
মোঃ শহিদুল ইসলাম,
বিশেষ প্রতিবেদকঃ
চট্টগ্রাম: পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির মাঝেও কার্যক্রমে বিরতি না দিয়ে অপারেশনাল সক্ষমতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত তদারকি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে অর্জিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সাত দিনের ব্যবধানে মোট ৫৪ হাজার ৮৯৮ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে আমদানি পণ্য ছিল ২৮ হাজার ৯৬১ টিইইউএস এবং রপ্তানি পণ্য ২৫ হাজার ৯৩৭ টিইইউএস। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ১৮ মার্চ একদিনেই ১১ হাজার ৮৬১ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে দৈনিক কার্যক্রমে সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
কার্গো ব্যবস্থাপনাতেও একই সময়ে দৃশ্যমান হয় গতি ও দক্ষতার প্রতিফলন। সাত দিনে মোট ২৫ লাখ ৮ হাজার ৬১৪ মেট্রিক টন পণ্য খালাস করা হয়। এর মধ্যে আমদানি পণ্য ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৬ মেট্রিক টন এবং রপ্তানি পণ্য ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮২৮ মেট্রিক টন। ১৮ মার্চ একদিনেই ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩৪ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে আরেকটি রেকর্ড স্থাপিত হয়।
এই সময়ে বন্দরে মোট ৬৪টি জাহাজ বার্থিং ও হ্যান্ডলিং সম্পন্ন হয়েছে। ১৯ মার্চ সর্বোচ্চ ১৪টি জাহাজ পরিচালনা করা হয়। ঈদের ছুটির মধ্যবর্তী সময়ে সাময়িক ধীরগতি লক্ষ্য করা গেলেও ২২ ও ২৩ মার্চ পুনরায় কার্যক্রমে গতি ফিরে আসে, যা বন্দরের সক্ষমতা ও প্রস্তুতির প্রতিফলন।
বন্দরের কনটেইনার ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনাও ছিল নিয়ন্ত্রিত ও সুসংগঠিত। ২৪ মার্চ পর্যন্ত মোট ধারণক্ষমতার তুলনায় কনটেইনারের অবস্থান ছিল স্বস্তিদায়ক সীমার মধ্যে। পূর্ণ কনটেইনার, ডিপো ইউনিট এবং খালি কনটেইনার পৃথকভাবে ব্যবস্থাপনা করে জট কমিয়ে আনা হয়। একই সঙ্গে কমলাপুর আইসিডিমুখী কনটেইনার চলাচলও অব্যাহত রাখা হয়েছে।
ডেলিভারি কার্যক্রমে গতি ধরে রাখতে গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৮১ টিইইউএস কনটেইনার সরবরাহ করা হয়েছে এবং আরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কনটেইনার দ্রুত ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রমজান ও ঈদ উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স কার্যকর ভূমিকা পালন করে। জেটি এবং বহির্নোঙর উভয় স্থানে নজরদারি জোরদার করা হয়, ফলে পণ্য খালাসে কোনো ধরনের বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়নি। জ্বালানি তেলবাহী জাহাজগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং ও প্রয়োজনীয় নেভিগেশন সহায়তা দেওয়া হয়।
পরিবহন ব্যবস্থাপনাতেও নেওয়া হয় বিশেষ উদ্যোগ। সড়কে ভারী যান চলাচল সীমিত থাকায় জরুরি পণ্য পরিবহনে বিশেষ স্টিকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ আগমনের চাপ ও শ্রমঘাটতির কারণে কিছুটা অপেক্ষমাণ সময় বৃদ্ধি পেলেও দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বর্তমানে আউটার অ্যাঙ্করেজে জাহাজের অপেক্ষা কার্যত শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা এটিকে বন্দরের কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতার সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
সামগ্রিকভাবে, ঈদের মতো দীর্ঘ ছুটির সময়েও চট্টগ্রাম বন্দর যেভাবে তার অপারেশনাল ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, তা দেশের বাণিজ্য প্রবাহ সচল রাখার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।