
রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলীঃ উপজেলাঃ রাজশাহী মহানগরসহ গোদাগাড়ীতে ৬ টি ফিলিং ষ্টোশনে এক মাস পেরিয়ে গেলেও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট কাটেনি। যুদ্ধ বন্ধ হলেও জ্বালানী তেলের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় নি। রাজশাহীর ওই সব বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদের। দিনভর অপেক্ষার পরও অনেকেই ফিরছেন খালি হাতে- বাড়ছে ক্ষোভ ও দুর্ভোগ। রাজশাহী শহরের একজন ব্যবসায়ী রাজিব আহমেদ বলেন, জ্বালানী সংকটের কারণে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন সেক্টরে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কোনো ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহের খবর ছড়িয়ে পড়লেই আগের দিন বিকেল থেকেই মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। তেল পাওয়ার আশায় অনেক চালককে সড়কেই নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই পাম্প কর্মচারীদের সঙ্গে ক্রেতাদের বাগবিতণ্ডা এমনকি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের অভিযোগ, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণেই এই সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম।
গোদাগাড়ীর ফিলিং স্টোশনগুলি হচ্ছে মেসার্স সাইফুল ফিলিং ষ্টোশন, আবুল কাশেম এন্ড ব্রাদার ফিলিং ষ্টোশন,
ফরিদপুর চৈতি ফিলিং স্টোশন, মেসার্স জৈটা বটতোলা ফিলিং স্টোশন, মেসার্স কাঁকনহাট ফিলিং স্টোশন ও মেসার্স বিজয় নগর বাউল ফিলিং। এসব ফিলিং স্টোশন গুলিতে ট্যাগ অফিসার হিসেবে সরকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করেও যেন নিয়মের মধ্যে আনা যাচ্ছে না।
ফিলিং স্টোশন কতৃপক্ষ জানান,
চাহিদার তুলনায় তেলের সরবরাহ অত্যন্ত কম। স্বাভাবিক সময়ে এক সপ্তাহে যে পরিমাণ তেল বিক্রি হতো, বর্তমানে অতিরিক্ত চাহিদার চাপে তা এক বেলাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক গ্রাহক তেল পাচ্ছেন না, যা থেকে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
ভুক্তভোগী মহিশালবাড়ী বাজারের হার্ডওয়ার ব্যবসায়ী মোঃ শরিফুল ইসলাম শরিফ বলেন, “তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে দিনের বড় একটি সময় নষ্ট হচ্ছে। ঠিকমতো কর্মস্থলে কাজ করতে পারছি না। তিনি আরও জানান পাম্পে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে গিয়ে পুরো দিনই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে ব্যক্তিগত জীবনেও।
গোগ্রাম আদর্শ বহুমূখী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম জানান গত বুধবার গোদাগাড়ীর সাইফুল ফিলিং স্টোশনে তিন ঘন্টা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে যখন আমার গাড়ীতে তেল দেয়ার জন্য আসলেন এমন সময় গোদাগাড়ীর কিছু যুবক সন্ত্রাসী কায়দার মারপিট শুরু করে এতে তেলা দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। তেল না পেয়ে স্কুলে যায় এবং বিকালে রাজশাহীর একটি ফিলিং স্টোশনে ২ লিটার তেল পেয়েছি। আমাদের মত প্রধান শিক্ষক শেষ বয়সে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল কেনা সম্ভব। অফিসের তো কাজ আছে। সিসিবিভিও এনজিওর কর্মকর্তা মোঃ নিরাবুল ইসলাম নিরব বলেন, লাইনে দাড়িয়ে তেল পাচ্ছি না। তেল সংকটে অফিসে যেতে হোন্ডা বাদ দিয়ে অটোতে যাচ্ছি কাজের গতি কমে যাচ্ছে।
মহিশালবাড়ী বাড়ি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের নৈশ্য প্রহরী শামীম রেজা বলেন, ফজরের আগে পাম্পে হোন্ডা রেখে এসে তিন লিটার তেল পেয়েছি, কোন রকম চলবে।
গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ ওবাইদুল হক বলেন, চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে ইরি বোরা ধান চাষ হয়েছে। সেচের জালানী তেলের বেশ চাহিদা রয়েছে। কৃষকগন তেল পাচ্ছে কিন্তু শ্যালো মেশিন চালিত নৌকায় ওই সব জালানী তেল ব্যবহার করায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। ইরান -ইজরাইল - আমেরিকার যুদ্ধ শর্তসাপেক্ষ বন্ধ হওয়ায় এখন র তেলের সমস্যা হবার কথা নয়।
মহানগরী একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম জানান, প্রধান শিক্ষক হয়ে দীর্ঘ দাঁড়িয়ে তেল কেনা সম্ভাব। জ্বলানী অভাবে গাড়ী চালানো বন্ধ করে রিকশায় অফিস করচ্ছি। যে দু লিটার তেল কিনতো না এখন ৫ লিটার, ট্রাংকি ফুল করে তেল কিনছে এভাবে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
গোদাগাড়ীতে জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত এবং তেলের পাম্পগুলোতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে উপজেলা প্রশাসন। এই কার্যক্রম সফল করতে নিরলসভাবে মাঠে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন গোদাগাড়ী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শামসুল ইসলাম।
সম্প্রতি বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং গ্রাহকরা যাতে কোনো ভোগান্তি ছাড়াই তেল সংগ্রহ করতে পারেন, সেজন্য নিয়মিত তদারকি করছেন তিনি। বিশেষ করে কৃষিকাজ ও যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি নিয়ে যাতে কেউ কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে বা অবৈধভাবে মজুত না করে, সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন এই কর্মকর্তা।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামসুল ইসলাম পাম্প মালিক ও কর্মচারীদের তেলের সঠিক পরিমাপ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি লাইনে দাঁড়িয়ে শৃঙ্খলা মেনে তেল সংগ্রহের জন্য সাধারণ মানুষকেও উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি আরও জানান, উপজেলা প্রশাসনের এই তৎপরতার বিষয়ে সাধারণ গ্রাহকরা সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিংয়ের কারণে পাম্পগুলোতে অহেতুক জটলা বা বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমেছে। "জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু বণ্টন বজায় রাখতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেউ যদি সংকট তৈরির চেষ্টা করে বা নিয়ম অমান্য করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনস্বার্থে প্রশাসনের এই অভিযান ও তদারকি নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।"
মোঃ হায়দার আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক,
রাজশাহী।