
রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলী : দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর শনিবার (২১ মার্চ) সারা দেশের মতো রাজশাহীতেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসাহ ও আনন্দের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদের সকালে নগরীর বিভিন্ন ঈদগাহ ও মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় ঈদের জামাত।
জামাত শেষে অনুষ্ঠিত মোনাজাতে মুসল্লিরা আল্লাহর কাছে নিজেদের গুনাহ মাফ চাওয়ার পাশাপাশি দেশের শান্তি, উন্নতি ও কল্যাণ কামনা করেন। দেশকে সব ধরনের বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা করার জন্য মহান আল্লাহর কাছে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। এছাড়া রমজান মাসের রোজা ও ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য দোয়া করা হয়। মৃত আত্মীয়-স্বজনদের জন্য জান্নাত কামনাও করা হয় মোনাজাতে। অনেক মুসল্লিকে আবেগাপ্লুত হয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে দেখা গেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিপীড়িত মুসলমানদের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্যও বিশেষ দোয়া করা হয়। এতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়।
নগরীর দরগাপাড়া হজরত শাহ মখদুম (রহ.) মাজার সংলগ্ন মসজিদে সকাল ৮টায় প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ৮টা ২০ মিনিটে তা শেষ হয়। পরে সকাল পৌনে ৯টায় একই স্থানে দ্বিতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হয়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এবার কেন্দ্রীয় ঈদগাহের পরিবর্তে মসজিদেই ঈদের নামাজ আদায় করা হয়।
ঈদের নামাজে অংশ নিয়ে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও নামাজ আদায় করতে পেরে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। তিনি দেশকে এগিয়ে নিতে ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন জানান, ছয়টি স্থানে ঈদের জামাতের প্রস্তুতি থাকলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি। ফলে নগরীর বিভিন্ন মসজিদে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
নামাজ শেষে মুসল্লিরা দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় দোয়া করেন। আয়োজকদের ভাষ্য, দীর্ঘ ১৭ বছর পর একসঙ্গে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ সময় রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ঈশা, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে জিন্নাহনগর জামে মসজিদে ঈদের জামাতে অংশ নেন রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন। তিনি বলেন, ঈদ ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়-সব বিভেদ ভুলে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদ উদযাপনে রাজশাহীতে ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের এক উজ্জ্বল বার্তা প্রতিফলিত হয়েছে
এদিকে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বারুইপাড়া ঈদগাহ মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির মাঝেো ঈদ-উল- ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার রেলবাজার বারুইপাড়া ঈদগাহ মাঠে সকাল ৮ টার সময় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঈদ-উল-ফিতরের জামায়াতে দেশের মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, ইরান, ভারত, ও ফিলিস্তিনির নির্যাতিত মসুলমান মানুষের জন্য দোয়া করা হয়েছে। এ মাস, সর্বপ্রকার ইবাদাতে অভ্যস্থ হওয়ার মাস, ঈমান মযবুত করার মাস, গোদাগাড়ীর বারুইপাড়া রেলবাজার ইদগাহে অনুষ্ঠিত এ জামাতে ইমামতি করেন মাওলানা আনারুল ইসলাম। ঈদের জামায়াত শেষে সংক্ষিপ্ত খুতবা পাঠ করা হয়। এরপর অনুষ্ঠিত হয় দোয়া ও মোনাজাত। মোনাজাতে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করা হয়। মোনাজাতে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহসহ সব মানুষের গুনাহ মাফ চেয়ে দোয়া কামনা করা হয়েছে। যেকোনো বিপদ থেকে দেশকে হেফাজতের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করা হয়েছে।
নামাজ শেষে পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন মুসল্লিরা। ঈদুল ফিতরকে অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ করার পাশাপাশি আমাদের উচিত হবে ঈদের সাথে সংশ্লিষ্ট শরয়ী বিধান মেনে চলা ও শিষ্টচারিতা রক্ষা করা। সংক্ষেপে ঈদের সে শরয়ী বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরেন তিনি।
এক: ঈদের আগের দিন সূর্যাস্ত থেকে শুরু করে ঈদের সালাত আদায় করা পর্যন্ত তাকবীর তথা ‘আল্লাহু আকবর’’ বলতে থাকা। এ হচ্ছে বিশ্ববাসীর সামনে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘‘আর যাতে তোমরা সংখ্যাপূর্ণ কর এবং তিনি যে তোমাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন তার জন্য ‘আল্লাহ মহান’ বলে ঘোষণা দাও এবং যাতে তোমরা শোকর কর।’’ [সূরা আল- বাকারাহঃ ১৮৫] তাকবীরের শব্দগুলো হল: ‘‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’’ পুরুষরা মসজিদে, বাজারে ও ঘরে এ তাকবীর ধ্বনি জোরে দিতে থাকবে। আর মহিলারা তাকবীর বলবে আস্তে।
দুই: যাকাতুল ফিতর প্রদান করা, রোযাদারের যে ভুল-বিভ্রান্তি ও পাপ হয়েছে তা মোচন করার জন্য এবং মিসকীনদের খাদ্য যোগানের উদ্দেশ্যে যাকাতুল ফিতর দেয়ার বিধান দেয়া হয়েছে। যাকাতুল ফিতর ঈদের একদিন বা দুইদিন আগেও দেয়া যায়। তবে সালাতুল ঈদের পর পর্যন্ত বিলম্ব করা যাবে না, আগেই আদায় করতে হবে।
তিন: ঈদের দিন সকালে গোসল করা ও সুন্দর পোষাক পরিধান করা এবং ঈদের সালাতে যাওয়ার প্রাক্কালে পুরুষদের খোশবু ব্যবহার করা উত্তম। মেয়েদের জন্যও সুন্নাত হলো পর্দার সাথে ও খোশবু ব্যবহার না করে ঈদগাহে এসে ঈদের আনন্দ ও সালাতে শরীক হওয়া।
চার: ঈদগাহে যাওয়ার আগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত অনুসরণ করে তিনটি বা পাঁচটি করে বেজোড় সংখ্যক খেজুর খাওয়া।পাঁচ: ঈদের জামাতে শামিল হওয়া এবং পুরো খুতবা শোনা। ইমাম ইবনু তাইমিয়া সহ আরো অনেক মুহাক্কিক আলেমের মতে ঈদের সালাত ওয়াজিব, কোন ওজর ছাড়া ত্যাগ করা যাবে না। এমনকি হায়েযরতা মহিলাগণ পর্যন্ত ঈদগাহে আসবেন এবং সালাতে অংশ না নিয়ে একপ্রান্তে অবস্থান করবেন।
ছয়: রাসূলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ অনুসরণ করে এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফেরা।
সাত: ঈদের অভিভাদন জানাতে গিয়ে, ‘‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়ামিনকা’’ অর্থাৎ ‘আল্লাহ আমাদের ও আপনার পক্ষ থেকে কবুল করুন’ বলা ভাল। এছাড়া সুন্দর সুন্দর দোয়ার মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় ও কোলাকুলি করাতে কোন অসুবিধা নেই। বরং এতে পারস্পারিক সম্পর্ক অনেক মধুর হয়ে উঠে।
আট: ঈদ উৎসবকে উপলক্ষ করে সকল প্রকার পাপাচার ও অশ্লীলতায় নিমজ্জিত হওয়া থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করা। সর্বশেষে বলবো- সিয়াম সাধানার পবিত্র মাস রামাদানুল মুবারক ছিল মূলত: আমাদের জন্য তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ লাভের মাস, সর্বপ্রকার ইবাদাতে অভ্যস্থ হওয়ার মাস, ঈমান মযবুত করার মাস, প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে মহান চরিত্রে বিভূষিত হওয়ার মাস, কুরানের মর্ম উপলব্ধি করে জীবনের সর্বক্ষেত্রে কুরআনমুখী হওয়ার মাস, মুসলিম জাতির জেগে উঠার মাস এবং সকল প্রকার অনাহুত শক্তির বলয় থেকে মুক্ত হয়ে হক প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞাকে সুদৃঢ় করার মাস। একটি মাস ধরে আমরা যারা নিজেদেরকে এভাবে প্রস্তুত করেছি, মাসটি অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে যদি তা ভুলে যাই এবং আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্য থেকে দুরে সরে যাই, তাহলে তা কুতটুকু সঙ্গত হবে? মূলত: যারা ভাবে যে, রমাদান মাসে ইবাদাত করাই যথেষ্ট, তাদের সে ভাবনা অসঙ্গত ও ভুল। এদিকে ইঙ্গিত করে এক মুসলিম মনিষী বলেছিলেন: ‘‘সে সকল ব্যক্তিবর্গ কতই না মন্দ, যারা রামাদান ছাড়া আল্লাহকে চেনে না।’’ তাছাড়া আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন: ‘‘মৃত্যু আসা পর্যন্ত তোমার রবের ইবাদাত করতে থাক’’। [সূরা আল-হিজর:৯৯]
সকাল সাড়ে ৮ টার উপজেলা পরিষদ চত্তরে নামাজে অংশগ্রহন করতে আসা মুসল্লিদের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইদের নামাজ আদায় করার ব্যবস্থা করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ নাজমুস সাদাত রত্ন।
মোনাজাতে দেশ ও জাতির শনিবার , সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহসহ সব মানুষের গুনাহ মাফ চেয়ে দোয়া কামনা করে অনুরুপ ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে, মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় মাঠে, মাদারপুর ইদগাহে, মহিশালবাড়ী পুরাতন জামে মসজিদে, হেলিপ্যাড মাঠে, আল আরাফ ঈদগাহ ময়দান, গোদাগাড়ী উপজেলা মাঠে, চাঁইপাড়া হানাফিয়া ইদগাহে, পিরিজপুর ইদগাহে, বাসুদেবপুর ঈদগা মাঠ, রাজবাড়ী হাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠসহ গোদাগাড়ী উপজেলা ও পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মোঃ হায়দার আলী
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহী।