলে তারা জানান।
এ ঘটনায় নিহতের পিতা শওকত আলী বিশ্বাস বাদী হয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ (সাধারণ ডায়েরি) দায়ের করেছেন।
চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন আদ্-দ্বীন সখিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইমদাদ হোসেন। তিনি দাবি করেন, নিয়ম মেনেই রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।
পরিচালক জানান, রোগীকে প্রথমে গ্যাসের ইনজেকশন, অ্যান্টিবায়োটিক ও স্যালাইন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে জীবন রক্ষাকারী শেষ চেষ্টা হিসেবে 'হাইসোমাইড' ইনজেকশন পুশ করা হয়। তিনি আরও বলেন, রোগী জ্বরের হিস্ট্রি নিয়ে ভর্তি হলেও অন্যান্য শারীরিক জটিলতার কারণে মূলত কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে (হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে) মারা গেছেন। ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা জানান, মৌখিকভাবে বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। তবে শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি। আগামী রোববার অফিস খুললে তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুম খান জানান, রাতেই পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হাসপাতাল এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা তদন্ত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।