
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহীঃ রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জাল কাগজ, ব্যাংকের টিটি প্রতারণা, রাজস্ব ফাঁকি, স্বাক্ষর জালিয়াতি, অবৈধ কাগজপত্রে রিট করে বছরের পর বছর খাসপুকুর দখলে রেখেছেন শরিফুল ইসলাম বিষু। পুকুর সিন্ডিকেটের গডফাদার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, এসিল্যান্ডের স্বাক্ষর জালিয়াতি ও অবৈধ কাগজপত্রে হাইকোর্টে রিট করে পুকুর হাতিয়ে নেওয়ার ব্যাপক অভিযোগ রেয়েছে বিষুর বিরুদ্ধে। এই বিষু প্রায় ৬ শতাধিক পুকুর হাইকোর্টে রিট করে হাতিয়ে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ৪৫০ টি পুকুর রিট ভ্যাকেট ( বাতিল) করে গত বছর ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে করে প্রায় ৩ বছর পুকুরগুলো বিষুর হাতে থাকায় সরকারের প্রায় ২ কোটি ৫৯ লাখ ৭১ হাজার ৩৫১ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে বিষু কর্মজীবনে মসজিদের ইমাম থেকে এখন পুকুর জালিয়াতি ও মাদক ব্যবসা করে হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। মৃত আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে শরিফুল ইসলাম বিষু উপজেলার জাহানাবাদ এলাকায় গড়েছেন আলিশান প্রাসাদ।
গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড গোদাগাড়ী শাখার ব্যাংক ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম একটি চালান জালিয়াতির তালিকা প্রনয়ণ করেন। তালিকায় চালান জালিয়াতির নাম/ প্রতিষ্ঠান এর বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ্য করা হয়।
এতে উল্লেখযোগ্য জালিয়াতির নামের মধ্যে রয়েছে, গত ২৪ জুন ২০২৪ এ চালান নং ১৩ আসল বিসমিল্লাহ সমন্বিত মৎস্য চাষী স স লিঃ গোগ্রাম/ সেখপুর-৩১৯, দাগ নং ৪৫, পরিমান ৩.৯২ এর স্থলে জালিয়াত শরিফুল ইসলাম বিষু চৈতন্যপুর নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী জীবনযাত্রার উন্নয়ন স. স. লিঃ গোদাগাড়ী /সাগুয়ান -২১৪ দাগ নং ২৯১ পরিমাণ –১.৩০, আসল বিসমিল্লাহ সমন্বিত মৎস্য চাষী স. স. লিঃ গোগ্রাম/ সেখপুর-৩১৯ দাগ নং ৬ পরিমান ২.৩০ এর স্থলে জালিয়াত শরিফুল ইসলাম বিষু রঘুনাথপুর উত্তরপাড়া মৎস্যচাষী স স লিঃ মোহনপুর/কুমারপাড়া-৪২ দাগ নং ৬৭ পরিমান-০.৬৮, আসল বিষুর ছেলে সিহাবউদ্দিন নসিদানপুর ছাগল পালন সিআইজি ( প্রাণিসম্পদ) স. স. লিঃ বাসুদেবপুর /কিসমত মালদেবপুর-১৬৭ দাগ নং ৬৭ পরি-০.৪০ এর স্থলে জালিয়াত বিষুর ছেলে সিহাবউদ্দিন ড্রিমওয়ার্ল্ড সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন স. স. লিঃ মাটিকাটা /কৃষ্ণবাটি-২৭৪ দাগ নং ১২৫ পরি-০.৪৭, আসল বিষুর ছেলে সিহাবউদ্দিন পালপুর সিআইজি ( মৎস্য) স স লিঃ গোদাগাড়ী /রাজারামপুর দাগ নং ১২৫ পরি-০.৫৯ এর স্থলে জালিয়াত বিষুর ছেলে সিহাবউদ্দিন গোগ্রামহাটপাড়া মৎস্যচাষী স. স. লিঃ গোগ্রাম /তেরপাড়া-২৮১ দাগ নং ২০৪ পরি-০.৯৫, আসল বিষুর ভাই আঃ রশিদ শ্রবণ সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন স.স. লিঃ মোহনপুর/মিরপুর-৭৯ দাগ নং ৩১৫ পরি- ০.৫৫ এর স্থলে জালিয়াত বিষুর ভাই আঃ রশিদ বাসুদেবপুর/ নিত্বনন্দনপুর-১৬৬ দাগ নং ১০৩ পরি-০.৮৩ সহ সর্বমোট ৫৫ টি চালান জালিয়াতি করেছেন মর্মে সনদ প্রদান করেছেন।
চালান জালিয়াতির বিষয়ে সোনালী ব্যাংক কতৃক সনদের ভিত্তিতে জলমহাল ইজারা কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে গত ১ জানুয়ারী ২০২৫ তারিখে বেশকিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্তে জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বলা হলেও অদৃশ্য কারণে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
এসিল্যান্ডের স্বাক্ষর জালিয়াতি করতেও বিষু পিছপা হননি। তৎকালীন গোদাগাড়ী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)’র স্বাক্ষরও তিনি জালিয়াতি করেন। জলমহাল ইজারায় বাংলা ১৪৩১-১৪৩৩ অর্থ বছরে ২৬ জুন ২০২৪ তারিখে স্ট্যাম্প পাতার খস নং ০৫১২৭৩৫, ০৫১২৭৩৬, ০৫১২৭৩৭ এ সরকারি জলমহাল / পুকুর ইজারার চুক্তিপত্র জালিয়াতি করেন। জাল চুক্তি পত্র দেখিয়ে সোনালী ব্যাংক গোদাগাড়ী শাখায় তিনি চালানের মাধ্যমে ৩৫ হাজার টাকা জমা দেন। চালান নং ১৬২ কোড নং ১৪৬৩১ ০০০০ ১২৬১। চুক্তিতে শরিফুল ইসলাম বিষু ইজারা গ্রহীতায় আলীপুর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি লিঃ এর সভাপতি শফিকুল ইসলাম এর নাম ব্যবহার করেন। পুকুরটি জালিয়াতির মাধ্যমে কুক্ষিগত করার পর উপজেলার শাহজাদার কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর শাহজাদা প্রায় ২ লক্ষ টাকায় বিক্রি করেন শামিম রেজার কাছে। এভাবেই তলিয়ে গেছে সরকারী রাজস্ব।
জানতে চাইলে শাহজাদা বলেন, আমি কত টাকায় পুকুরটি কিনেছিলাম মনে নাই। কয়েকটি পুকুর তার ( বিষুর) কাছে নেওয়া হয়েছিল। অনেকদিনের কথা মনে নাই। আমরা ঐ সময় ২০/২২ লাখ টাকা খরচ করে বিষুর রিট ভ্যাকেট করেছিলাম। তার পরও প্রশাসন আমাদেরকে ঠিকমত পুকুর বুঝায় দেয়নি। অনেক লস হয়েছে আমাদের। আসলে যারা রক্ষক তারাই ভক্ষক। কিছু বলার নাই এদের বিষয়ে।
এছাড়াও জালিয়াত বিষুর রয়েছে একাধিক মামলা। গোদাগাড়ী মডেল থানা, নওগা সদর থানা, চাঁপাইনবাবগজ্ঞ জেলার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তৃত্বীয় আদালতে সিআর মামলা সহ বিষুর নামে রয়েছে একাধিক মাদক মামলা।
এ বিষয়ে জানতে বিষুকে তার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোদাগাড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি শামসুল ইসলাম বলেন, বাংলা ১৪৩১-৩৩ সনে ২য় ধাপের ইজারায় যে সকল জলমহাল ইজারায় অনিয়ম প্রমানিত হয়েছিল তার মধ্যে চালান জালিয়াতি একটি।
চালান জালিয়াতি সংশ্লিষ্ট জলমহালগুলো বাংলা ১৪৩২-৩৪ সনে পুনরায় ইজারার অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ইজারা প্রদান করা হয়৷
পরবর্তীতে ১০৪৪৬/২০২৩ নং রিট পিটিশন এর মাধ্যমে প্রায় ৩৫০ টি পুকুর ইজারা বহির্ভূত রাখার চেষ্টা করেছিলো একটি অসাধু চক্র৷ সেই রিট পিটিশন বাতিল করে সকল জলমহাল পূনরায় ইজারার অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷
১০৪৪৬/২০২৩ নং রিট পিটিশন বাতিল করে বাংলা ১৪৩২-৩৪ সনের ২য় ধাপে ইজারা প্রদান করা হয়। বাংলা ১৪৩১-৩৩ সনে ইজারাকৃত পুকুরের চুক্তিনামাতে সদস্য সচিব এর স্বাক্ষর স্ক্যান, অনুমোদন ছাড়া ডিড সম্পন্ন হয়েছে এমন পুকুরের ইজারা বাতিল করে পুনরায় বাংলা ১৪৩৩-৩৫ সনের ইজারার আওতায় নিয়ে আসা হয় এবং ইজারার জন্য তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এছাড়াও জালিয়াতি সংক্রান্তে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ উপজেলায় খাসপুকুর ইজারা দেওয়ার সময় রীতিমতো ‘সাগরচুরির’ ঘটনা ঘটেছে। এলাকার একটি শক্তিশালী চক্রকে ইজারার মোড়কে খাসপুকুর দেওয়া হয়েছে পানির দরে। এসব ইজারার সময় ভুয়া চালানও ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক পুকুরের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ইজারামূল্যের চেয়ে কম দরে দলিল করা কিংবা মামলার নিষেধাজ্ঞার কথা বলে তালিকাবহির্ভূত রেখে পরে গোপনে ইজারা দেওয়া হয়েছে।
এতে অন্তত ৫ কোটি ২৯ লাখ ৮২ হাজার ৬২৮ টাকার রাজস্ব ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইজারামূল্যের চেয়ে কম টাকার চালান জমা দিয়ে ৪৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫৯৫ টাকা, এক চালান একাধিকবার ব্যবহার করে ২৮ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ টাকা, পুকুরের নামে মামলা দেখিয়ে ১ কোটি ৯৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৬ টাকা এবং প্রকাশিত তালিকার চেয়ে অনুমোদিত মূল্য কম করে ২ কোটি ৫৯ লাখ ৭১ হাজার ৩৫১ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সরকারি হিসাবে গোদাগাড়ী উপজেলায় খাসপুকুর রয়েছে ৩ হাজার ৬০টি। ১৪৩১-৩৩ বঙ্গাব্দের জন্য ইজারা দিতে গত ১৮ এপ্রিল ২ হাজার ৭৪৯টি পুকুরের তালিকা প্রকাশ করা হয়। অভিনব এই জালিয়াতির ঘটনা ঘটে তখনই। একটি বিশেষ মহল সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে এই জালিয়াতি করেছে। পুকুরের তালিকায় সই করা হয়েছে গত ৩০ মে। অনুমোদিত তালিকা প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ থাকে।
কিন্তু এবার তালিকাই প্রকাশ করা হয়েছে সই করার ২০ দিন পর, ২০ জুন। দেরিতে তালিকা প্রকাশ করে আপিল করার সুযোগ থেকে আগ্রহী দরপত্র দাখিলকারীদের বঞ্চিত করা হয়েছে। তালিকায় ইজারামূল্য ৩০ লাখ টাকা থাকা পুকুর দুই লাখ টাকায়ও ইজারা দেওয়া হয়েছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার সাবেক ইউএনও ফয়সাল আহম্মেদ জানান, বিগত ১৭ বছরে কেউ যেটা করার সহস পায়নি সেটা আমি করেছিলাম, সরকার কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে। পুকুর সিন্ডিকেটের মূলহোতা শরিফুল ইসলাম বিষুরা প্রচুর অর্থের লোভ দেখিয়ে লাভ করতে পারেন নি।
তিনি আরও জানান, ৪৫০ টির বেশি খাস পুকুর অবমুক্ত করেছিলাম। যার বেশীর ভাগই বিষুর দখলে ছিল এর কারণে পুকুর সিন্ডিকেটের হোতার আমাকে বদলি করার জন্য মরিয়া হয়েছিল। দেশে ভাল কাজ ও ভালো মানুষের জায়গা নেই।
মোঃ হায়দার আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক,
রাজশাহী