
স্টাফ রিপোর্টার:
একজন মানুষ—যিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক, সমাজসেবক, শিক্ষা-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকসুলভ নেতা, এবং একই সঙ্গে একজন সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। অথচ সেই মানুষটি জীবদ্দশায় পাননি তাঁর প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় সম্মান। তিনি হলেন মরহুম মফিজুল ইসলাম মোহন মিয়া।
তার সন্তানদের পক্ষ থেকে এখন একটাই আবেদন—
“সবার কাছে বাবার জন্য দোয়া চাই। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আর রাষ্ট্র যেন তার মুক্তিযুদ্ধের অবদান যথাযথভাবে যাচাই করে সম্মান প্রদান করে।”
মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসারির সাহসী যোদ্ধা
মরহুম মফিজুল ইসলাম মোহন মিয়া ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। সে সময় তিনি বরিশালের গৌরনদী থানায় কর্মরত ছিলেন।
জানা যায়, এক পর্যায়ে খবর আসে যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গৌরনদী থানা দখল করতে যাচ্ছে। তখন এসপির নির্দেশে, তার নেতৃত্বে থানার অস্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ মালামাল পার্শ্ববর্তী একটি কলেজে স্থানান্তর করা হয়।
শুধু তাই নয়, তিনি ওই কলেজ মাঠে রাতে স্থানীয় তরুণ ও যুবকদের নিয়ে বিভিন্ন টিম গঠন করেন এবং তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবেও সুপরিচিত।
তার সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন—
হাবুল মাঝি, কাবিল মাঝি, হাসেমসহ আরও অনেকে।
বাটা জোড়া ব্রিজ এলাকায় পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ
পরিবারের ভাষ্যমতে, তিনি বরিশালের গৌরনদী থানাধীন বাটা জোড়া ব্রিজ সংলগ্ন পশ্চিমাংশে পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
এই যুদ্ধ ছিল জীবনবাজি রেখে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
যুদ্ধ শেষে সনদ পেলেও হয়নি গেজেটভুক্তি
মুক্তিযুদ্ধ শেষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নীপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তালিকা অনুযায়ী জেনারেল ওসমানীর স্বাক্ষরিত সনদ তাদের মধ্যে প্রদান করা হয়।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—
পরবর্তীতে সেই সনদ গেজেটভুক্ত করার জন্য বরিশাল থেকে টেলিগ্রাম এলেও, তিনি অসুস্থ থাকায় আর যেতে পারেননি। ফলে তার মুক্তিযুদ্ধের সনদটি সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
পরে যখন সরকারিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান, ভাতা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা চালু হয়, তখন গেজেটবিহীন সনদ দিয়ে তিনি আর কোনো সুবিধা গ্রহণ করতে পারেননি।
২০১১ সালের যাচাই-বাছাইতেও বিতর্কিতভাবে বাদ
পরিবার জানায়, ২০১১ সালে নবীনগর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের তালিকায় তার নাম ঢাকায় পাঠানো হয়।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সে সময় তিনি রতনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক থাকায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দুর্নীতির কারণে তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী,
তৎকালীন নবীনগর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সাহন মেম্বার ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাকে “বিএনপির ট্যাগধারী” হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং তার জমাকৃত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উপজেলা অফিস থেকে উত্তোলন করে গায়েব করে দেন।
ফলে, একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, ভাতা ও সম্মান থেকে বঞ্চিত হন।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বশীল কর্মজীবন
মরহুম মফিজুল ইসলাম মোহন মিয়া বাংলাদেশ পুলিশে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ১৯৮৪ সালে পিরোজপুর থানা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
অবসরের পর তিনি তার পৈত্রিক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ভিটি বিশারা নয়াপাড়ায় চলে আসেন।
জীবনের শেষ সময় তিনি গ্রামের বাড়ি ও কুমিল্লায় কাটিয়েছেন।
রাজনীতি, সমাজসেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব
তিনি শুধু মুক্তিযোদ্ধা বা পুলিশ কর্মকর্তা নন, ছিলেন একজন জনবান্ধব, দায়িত্বশীল ও সমাজমনস্ক মানুষ।
তিনি রতনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এছাড়াও তিনি স্থানীয় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও মসজিদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
মানুষের বিপদে-আপদে পাশে থাকা, সামাজিক বিরোধ মীমাংসা করা, ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা করা—এসব কাজের জন্য তিনি এলাকায় ছিলেন একজন সম্মানিত ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব।
পরিবার ও এলাকাবাসীর ভাষায়,
তিনি ছিলেন খুবই ভালো মনের, সৎ, বিনয়ী ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ।
২০১৬ সালে চিরবিদায়, কিন্তু রয়ে গেছে অপূর্ণ স্বীকৃতির বেদনা
দীর্ঘ জীবনসংগ্রামের পর ২০১৬ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।
এর আগে ২০১২ সালে তার বক্তব্য স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ‘দৈনিক আমাদের কুমিল্লা’য় দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হয়।
কিন্তু আজও তার পরিবার বয়ে বেড়াচ্ছে এক গভীর কষ্ট—
একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে বিদায় নিতে পারেননি।
সন্তানের আকুল আবেদন
তার সন্তানের ভাষায়—
“আমার বাবা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, মানুষ গড়েছেন, সমাজের জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু জীবদ্দশায় তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মান পুরোপুরি পাননি। আমি বর্তমান সরকারের কাছে বিনীত আবেদন জানাই—তার মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ড, সহযোদ্ধা, নথিপত্র ও ইতিহাস যাচাই করে যেন তাকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করা হয়।”
তিনি আরও বলেন—
“সবার কাছে আমার প্রিয় বাবার জন্য দোয়া চাই। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।”
শেষ কথা
মরহুম মফিজুল ইসলাম মোহন মিয়া কেবল একটি নাম নন—
তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেও অনেক সময় ইতিহাসের পাতায় যথাযথ স্থান পাননি।
তার মতো বীরদের স্মরণ, সম্মান ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করা শুধু একটি পরিবারের দাবি নয়—
এটি জাতির নৈতিক দায়িত্ব।